পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স ২০০০ সালের ২৪ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে। ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে কোম্পানিটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তালুকদার মো. জাকারিয়া হোসেন। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সের শীর্ষ পদে রয়েছেন তিনি। বীমা শিল্পে জাকারিয়ার রয়েছে ৩২ বছরের অভিজ্ঞতা। শিল্পটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্বপরিস্থিতি টালমাটাল। উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সারা বিশ্বের স্বল্প আয়ের সব মানুষ কষ্টে আছে। আয়ের বেশির ভাগ অর্থ চলে যাচ্ছে খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের জোগানে। মানুষের সঞ্চয়ও কমছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বীমা খাতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে বলে জানান ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা তালুকদার মো. জাকারিয়া হোসেন। তিনি জানান, কভিডের মধ্যে বেসিক অপারেশন চালাতে পেরেছি। স্টাফদের বেতন-বোনাস-ইনক্রিমেন্ট সঠিক সময়ে দিতে পেরেছি। সম্প্রতি আরো উন্নতি হচ্ছে। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সংকট তৈরি হয়েছে। বিদেশি মুদ্রা সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে আমদানিতে লাগাম টানা হয়েছে। ব্যাংকের এলসি খুলতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭৫ থেকে শতভাগ নগদ অর্থ জমা দিতে হচ্ছে। এ জন্য এলসি খোলার পরিমাণ কমে গেছে। যার কারণে ব্যবসায়িক দিক থেকে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর আয় কিছুটা কম হচ্ছে।
দেশের বীমাশিল্পে একটি বড় সংকট হচ্ছে গ্রাহকের আস্থা। কিছু কোম্পানির কারণে গ্রাহকের আস্থায় চিড় ধরেছে। আমরা চেষ্টা করছি বীমাদাবি সঠিক সময়ে পরিশোধের। সেবা ও বীমাদাবি ছাড়াও বাজারের অস্বাস্থ্যকর কমিশন প্রতিযোগিতার মধ্যেও আমরা নিয়মনীতি মেনে কাজ করার চেষ্টা করছি। অস্বাস্থ্যকর অনুশীলনে না গিয়ে যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করে যাচ্ছি খাতটির বিকাশে।
দেশে বীমা নিয়ে নেতিবাচক প্রচার হয় বেশি। দাবিকে প্রাধান্য দিতে হবে। দাবি যত সুস্থভাবে পরিশোধ করা হবে, মানুষের আস্থা তত বাড়বে। অন্যান্য কার্যক্রমকে ঊর্ধ্বে রেখে যত দ্রুত সম্ভব দাবি পরিশোধ করতে হবে এবং দ্রুত সেবা দিতে হবে।
বীমাদাবি পরিশোধে আইডিআরএ ৯০ দিন সময় বেঁধে দিয়েছে। যদি কাগজপত্র সব ঠিক থাকে, আমরাও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা পরিশোধ করছি। অসংগতি থাকলে সময় বেশি লাগতে পারে।
বীমায় প্রচারণা ও সচেতনতার অভাব রয়েছে জানিয়ে জাকারিয়া হোসেন বলেন, বীমা মেলা, সরকার কর্তৃক ১ মার্চ বীমা দিবস ঘোষণা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। এ জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি একান্তভাবে কৃতজ্ঞ।
চলতি বছর দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স মূলত ফায়ার, মোটর, নৌ ও শিল্প-কারখানার বীমাতেই বেশি আগ্রহী। তবে ইন্স্যুরেন্সের বাইরে জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িত আছে ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স। শীতবস্ত্র বিতরণ এবং বন্যাদুর্গতের মধ্যে খাদ্য ও ত্রাণ বিতরণ ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্সের সার্বিক কার্যক্রমের অংশ। কোম্পানির চেয়ারম্যান মোজাফফর হোসেন পল্টু নিজে এই কার্যক্রমগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন। ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স বীমা সেবার পাশাপাশি বিভিন্ন জনকল্যাণকর কাজে আছে এবং ভবিষ্যতেও জনকল্যাণমূলক কাজে জড়িত থাকবে।
উন্নত বিশ্বের সাধারণ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তায় বীমা খাতের ব্যাপক অবদান রয়েছে। বাংলাদেশে এমন ভূমিকা বীমাশিল্প রাখতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জাকারিয়া হোসেন বলেন, অবশ্যই সম্ভব। যেমন বড় বড় দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন ঘটনার দাবিগুলো পরিশোধ হচ্ছে। রানা প্লাজা থেকে শুরু করে গার্মেন্টস দুর্ঘটনা, জাহাজডুবি, লঞ্চডুবি, সড়ক দুর্ঘটনাসহ সব দাবিই কোনো না কোনোভাবে ম্যানেজ হচ্ছে। দাবি ম্যানেজ না হলে তো কোনো ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ব্যবসা করতে পারত না।
তবে আমাদের বীমার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। যেমন ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স; বিশেষ করে এয়ার ট্রাভেলে আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে একেকজন যাত্রী যদি সর্বনিম্ন ১০০ টাকার একটি ট্রাভেল বীমা করেন, তাহলে দৈনিক কয়েক কোটি টাকা বীমা খাতে লেনদেন হতে পারে। ছোট-বড় যানবাহন, ফ্ল্যাট, বাসাবাড়িকেও বীমার আওতায় আনতে হবে। যেসব সেক্টরে সরকারের ভ্যাট ও ট্যাক্স অনুমোদন আছে তার সব আঙিনাকে বীমার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাহলে বীমা খাত দেশের সার্বিক উন্নয়নে জিডিপিতে টেকসই অবদান রাখতে পারবে।