গত রাতে দারুন একটা সংবাদ চোখে পড়ল সেটা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের একদল গবেষকের কলাবোরেশনে করা একটি আর্টিকেল "Science" জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বের সেরা দুটি জার্নালের মধ্যে "সাইন্স" জার্নাল একটি আর অন্যটি হলো "নেচার"! এই দুটি জার্নালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর হলো যথাক্রমে ৬৩.৭১ এবং ৬৯.৫! এইটা যে কত বড় এক প্রাপ্তি সেটা আমরা বুঝতে পারছি? গল্পটা শুধু এখানেই শেষ না। তাদের এই আর্টিকেলটি ওই জার্নালটির এই সপ্তাহের ইস্যুতে কভার ছবি হিসাবে এসেছে যেখানে দেখানো হচ্ছে বাংলাদেশের বুড়ো ধান রূপনের চিত্র। অর্থাৎ আমাদের বিজ্ঞানীদের এই আর্টিকেলের সুবাদে বিশ্ব বাংলাদেশকে নতুন করে চিনবে। এই আর্টিকেলের মোট ৬ জন অথরের মধ্যে একজন ব্যাতিত বাকি পাঁচজনই বাংলাদেশী। এর মধ্যে মোহাম্মদ সামসুদ্দোহা এবং মোহাম্মদ ইজাজুল হক এই দুইজন বাংলাদেশী বর্তমানে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে (UCL এর QS ওয়ার্ল্ড রেঙ্কিং হলো ৮) গবেষণা করছেন, সারা নওরীন বুয়েটে, আনোয়ার জাহিদ বাংলাদেশ ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডে এবং কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ব বিভাগের।
বাংলাদেশের উচিত এই সপ্তাহকে উদযাপন করা। এই সপ্তাহকে বিজ্ঞান সপ্তাহ হিসাবে ঘোষণা দেওয়া। বুয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবপেইজে এই সংবাদটি বহুল প্রচারের ব্যবস্থা করা যাতে এই দেশের সকলে জার্নালটির নাম জানে, যাতে আগামী প্রজন্ম গবেষণায় অনুপ্রাণিত হয়। এর চেয়ে ছোটখাটো অনেক সংবাদ আমাদের মিডিয়া ভাইরাল করে ফেলে। অথচ এই সংবাদটি হয়তো তেমন প্রচারই পাবে না কারণ আমরাতো গবেষণার মর্মই বুঝি না। এইরকম একটি জার্নালে আর্টিকেল প্রকাশিত হলে যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই আর্টিকেলের অথর সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব সাইটের প্রথম পেইজে ডাইনামিক আকারে প্রকাশ করে। তাহলেই না রেঙ্কিং বৃদ্ধি পাবে।
একটি গবেষণাপত্রের কারণে বাংলাদেশের ছবি বিশ্বের সেরা জার্নালের কভার পেইজে এসেছে। এই আর্টিকেলটিই বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা এম্বাসেডর। যেই দেশের ৫১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দ মাত্র ১০ হাজার ৫১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা আর র বাজেট অনুমোদন করেছে।শিক্ষায় বাজেট ও ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বাজেট হলো ১৫০ কোটি টাকা। পৃথিবী সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বাজেট আমাদের ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মোট বরাদ্দের চেয়ে হয়। গতকাল দেখলাম আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএম কেনার জন্য ৮ হাজার ৭ শত কোটি টাকা আর ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট হলো প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। এইটা কি কোন সভ্য দেশে হতে পারে? এই দেশে লেখাপড়া ও গবেষণা যে কত অবহেলিত তা বুঝতে কি রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়া লাগে? এই তুলনাই আমাদের সরকারের জ্ঞানের দৈন্যতা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে যায়।
এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোন শিক্ষকরা ক্ষমতাবান? যেই শিক্ষকরা গবেষণা ও পড়াশুনা না করে নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থে ও দলের স্বার্থে কু-রাজনীতি করে। আমাদেরকে এই বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এই পৃথিবীতে অর্থবিত্তে ও ক্ষমতায় সেই দেশগুলোই এগিয়ে যারা শিক্ষা ও গবেষণায় এগিয়ে। অর্থবিত্ত ও ক্ষমতায় উন্নয়নের আর কোন বিকল্প রাস্তাই নাই। বিশ্ব আমাদেরকে গুনে না। বিশ্বসেরা মিডিয়া আমাদের কোন সংবাদ সাধারণত প্রচার করে না কারণ এই পৃথিবী কেবল অর্থবিত্ত আর ক্ষমতার পূজারী। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও শিক্ষায় জিডিপির ২% এরও কম বরাদ্দ দেয়। এই দেশ কিভাবে আগাবে? চুরি দুর্নীতি করার জন্যতো টাকার অভাব হয় না? ইভিএম কেনার জন্যতো টাকার অভাব হয় না? উন্নয়নের মুলে হলো মানুষ। সেই মানুষের মস্তিষ্কের উন্নয়ন না ঘটালে দেশের উন্নয়ন হবে না। তাই জনগণকে সরকারের উপর চাপ দিতে হবে যেন শিক্ষায় ন্যূনতম জিডিপির ৫% বরাদ্দ দেয়। আগামী ১০ বছর যদি শিক্ষায় জিডিপির ৫% বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং সঠিকভাবে সেই টাকা খরচ করা হয় দেশ বদলে যাবে। পৃথিবী অবাক সত্যিকারের উন্নত জাতি হিসাবে বাংলাদেশকে দেখবে। বাংলাদেশের পাসপোর্টের মূল্য বাড়বে, মানুষের সম্মান বাড়বে।
আমাদেরতো এই জার্নালের সাবস্ক্রিপশন নাই তাই কন্যা বিয়াংকাকে লিংক পাঠিয়ে বললাম আর্টিকেলটি ডাউনলোড করে আমাকে পাঠাও। সাথে সাথে ও পাঠিয়ে দিয়েছে। অসম্ভব প্রয়োজনীয় একটি আর্টিকেল। এই দেশের কৃষি নিয়ে, গ্রাউন্ড ওয়াটার ও সেচ নিয়ে এই আর্টিকেল। দারুন!
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত)
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক