উপকূলীয় শহর জলবায়ুসহিষ্ণু প্রকল্প

অত্যধিক ব্যয়ে আপত্তি পরিকল্পনা কমিশনের

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর জলবায়ুঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার বিভাগ ২ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ‘উপকূলীয় শহর জলবায়ুসহিষ্ণু প্রকল্প’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। এতে অর্থায়ন করবে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। কিন্তু প্রকল্পটিতে কিছু অস্বাভাবিক ব্যয় প্রস্তাব থাকায় তা কমানোর পরামর্শ দিয়েছে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও দুই বছর কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত পিইসি সভায় প্রকল্প ব্যয় ও মেয়াদ বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়। সভায় জানানো হয়, প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত, অর্থাৎ ৭ বছর প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা বিভাগের ২০২২ সালে জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, বিনিয়োগ প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদকাল হবে সর্বোচ্চ ৩ বছর।

এ বিষয়ে ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সচিব সত্যজিৎ কর্মকার সভায় মন্তব্য করেন, প্রকল্পের মেয়াদ বেশি হলে আবর্তক ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং ৭ বছরে কমপক্ষে তিনবার রেইট শিডিউল বৃদ্ধি পাবে। ফলে প্রকল্পের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। এ কারণে যত কম সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যাবে, প্রকল্প এলাকার জনগণ ও দেশ তত বেশি উপকৃত হবে।

সভায় ইআরডি প্রতিনিধি জানান, এডিবির সঙ্গে ঋণ প্রক্রিয়াকরণের সময় সর্বোচ্চ সামাজিক উপকার বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ৭ বছর নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের যুগ্ম প্রধান বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনার সময় সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন ও বাস্তবায়ন নীতিমালাকে প্রাধান্য দিতে হবে। অবশ্য সভায় প্রকল্পের মেয়াদ ৭ বছরের পরিবর্তে ৫ বছর করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্প প্রস্তাবে ২৯টি পিকআপ ভ্যান ও ৭টি জিপ কেনার প্রস্তাব করা হলেও পিইসি সভায় শুধু ৩টি জিপ কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাবে যে ৭টি জিপ কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তার প্রতিটির দাম পড়বে এক কোটি টাকা করে। ২৯টি ডাবল কেবিন পিকআপ চাওয়া হয়েছে। যার প্রতিটির দাম পড়বে প্রায় ৭৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া ২৪টি মোটরসাইকেল কেনার কথা বলা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ফলে প্রতিটি মোটরসাইকেলের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। দুটি মাইক্রোবাস কেনার কথা বলা হয়েছে, যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

অন্যদিকে প্রকল্পটিতে ২৫২ জনবলের প্রস্তাব করা হলেও এর বিপরীতে অর্থ বিভাগ মাত্র ৬৫ জনের অনুমোদন দিয়েছে।

মাত্র তিনটি যানবাহন কেনা ও জনবল কমানোর যুক্তি হিসেবে সভায় বলা হয়, প্রস্তাবের বিপরীতে অর্থ বিভাগ থেকে তিনজন গাড়িচালকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ কারণে মাত্র তিনটি জিপ কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জনবল ও যানবাহন খাতে প্রকল্পের অর্থ সাশ্রয় হবে।

এ ছাড়া প্রকল্পের পরামর্শক ব্যয় ছাড়াও জ্বালানি, মেরামত, স্থানীয় ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, কম্পিউটার, সেমিনার, প্রকৌশল যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন রাজস্ব ও মূলধন খাতে ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। সভায় একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় ব্যয় যৌক্তিকীকরণ কমিটির মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় যৌক্তিক করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরামর্শক নিয়োগ প্রসঙ্গে পিইসি সভায় জানানো হয়াভভাসসস, সদ্য সমাপ্ত প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত প্রকল্পের ৩০ শতাংশ রেডিনেস সম্পন্ন করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৭০ শতাংশ কার্যক্রমও একই প্রকৃতির। তারপরও প্রকল্পে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকার পরামর্শক ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। ফার্মের মাধ্যমে পরামর্শক সেবা গ্রহণ না করে ব্যক্তি পরামর্শক নিয়োগ করা হলে প্রকল্পের কাজ অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে। এ কারণে পরামর্শক ফার্মের পরিবর্তে ব্যক্তি পরামর্শক নিয়োগ করে প্রকল্পের কাজ করা যায় কি না, তা স্থানীয় সরকার বিভাগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

জানা যায়, প্রকল্পে ২১টি মাল্টিপারপাস মার্কেট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো নকশা প্রকল্পে নেই। চারটি বাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বাস টার্মিনাল নির্মাণের স্থান নির্বাচনের ভিত্তি ও নকশা নেই। প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায় পণ্যের জন্য ১৫টি, সেবার জন্য ৪টি এবং কার্যের জন্য ২০৫টি, অর্থাৎ মোট ২২৪টি প্যাকেজ প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অত্যধিক।

প্রকল্পের আওতায় ৬৬ একর ভূমি অধিগ্রহণ, ২৯৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ, ৯২০ মিটার ব্রিজ নির্মাণ, ১৪০ কিলোমিটার ড্রেনেজ কাজ, ২৩টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, ২২টি বস্তি উন্নয়ন, ৪টি বাস টার্মিনাল ও ২টি গ্রিন স্পেস নির্মাণ করা হবে।

বরগুনার পাথরঘাটা, বেতাগী, বরিশালের বানারীপাড়া, বাকেরগঞ্জ, মেহেন্দিগঞ্জ, মুলাদী, গৌরনদী, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি, ঝালকাঠি ও নলছিটি, ভোলার লালমোহন, চরফ্যাশন ও বোরহানউদ্দিন পৌরসভায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া বাগেরহাটের বাগেরহাট, মোরেলগঞ্জ; খুলনার চালনা, পাইকগাছা, সাতক্ষীরার কলারোয়া, শরীয়তপুরের জাজিরা ও ভেদরগঞ্জ পৌরসভা রয়েছে প্রকল্পের আওতায়।

প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় শহরগুলোর জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীলতা শক্তিশালী করা হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন করা হবে নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান। উপকূলীয় ১৯টি জেলার মধ্য ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ১১টি জেলাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁঁকিপূর্ণ এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মোট ৪৩টি পৌরসভার উন্নয়ন করা হবে। অগ্রাধিকারভিত্তিতে ২২টি পৌরসভাকে বেছে নেওয়া হয়েছে।