গারো পাহাড় থেকে হিমালয় জয়

বাংলাদেশের এক সীমান্তবর্তী জনপদ কলসিন্দুর। ময়মনসিংহ জেলার ধোবাউড়ার নিভৃত এক গ্রাম কলসিন্দুর। পূর্বদিকে ভারতের মেঘালয়, সকালের প্রথম রোদ এসে আলোকিত করে গারো পাহাড়কে। কাঁটাতার দুটো দেশকে আলাদা করলেও হাজার বছরের আবহমান জীবনযাত্রাকে আলাদা করতে পারেনি, সীমান্তের দুই পাড়েই তাই বেশ কিছু আদিবাসী পরিবারেরও বসবাস।

বাংলাদেশের এমন প্রত্যন্ত জায়গা থেকে রাজধানীতে আসার পথটাই সুগম নয়। অথচ এই কলসিন্দুরের মেয়েরাই বাংলাদেশের মানচিত্র ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছেন হিমালয়ের দেশ নেপালে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা বাংলাদেশ নারী দলের ৮ ফুটবলারই কলসিন্দুর গ্রামের। এই মেয়েদের ফুটবল খেলার স্বপ্নটা দেখিয়েছিলেন কলসিন্দুর গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সময়ের শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক মফিজ উদ্দিন। বর্তমানে রণসিংহপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মফিজ উদ্দিন জানিয়েছেন, ‘শুরুর দিকে স্কুল প্রশাসন ও পরিবার থেকে অনেক অসহযোগিতা পেলেও এখন মেয়েদের সাফল্যে অভিনন্দন জানাচ্ছেন সবাই।’

মারিয়া মান্ডা, সানজিদা আখতার, শিউলি আজিম, তহুরা খাতুন, শামসুন্নাহার, শামসুন্নাহার জুনিয়র, সাজেদা খাতুন ও মার্জিয়া আক্তারের বাড়ি কলসিন্দুরে। বঙ্গমাতা গোল্ডকাপে খেলার জন্য দল গঠন করতে গিয়েই এই মেয়েদের ফুটবলে আগ্রহী করে তোলেন ‘মফিজ স্যার’। দেশ রূপান্তরকে জানালেন শুরুর সেই দিনগুলোর কথা ‘লোকজন মেয়েদের খেলতে দিতে চাইত না। বলত হাফপ্যান্ট পরে মেয়েরা ফুটবল খেলবে এ কেমন কথা। এই মেয়েগুলো বেশিরভাগই অভাবী ঘরের সন্তান। বাবা-মা খেলতে দিতে চাইত না, তবে অনুশীলনে খাবার দিতাম সেটার জন্য অনেকে আসত।’ উঠতি বয়সী শরীরের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর মতো টাকা কোথায় স্কুলশিক্ষক মফিজের কাছে। চেয়েচিন্তে আনা টাকায় কাঁচা ছোলা আর কলাটাই কিনতে পারতেন বেশি, দুধ-ডিম দিতে পেরেছেন কমই। মফিজকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে সরকারি বিস্কুট। দরিদ্র অঞ্চলে স্কুলে শিক্ষার্থীরা যেন অন্তত খাবারের টানে আসে, সে জন্য সরকার ও দাতা সংস্থার পক্ষ থেকে দেওয়া হতো বিস্কুট। সেই বিস্কুট খাইয়েই অনুশীলন করিয়েছেন মারিয়া-সানজিদাদের।

খেলতে আসতে হবে ঢাকায়, কিন্তু টাকা নেই এমন হয়েছে বহুবার। কখনো উপজেলা প্রশাসন, কখনো স্কুল কর্র্তৃপক্ষের কাছে হাত পেতেছেন। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ মিলেছে কমই। তাই হাত পড়েছে নিজের সঞ্চয়ে। এভাবেই এই মেয়েদের ফুটবলের তালিম দিয়েছেন মফিজ স্যার। আর সেটা করতে গিয়ে বন্ধু-বান্ধব, পরিবার, এমনকি সন্তানদের কাছেও পেয়েছেন দুর্ব্যবহার ‘আমাদের এখানে একটা সমিতি আছে, ফ্রেন্ডস ক্লাব নামে যেটায় আমি সভাপতি। সেখানে আমাকে নিয়ে মিটিং হয়েছে যেন আমি ফুটবলের সঙ্গে আর না থাকি। আমার স্ত্রী আমার বন্ধু-বান্ধবদের কাছে বলেছে আমাকে ফুটবল থেকে সরিয়ে আনতে। আমার সন্তানরাও আমাকে বলত যে আমরা তো তোমার সন্তান না। তোমার সন্তান হচ্ছে ফুটবলাররা।’

তবে আস্তে আস্তে মেয়েদের ফুটবলে সাফল্য আসার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিকূলতা কেটেছে মফিজের। এলাকায় মানুষজন মেয়েদের সাফল্য দেখে এখন অন্য মেয়েদেরও আসতে দিচ্ছে ফুটবলে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি মফিজ স্যার আর নেই কলসিন্দুরে, ‘আমি পদোন্নতি পেয়ে এখন রণসিংহপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। এখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা কম, আর ধোবাউড়ার সবচেয়ে বড় মাদ্রাসাটি আমার স্কুলের কাছেই। তাই এখানে মেয়েদের ফুটবল খেলাটা সহজ নয়। আমি চেষ্টা করেছিলাম, পারি নাই। আসলে সব জায়গায় সবকিছু হয় না’ আক্ষেপ নিয়েই বলছিলেন তিনি। তাহলে কি কলসিন্দুর থেকে উঠে আসবে না আর কোনো সানজিদা-মারিয়ারা? এই প্রশ্নের উত্তর মফিজ ছেড়ে দিয়েছেন সময়ের হাতে, ‘কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে প্রধান শিক্ষিকা, তার আর দুই-আড়াই বছর চাকরির মেয়াদ আছে। উনি অবসরে গেলে চেষ্টা করব কলসিন্দুরেই বদলি হয়ে আসতে। তারপর বাকিটা...।’

২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের হ্যাটট্রিক শিরোপা জয় কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই মেয়েরাই আসলে গড়ে দিয়েছেন সাফজয়ী নারী দলের ভিতটা। ফুটবল খেললে ভাত জোটে, সম্মানও জোটে। ফুটবল খেলেই গারো পাহাড় থেকে গিয়ে জেতা যায় হিমালয়। তাই তো এই গ্রামের মানুষরা এখন আর মেয়েদের ফুটবল খেলার দিকে বাঁকা চোখে তাকান না, বরং দেখেন সম্ভাবনা। কিন্তু সেই স্বপ্ন দেখানো মানুষটাই তো এখন নেই কলসিন্দুরে।