পাকিস্তানে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এ জন্য ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছে। তবে পাকিস্তানকে ত্রাণ পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এখনো দেয়নি বাংলাদেশ। এরই মধ্যে বাংলাদেশের এ প্রস্তাব পাকিস্তান প্রত্যাখ্যান করেছে বলে প্রতিবেদন ছেপেছে আফগানিস্তান ও ভারতের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম। সেই খবরের সূত্র ধরে প্রতিবেদন করেছে দেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমও।
বাংলাদেশ ত্রাণ পাঠানোর প্রস্তাব না দিতেই সেটি পাকিস্তান কীভাবে প্রত্যাখ্যান করল, এমন খবরে হতবাক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা। গতকাল শুক্রবার তারা বলেন, আফগানিস্তান ও ভারতের গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ত্রাণ প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কোনো সরকারি তথ্যের বরাত দেওয়া হয়নি। এমনকি প্রতিবেদনে কোনো সূত্রও উল্লেখ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গে যোগাযোগ না করেই এবং কারোর বক্তব্য ছাড়াই এ ধরনের প্রতিবেদনকে উদ্দেশ্যমূলক হিসেবে বর্ণনা করেছেন কূটনীতিকরা। এ ঘটনাকে বিব্রতকর বলেও উল্লেখ করেছেন তারা।
এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে ১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে বার্তা পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চিঠিতে তিনি বেলুচিস্তান, সিন্ধু এবং পাঞ্জাবের বিভিন্ন স্থানে আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানান।
বন্যায় মৃত্যু ও আহতদের জন্য দোয়া ও সুস্থতা কামনা করে শেখ হাসিনা লেখেন, ‘আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা জানাই। বন্যায় অনেক ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং যোগাযোগ বিঘিœত হওয়ার বিষয়ে আমরা জানতে পেরেছি এবং এ ঘটনায় গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’
তিনি আরও লেখেন, ‘বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অনেক সাধারণ বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। উভয় দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন দিক দ্বারা প্ররোচিত ঘন ঘন বিধ্বংসী বন্যার মতো অভিন্ন পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোও ভাগ করে নেয়; যা ভবিষ্যতে আমাদের সাধারণ বিপদের ইঙ্গিত দেয়। জলবায়ুসংক্রান্ত ন্যায়বিচারের স্বার্থে বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে আমাদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর উত্থাপন করার এটাই উপযুক্ত সময়। বাংলাদেশ পাকিস্তানের বন্যাদুর্গতদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এবং এ সংকটময় মুহূর্তে তাদের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা প্রসারিত করতে প্রস্তুত রয়েছে।’
‘অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে বন্যার অনুদান প্রত্যাখ্যান করেছে’ শিরোনামে প্রথমে প্রতিবেদন করে আফগানিস্তানের ‘খামা প্রেস নিউজ এজেন্সি।’ এরপর ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডসহ বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমেও এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ছাপা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের কাছ থেকে সাহায্যের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বলেছে কারণ এ ধরনের কোনো ত্রাণ সহায়তা পাকিস্তানের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে পারে।’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাকিস্তানের বন্যা পরিস্থিতিতে ত্রাণ দিতে সরকারের সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন সে বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। জরুরি ভিত্তিতে দেশটিতে ত্রাণ পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বলেও এতে তুলে ধরা হয়।
ত্রাণ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের খবর পুরোপুরি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ত্রাণ পাঠানোর বিষয়ে এখনো পাকিস্তানকে জানানো হয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও চিফ অব প্রটোকল প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে দেশের বাইরে রয়েছেন। ত্রাণ বরাদ্দ হলেও পাকিস্তানে এ ত্রাণ পাঠানো এবং দেওয়ার প্রস্তাব এখনো প্রক্রিয়াধীন। পাকিস্তান যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে এ নিয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি সেখানে এ ধরনের খবর তাদের জন্য অস্বস্তিকর।
ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্র বলছে, পাকিস্তানের লোকেরা রুটি খায়, কিন্তু আমাদের এখানে গম হয় না। তাদের অনেক তাঁবুর প্রয়োজন, আমরা তাঁবুও বানাই না। এমন কিছু পার্থক্য রয়েছে। ত্রাণ হিসেবে নগদ অর্থ দেওয়া যায় না। দেশে যেসব পণ্য তৈরি হয় বা বাড়তি থাকে সেগুলোই মূলত ত্রাণ হিসেবে দেওয়া হয়। ত্রাণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ তালিকা আমরা ফলো করি। এসবের মধ্যে বিস্কুট, পাটের চট, ওরস্যালাইন এবং পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি দিয়ে থাকি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশে যখন বন্যা হয় বা কোনো দুর্যোগ দেখা দেয়, তখনই প্রতিবেশী হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বেলায় এটির গুরুত্ব দেয় বাংলাদেশ। কিছুদিন আগেও আফগানিস্তানে আমরা ত্রাণ পাঠিয়েছি। পাকিস্তানের বন্যা পরিস্থিতির পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি প্রোগ্রাম থেকে দেশটিতে ত্রাণ পাঠানোর কথা বলেছেন। তিনি যখন বলেন, তখন এটি আমাদের জন্য নির্দেশ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে বরাদ্দের কথাও এরই মধ্যে প্রকাশ করেছে।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যার্থে জরুরি ভিত্তিতে ক্রয়পূর্বক পাকিস্তানে পাঠাতে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার; যা পাকিস্তানি মুদ্রায় ৩ কোটি ১৭ লাখ রুপিরও বেশি। ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ১০ টন বিস্কুট, ১০ টন ড্রাই কেক, এক লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ৫০ হাজার প্যাকেট খাওয়ার স্যালাইন, পাঁচ হাজার মশারি এবং দুই হাজার করে কম্বল ও তাঁবু।
কূটনৈতিক সূত্র বলছে, পাকিস্তানকে ত্রাণ পাঠাতে চাইলে ঢাকার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টে আবেদন করতে হবে। সেই ত্রাণ আকাশ নাকি নদীপথে পাঠানো হবে, এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াগত বিষয়ে এখনো অবগত নয় ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশন। এমনকি এ বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনাও পায়নি হাইকমিশন।
এ পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদে বাংলাদেশের কূটনীতিকরা পড়েছেন বেশ অস্বস্তিতে। ঘটনাটিকে ব্রিবতকর উল্লেখ করে দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বন্যা পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও ঘরবাড়ি মেরামতের কাজ চলছে। বিশেষ করে উঁচু এলাকা হওয়াতে পাহাড়ি ঢলের থেকে হওয়া বন্যার পানি দু-এক দিনের মধ্যেই নেমে যায় বা নামতে শুরু করে। সাধারণত বাংলাদেশ সমতলভূমি এবং নদীর থেকে উচ্চতা কম হওয়ায় যেভাবে বন্যার পানি আটকে থাকে পাকিস্তানের বন্যা পরিস্থিতিটা ঠিক সেরকম নয়।’
এর আগে ৩০ আগস্ট বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আর্তমানবতার সেবায় আওয়ামী লীগ সরকার সবসময় উদার। পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে ভয়াবহ বন্যা... ইতিমধ্যে আমি নির্দেশ দিয়েছি সেখানে বন্যায় কী লাগবে, সেখানে বাচ্চারা খুব কষ্টে আছে। তাদের জন্য খাবার এবং কী কী দেওয়া যেতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে বলেছি। আমরা তাদের ত্রাণ পাঠাব। আমরা যুদ্ধে (১৯৭১ সালে) জয়ী হয়েছি। সেই হিসেবে তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। আমরা সেটাই পালন করছি। জাতির পিতা আমাদের তা শিখিয়েছেন। আমরা আর্তমানবতার সেবায় তাদের পাশে আছি।’