লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে আগস্ট মাস থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে কর্মসূচি পালন করে আসছে বিএনপি। এসব কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের মধ্যে সারা দেশে চারজন নিহত হয়েছে। বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে বলেছেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হবে না। কিন্তু আমরা দেখলাম পুলিশের কিছু অতি উৎসাহী সদস্য শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে গুলি চালিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে। আমরা এসব পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে খোঁজখবর রাখছি। ভবিষ্যতে জনগণ তাদের বিচার করবে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘পুলিশের কিছু অতি উৎসাহী সদস্য বিনা উসকানিতে আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নির্বিচারে গুলি করছে। আমরা তাদের সতর্ক করে বলতে চাই, অতি উৎসাহী হয়ে নেতাকর্মীদের ওপর গুলি করবেন না। এর জন্য একদিন আপনাদের জবাবদিহি করতে হবে। শুধু তাই নয়, দেশের জনগণ যেমন এসব অতি উৎসাহী সদস্যদের চিনে রাখছেন তেমনি দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোও খেয়াল রাখছে।’
তিনি বলেন, ‘ইতিপূর্বে আইজিপি (পুলিশের মহাপরিচালক), র্যাবের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ র্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আগামীতে অন্য বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও এই নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আমাদের অনুরোধ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করবেন না। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে দেবেন।’
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আব্দুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার বেকায়দায় পড়লে অনৈতিক নির্দেশ পালনকারীদের দায় নেবে না। নারায়ণগঞ্জে যুবদল নেতা শাওন প্রধানকে হত্যার জন্য গোয়েন্দা পুলিশ সদস্য কনককে ক্লোজ করা হয়েছে।’
বিএনপির অভিযোগ, চট্টগ্রাম নগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলামকে ২০২১ সালের ১৬ জুন রাতে পুলিশের সোর্স আকাশ ফোন করে এক জরুরি কাজে অক্সিজেন এলাকার হোটেল জামানে দেখা করতে বলেন। সাইফুল সেখানে যাওয়ার পরই বায়েজিদ থানার ওসি মো. কামরুজ্জামানসহ পুলিশের সদস্যরা তাকে প্রাইভেট কারে তুলে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এ সময় সাইফুলের মোবাইল ও মোটরসাইকেলের চাবি ছিনিয়ে নেয় তারা। পরে রাত ১টার দিকে বায়েজিদ লিঙ্ক রোড এলাকায় নিয়ে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। সাইফুল চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ওসি কামরুজ্জামান তার পায়ে গুলি করেন। এ সময় এসআই মেহের অসীম দাশও গুলি করেন সাইফুলের পায়ে। বিএনপি নেতারা বলছেন, এসব ঘটনাও তারা নজরে রাখছেন।
গত জুলাই মাসে সরকার লোডশেডিংয়ের ঘোষণা দেয়। আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। এর প্রতিবাদে কর্মসূচি দেয় বিএনপি।
এরই মধ্যে দলের ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে ভোলায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন আব্দুর রহিম ও নূরে আলম। ভোলার পুলিশ সুপার ও ভোলা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ সবার নাম ও পরিবারের সদস্যদের পরিচয় প্রকাশ করা হয় বিএনপির পক্ষ থেকে। এরপর নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর র্যালিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন শাওন প্রধান।
শাওন প্রধান নিহত হওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এভাবে যারা আমাদের নেতাকর্মীদের হত্যা করবে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে না। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মামলা হবে। আজকে বিচার না পেলেও একদিন আমরা এর বিচার পাব। জনগণ এদের বিচার করবে।’
বিএনপির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে নুর হোসেন মারা যাওয়া কারণে সরকারের পতন ঘটে। ২০২২ সালে এসে সরকার একই ভাবে বিএনপির দুই নেতাকে গুলি করে হত্য করল। যার কারণে তাদেরও পতন অনিবার্য। ইতিহাস সাক্ষী, রাজপথে মিছিলে গুলিতে হত্যা করে কোনো সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি।’
গত ৪ আগস্ট স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আব্দুর রহিমের স্ত্রী খাদিজা বেগম বাদী হয়ে আদালতে সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আরমান হোসেনসহ ৩৬ পুলিশ সদস্যের নামে হত্যার অভিযোগ দেয় আদালতে। কিন্তু আদালত তা খারিজ করে দেয়। নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিতে শাওন প্রধান নিহত হওয়ার ঘটনায় একইভাবে অভিযোগ দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।
বিএনপি নেতারা বলেন, ‘৪০ বছর পর যদি শেখ মুজিব হত্যার বিচার হতে পারে, তবে এখন যেসব হত্যাকান্ড ঘটছে তার বিচার একদিন বাংলার মাটিতে হবে। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনকালে একজন রাজনৈতিক নেতা কিংবা কর্মীকে পুলিশ কিংবা অন্য কেউ গুলি করে হত্যা করতে পারে না। খুন মানুষের মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার হরণের অপরাধ। একজন নাগরিকের মানবাধিকার হরণ করার অপরাধে এসব হত্যাকান্ডের বিচার হবে।’
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘যারা আমাদের নেতাকর্মী খুন করছে, গুম করছে আমরা তাদের তালিকা করছি। তেমনিভাবে বিদেশেও তাদের নামের তালিকা, তারা যাদের খুন কিংবা গুম করছেন তাদের তালিকাও তৈরি করে রাখছেন। এ ছাড়া ঢাকায় কর্মরত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কর্মকর্তারা এসব তথ্য সংগ্রহ করছেন। যারা অপকর্ম করছেন তাদের তালিকা তৈরি করে রাখা হচ্ছে। জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হলে এসব অপরাধীর, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের একদিন বিচার করা হবে।’