মিয়ানমার থেকে নতুন করে পালিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারা আত্মগোপনে চলে গেছে। গত সোমবার এক দিনেই ৫টি পরিবার বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেএমন তথ্য পাওয়ার পর তাদের খুঁজে বের করতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এক মাসে অন্তত ৫০ জন রোহিঙ্গা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে বলে জানিয়েছে নতুন অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারা। গতকাল বুধবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরেজমিনে এসব তথ্য জানা গেছে।
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও প্রত্যাবাসন- প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। এ অবস্থায় আবারও মিয়ানমারে নির্যাতিত হয়ে রোহিঙ্গাদের নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, এক মাস ধরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে এবং প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে গোলাগুলির ঘটনা অব্যাহত আছে। গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত তিনটি পরিবার কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের আত্মীয়দের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন-৮) কমান্ডিং অফিসার আমির জাফর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরে মাসব্যাপী অস্থিরতার ফলে কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে বলে আমরা শুনেছি।’
ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি একটি পরিবার বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পেরেছে। কিন্তু পরিবারের প্রকৃত অবস্থান এখনো আমরা পাইনি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যাতে কেউ রোহিঙ্গা শিবিরে প্রবেশ করে আশ্রয় নিতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা সতর্কতা বাড়িয়েছি। সীমান্তবর্তী এলাকায়ও সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।’
নতুন করে রোহিঙ্গা প্রবেশের প্রচেষ্টা সম্পর্কে পুলিশের একজন অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শকও বলেছেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত চাপে পড়ে গেছি এবং প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তারা (রোহিঙ্গা) ভারসাম্যও নষ্ট করছে।’
ক্যাম্প এলাকা পরিদর্শনকালে এ প্রতিবেদক ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া এক পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছেন। তারা প্রাথমিকভাবে কক্সবাজার কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নিলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশির মুখে তারা আত্মগোপনে চলে যায়।
রাখাইনে সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর হাতে রোহিঙ্গারা আবারও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বলে দাবি করে ওই পরিবার। সম্প্রতি ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া এক নারী রোহিঙ্গা পরিচয় ও অবস্থান প্রকাশ না করার শর্তে মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি মিয়ানমারের বুথিডাং গ্রামের বাসিন্দা। সেনাবাহিনী এবং মগ তাদের আক্রমণ করেছে এবং স্থান ছেড়ে মংডুতে আশ্রয় নিতে বলেছে। নির্যাতন ও জীবন হারানোর ভয়ে তারা জায়গা ছেড়ে ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে।
কীভাবে বাংলাদেশে পৌঁছালেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পে পৌঁছাতে প্রায় ১০ দিন সময় লেগেছে। নাফ নদী পার করতে একজন নৌকার মাঝিকে রাজি করাই এবং এর জন্য তাকে আমার কানের দুল দিয়েছি।’
ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, শাহপরীর দ্বীপের বিপরীতে মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় আরও কিছু পরিবার বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ বিষয়ে পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, তারা জানতে পেয়েছেন কিছু রোহিঙ্গা পরিবার মিয়ানমারের সাহবাজার এলাকায় জড়ো হয়েছে। তারা বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সতর্কতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে বিজিবি-২-এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল শেখ খালিদ মোহাম্মদ ইফতেখার বলেছেন, সীমান্তে নতুন কোনো সতর্কতা দেওয়া হয়নি বা সতর্কতা বাড়ানো হয়নি।
শাহপরীর দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করেছেন, তারা কয়েক দিন ধরে কিছু রোহিঙ্গা দলকে দ্বীপে চলাচল করতে দেখেছেন। দ্বীপের একটি মাছের দোকানের মালিক এমদাদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সোমবার দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত তিনি দ্বীপের জেটিতে অন্তত চার থেকে পাঁচটি রোহিঙ্গা দলকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন। প্রত্যক দলে তিন থেকে চারজন সদস্য রয়েছে। এ দলগুলো কিছু একটা খুঁজছিল। তবে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে নাকি ক্যাম্প থেকে বের হয়ে এলাকায় ঘোরাঘুরি করেছে, তা স্পষ্ট করতে পারেননি এমদাদুল্লাহ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এসব এলাকায় নাফ নদী খুব বেশি প্রশস্ত না হওয়ায় চৌধুরীপাড়া, লেদাবাজার, লম্বাবিল, জাদিমুরা ও বরোতলী পয়েন্ট থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। দুই পাশের সীমান্তে কিছু দালাল আছে, যারা মূলত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে নদী পার হতে এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে সাহায্য করার জন্য কাজ করছে। সম্প্রতি ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া কিছু রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় বলেও স্থানীয় ওই সূত্রে নিশ্চিত করেছে।
সদ্য আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গাদের ট্রানজিট ক্যাম্পে স্থানান্তরের বিষয়ে জানতে চাইলে কুতুপালং নিবন্ধিত ক্যাম্প ২-এর ইনচার্জ মোহাম্মদ আক্তার হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কুতুপালংয়ের আরেকটি নিবন্ধিত ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. শায়েদ ইকবাল বলেছেন, তাদের কাছে নতুন কোনো রোহিঙ্গার আশ্রয় দেওয়ার তথ্য নেই। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে নতুন কোনো রোহিঙ্গাকে যেতে না দেওয়ার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এবং নতুন কোনো রোহিঙ্গা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গত ৩ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেছিলেন, রাখাইন রাজ্যের অবনতি পরিস্থিতির মধ্যে মিয়ানমারের কোনো নাগরিককে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অস্ত্রধারী গোষ্ঠী লড়াই করছে। আমাদের জানানো হয়েছে যে তারা (মিয়ানমারের নাগরিক) বাংলাদেশের দিকে আসছেন না।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, মিয়ানমারের কোনো নাগরিক যাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এক সপ্তাহ পরে ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন যে ১ মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর দীর্ঘায়িত অবস্থান একটি গুরুতর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের হত্যা ও নির্যাতন শুরুর পর বাংলাদেশে তাদের অনুপ্রবেশ শুরু হয়। এর আগেও কয়েক দফায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটে।