অসহিষ্ণু বাস্তবে সম্প্রীতি সন্ধান

সারা দেশে সামাজিক-সম্প্রীতি কমিটি গঠন ও সম্প্রীতি সমাবেশের জন্য স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে এ কমিটি করা হবে। সিটি করপোরেশনের মেয়রকে প্রধান করে ১৩ সদস্য, জেলা প্রশাসককে প্রধান করে ২৩ সদস্য এবং উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরমেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে প্রধান করে ১৪ সদস্যের কমিটি হবে।

বৈশ্বিক ও দেশি বাস্তবতায়, ধর্মীয় উগ্রবাদের ও জঙ্গিবাদের নেতিবাচক চর্চার ফলে বিশ^শান্তি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি, সম্প্রীতিবোধ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ দরকার। তার জন্যই এই উদ্যোগ।

সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একত্রিত করে ধর্মীয় উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ, সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদকে প্রতিহত করাই এই কমিটির লক্ষ্য। কমিটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে অর্থ প্রয়োজন হবে তা সরবরাহ করা হবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব আয় থেকে।

ইতিমধ্যে কমিটি গঠন ও এর কার্যক্রম-সংক্রান্ত চিঠি স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে সব সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার আলোকে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে চলতি মাসের মাঝামাঝি সিনিয়র সহকারী সচিব (ইউনিয়ন পরিষদ) জেসমীন প্রধান ও উপসচিব (প্রশাসন) এ কে এম মিজানুর রহমান আলাদা আলাদা চিঠি পাঠান।

স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, “আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ‘সামাজিক-সম্প্রীতি কমিটি গঠন ও সম্প্রীতি সমাবেশ’ বিষয়ক চিঠি পেয়েছি। সব সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদকে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এই কমিটির কার্যপরিধি কী হবে তাও বলে দেওয়া হয়েছে।”

যুগ্ম সচিব বলেন,  ‘সম্প্রীতি সমাবেশ বা অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে কী পরিমাণ টাকা খরচ হবে তার পরিকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। প্রতি মাসে কয়টি সভা-সেমিনার করা যাবে তাও নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনসাপেক্ষে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান তাদের রাজস্ব আয় থেকে এ কর্মসূচিতে টাকা খরচ করতে পারবে।’

স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ‘সামাজিক-সম্প্রীতি কমিটি গঠন ও সম্প্রীতি সমাবেশ’ এবং এই বিষয়ক কার্যক্রম-সংক্রান্ত একটি চিঠি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সামাজিক সম্প্রীতি কমিটি গঠন ও সম্প্রীতি সমাবেশ-সংক্রান্ত নির্দেশনা রয়েছে। সিটি করপোরেশনে মেয়র সভাপতি আর জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভায় পৌরমেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদে ইউপি চেয়ারম্যান সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠিতে কমিটির কার্যপরিধি সম্পর্কে বলা হয়েছে, কমিটি জেলায় সম্প্রীতি-সমাবেশ, উদ্বুদ্ধকরণ কার্যকম, সভা আয়োজন ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধনকে সংহত রাখা, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ধর্মীয় ও সামাজিক বন্ধনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবসময় সচেষ্ট থাকবে। ধর্মীয় উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ, সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রচার ও উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম গ্রহণ করবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার রোধের জন্য প্রয়োজনীয় প্রচার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করবে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ সব উপাসনালয়ের নিরাপত্তা দিতে কার্যকর সহায়তা দেবে। ধর্মীয় উৎসব যথাযথ ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপনের পরিবেশ অক্ষুন্ন রাখতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে এবং বিভিন্ন ধর্মের শান্তি ও সৌহার্দ্যরে বাণীর ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করবে।

সূত্র জানায়, বৈশ্বিক ও দেশি বাস্তবতায়, ধর্মীয় উগ্রবাদের ও জঙ্গিবাদের নেতিবাচক চর্চার ফলে বিশ^শান্তি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি, সম্প্রীতিবোধ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থা শঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এর কারণে মানুষের আচরণিক ও মনোজাগতিক অস্থির আচরণ, উগ্র আচরণও বেড়েছে। এটা এখন ‘নিও নরমাল’ ফ্যাক্টর। দেশীয় পরিপ্রেক্ষিতে এবং বৈশি^ক পরিপ্রেক্ষিতেও। মানুষ এখন বেজায় অসহনশীল। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ দরকার। তার জন্যই এই উদ্যোগ।   

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রীতি সমাবেশ বা বিভিন্ন সেমিনারে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে। সিটি করপোরেশনে মেয়রকে সভাপতি ও প্রধান সমাজকল্যাণ কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, পাঁচজন কাউন্সিলর, দুজন শিক্ষাবিদ, দুজন স্থানীয় মান্য ব্যক্তি, একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন নারী সমাজসেবক, একজন ইমাম, একজন পুরোহিত, একজন হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, পূজা উদযাপন পরিষদের একজন সদস্য ও পাঁচজন স্বেচ্ছাসেবী।