চট্টগ্রামে মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলায় তার স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে পিবিআই’র তদন্ত কর্মকর্তা ও পরিদর্শক আবু জাফর মোহাম্মদ ওমর ফারুক অভিযোগপত্রটি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (প্রসিকিউশন) মো. কামরুল হাসানের কাছে হস্তান্তর করেন। এসময় পিবিআই পুলিশ সুপার (মেট্রো) কাজী নাইমা হাসানও উপস্থিত ছিলেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে সিএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. কামরুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলায় বাবুল আক্তারসহ ৭ জনকে আসামি করে ২ হাজার ৮৪ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পিবিআই। আইন অনুযায়ী আমরা সেটা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠাব। ম্যাজিস্ট্রেট সেটা পর্যালোচনা করে স্বাক্ষর করবেন। যেহেতু এটা হত্যা মামলা, ম্যাজিস্ট্রেট সেটা সেশন জজ আদালতে পাঠাবেন। এরপর পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।’ আগামী ১০ অক্টোবর মিতু হত্যা মামলার শুনানির তারিখ ধার্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
জানতে চাইলে পিবিআইর পুলিশ সুপার নাইমা হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘মিতু হত্যা মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আমরা চার্জশিট জমা দিয়েছি। মামলায় বাবুল আক্তারকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে আমরা মামলাটি তদন্ত করেছি। পিবিআই কখনো পেশাদারিত্বের বাইরে গিয়ে তদন্ত করে না।’ তিনি বলেন, ‘২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মামলাটির তদন্তভার পিবিআইর কাছে আসে। আড়াই বছরের তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে সব রকমের তথ্যপ্রমাণ আমরা পেয়েছি চার্জশিটে তাদের আসামি করা হয়েছে।’
পিবিআই ও আদালত সূত্রে জানা যায়, অন্য আসামিরা হলেন মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা, এহতেশামুল হক ওরফে হানিফুল হক ওরফে ভোলা, মো. মোতালেব মিয়া ওয়াসিম, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. খাইরুল ইসলাম কালু ও শাহজাহান মিয়া।
আসামিদের মধ্যে বাবুল আক্তার, মোতালেব মিয়া ওয়াসিম, আনোয়ার হোসেন ও শাহজাহান মিয়া কারাগারে আছেন। কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা ও খাইরুল ইসলাম কালুকে পলাতক দেখানো হয়েছে এবং মামলায় জামিনে আছেন এহতেশামুল হক ভোলা।
গ্রেপ্তার হওয়া চারজনকে অব্যাহতি দিয়েছে পিবিআই। এরা হলেন- কারাগারে থাকা মো. সাইদুল ইসলাম সিকদার সাক্কু, নুরুন্নবী, রাশেদ ও গুইন্যা। হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার হওয়া নুরুন্নবী ও রাশেদ পুলিশের সঙ্গে ‘কথিত’ বন্দুকযুদ্ধে মারা যান। এছাড়া আসামিদের মধ্যে ভোলা, ওয়াসিম ও আনোয়ার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে মিতু খুনের দায় স্বীকার করেন। অভিযোগপত্রে ৯৭ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা খুনের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে পিবিআই পুলিশ সুপার (মেট্রো) কাজী নাইমা হাসান বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি। তিনি বলেন, ‘আমরা চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দিয়েছি। এখন বিষয়টি আদালত এবং প্রসিকিউশন শাখা দেখবে। মামলা ট্রায়ালের পর্যায়ে গেলে বিস্তারিত জানতে পারবেন।’
২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড় এলাকায় ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে গিয়ে নৃশংসভাবে খুন হন মাহমুদা খানম মিতু। এই হত্যাকা-ের পরদিন (০৬ জুন) স্বামী বাবুল আকতার পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। স্ত্রী হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ছয় বছর পর এসে তিনি নিজেই প্রধান আসামি হলেন।
পাঁচলাইশ থানা পুলিশের পর নগর গোয়েন্দা পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে। তারা প্রায় তিন বছর তদন্ত করেও সংস্থাটি চার্জশিট দিতে ব্যর্থ হয়। পরে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্তের ভার যায় পিবিআইর কাছে। ২০১৬ সালের ২৪ জুন বাবুল আক্তারকে ঢাকার ডিবি পুলিশ কার্যালয়ে এনে প্রায় ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে আবু নসুর গুন্নু, শাহ জামান ওরফে রবিন, সাইদুল আলম শিকদার ওরফে সাক্কু, শাহজাহান, মো. আনোয়ার ও মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিমকে পুলিশ আটক করেছিল। হত্যাকা-ে অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে এহতেশামুল হক ভোলা ও তার সহযোগী মো. মনির আটক হন। আনোয়ার ও মোতালেব জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। তাদের স্বীকারোক্তিতে মিতু হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে বাবুল আক্তারের সোর্স হিসেবে পরিচিত মো. মূসার নাম আসে।
২০২১ সালের ১১ মে মামলা তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই বাবুল আক্তারকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে মিতু হত্যাকান্ডে তার সম্পৃক্ততা পাওয়ার কথা জানায়। ১২ মে মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা করেন। ওই মামলায় বাবুল আক্তারসহ ৮ জনকে আসামি করা হয়। ওইদিনই শ^শুরের মামলায় বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আর বাবুল আক্তারের করা মামলাটি তদন্ত করা হয়। এ মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি।
মিতুর বাবা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেছিলেন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত বিদেশি নাগরিক গায়ত্রী অমর সিংয়ের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছিলেন বাবুল আক্তার। বিষয়টি জানাজানি হলে মিতুর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়। এর জের ধরেই বাবুল আক্তার পরিকল্পিতভাবে লোক ভাড়া করে মিতুকে খুন করায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, মিতুর বাবা মোশাররফের অভিযোগের সত্যতা পায় পিবিআই। তদন্তে পাওয়া তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে চার্জশিটে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত এক বিদেশি নারীর সঙ্গে বাবুল আক্তারের পরকীয়ার জড়িয়ে পড়া নিয়ে তাদের সংসারে অশান্তি শুরু হয়। এর জেরেই বাবুল আক্তার স্ত্রীকে খুনের সিদ্ধান্ত নেন। ‘খুনি’ ভাড়া করে স্ত্রীকে খুন করান বাবুল আক্তার নিজেই। পরে নিজেকে আড়াল করতে জঙ্গিরাই মিতুকে খুন করেছে বলে প্রচার করেন। মিতুকে খুনের মিশনে নেতৃত্ব দেয় বাবুল আক্তারের ‘সোর্স’ মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা। তার সঙ্গে ছিল আরও ছয়জন।
এদিকে, গত ৮ সেপ্টেম্বর হেফাজতে নিয়ে নিষ্ঠুর নির্যাতনের অভিযোগে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান বনজ কুমার মজুমদারসহ ৬ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করা হয়। আদালত আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর এই মামলার আবেদনের ওপর শুনানির দিন ধার্য করেছে।