বিএনপি নেতাদের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে। শুধু যে কর্মসূচি পালনের সময় হামলা হচ্ছে তা নয়, এর বাইরেও রাস্তাঘাটে বা বাড়িঘরে হামলা হচ্ছে। এসব হামলার জন্য ক্ষমতাসীন দলকে দায়ী করছে বিএনপি। তবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, এসব ঘটনা উসকানির কারণে হচ্ছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে-বিদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হয়ে তাদের ব্যর্থতা ঢাকতে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে। বিএনপিকে উসকানি দিয়ে সন্ত্রাসের পথে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিএনপি তাদের উসকানিতে পা দেবে না। বরং রাজনৈতিকভাবে দেশের জনগণকে নিয়ে মোকাবিলা করবে।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন তারা রাজপথে ছেড়ে দেবেন না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তারা রাজপথে আমাদের মোকাবিলা না করে নেতাদের বাসা-বাড়িতে হামলা করা শুরু করে। পরিবারের সদস্য যারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয় তাদের ওপরও হামলা করা হচ্ছে।’
বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হবে না এমন ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের নীতিনির্ধারণী কার্যনির্বাহী সংসদের সর্বশেষ সভা থেকে বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা না দেওয়ার এ ঘোষণা আসে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তার উল্টোচিত্র। বিক্ষোভ সমাবেশে বাধা দেওয়া ও হামলার ঘটনা ঘটছে। এমনকি কর্মসূচির বাইরেও রাস্তাঘাটে ও বাড়িঘরে হামলার ঘটনাও আছে। ফলে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, কথা দিয়ে কথা না রাখার কারণ কী? ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা দাবি করছেন, বিএনপি সরকারবিরোধী কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে নানা উসকানি দিচ্ছে বলেই মারামারি-সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।
কিন্তু বিএনপি নেতা বরকত উল্লা বুলুর ওপর যাত্রাপথে হামলা হয়েছে। সেখানে তাহলে কী ধরনের উসকানি ছিল এমন প্রশ্ন অনেকেরই।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হামলার ঘটনা একেবারেই বিনা উসকানিতে সেটা বলা যাবে না। বিএনপি নেতাকর্মীদের উসকানির তথ্য আমাদের কাছে আছে। আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি। পর্যালোচনা করছি।’
দলটির সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হামলার কারণগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।’ তবে প্রাথমিকভাবে হামলার ঘটনায় উসকানির তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন ফারুক খান।
গত শনিবার রাতে রাজধানীর বনানীতে বিএনপির মোমবাতি প্রজ¦ালন কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয়। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা হামলা করেছে বলে বিএনপির অভিযোগ।
বনানীতে ওই হামলার ঘটনায় আহত হয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল। একই দিন সন্ধ্যায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লা বুলু স্ত্রীসহ নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থেকে ঢাকা আসছিলেন। পথে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলায় চা পানের জন্য গাড়ি দাঁড়ালে তার ওপর হামলা চালানো হয়। এতে তার মাথা ফেটে যায়। হাত ভেঙে যায় তার স্ত্রীর। তাদের গাড়ির চালকও আহত হন।
বুলুর ছেলে সানিয়াতের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা লোহার রড, লাঠিসোঁটা নিয়ে তার মা-বাবার ওপর হামলা করে। বুলু তার স্ত্রীসহ রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বনানীর ওই কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রেখেছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার বুঝে গেছে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারবে না। এ অবস্থায় আমাদেরকে ভোটের বাইরে রাখতে আওয়ামী লীগ ও পুলিশ যৌথভাবে হামলা করছে এবং বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার চেষ্টা করছে। তবে তাদের হামলা-মামলায় ভীত হয়ে এবার আমরা রাজপথ ছেড়ে যাব না। রাজপথে আছি, থাকব। সরকারের পতন ঘটিয়ে ঘরে ফিরব।’
জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও গুম-খুনের প্রতিবাদে দেশজুড়ে কর্মসূচি শুরুর প্রথম দিন গত ২২ আগস্ট বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীর লক্ষ্মীপুরের বাসভবনে হামলা হয়। হামলাকারীরা তার বাসার জানালা, চেয়ার, টেবিল, এসি ভাঙচুর করে। হামলায় আহত হন এ্যানীর ভাই ও ছেলেসহ চারজন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে।
গত ২৮ আগস্ট মধ্যরাতে যশোরে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব সাবেরুল হক সাবু, জেলা বিএনপির নেতা মিজানুর রহমান খান ও দেলোয়ার হোসেন খোকনের বাড়িতে হামলা হয়। অমিত তখন দেশ রূপান্তরের কাছে অভিযোগ করে বলেছিলেন, ‘প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে করে হামলা চালায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা। এ সময় তাদের বাড়ির গেট, দরজা-জানালা ভাঙচুর করে তারা।’
এরপর আবার অমিতের গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটে। ওইদিন তিনি যশোরের আদালত থেকে বাসায় ফিরছিলেন।
এর আগে গত ৬ মে দিনদুপুরে বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন শওকতের রাজশাহী নগরের রানীনগর মোন্নাফের মোড় এলাকার বাসভবনে মোটরসাইকেল আরোহী দুই ব্যক্তি একটি হাতবোমা ছুড়ে মারে। এটি বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় ব্যালকনির দেয়ালে আঘাত করে। এ সময় বিকট শব্দে এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ঘটনার সময় তিনি মসজিদে থাকলেও তার ফুফু ও মেয়েসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য বাসায় ছিলেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা করে উসকে দিতে চায়। তারা চায় বিএনপি আইন নিজের হাতে তুলে নিক। অতীতের মতো তাদের পাতানো ফাঁদে ফেলতে চায়। বিএনপিকে একটি সন্ত্রাসী দল হিসেবে দেশে-বিদেশে চিহ্নিত করতে চায়।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার ভীত হয়ে সমাবেশে হামলা করছে। শুধু তাই নয়, নেতাদের বাড়িঘরে হামলা করছে। প্রথমে নিচের সারির নেতাদের ওপর হামলা করলেও এখন জ্যেষ্ঠ নেতাদের ওপর হামলা করছে।’