কন্টেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের যেসব শর্তে লাইসেন্স নিয়েছিল তার কোনোটাই যথাযথভাবে মানেনি চট্টগ্রামের বিএম কন্টেইনার ডিপো। সীতাকুন্ডে অবস্থিত কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকান্ডের পর কাস্টমস কর্তৃপক্ষের তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তদন্ত কমিটির আট দফা সুপারিশের পর চট্টগ্রামের বিএম কন্টেইনারের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শাও নোটিস দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রামের শীর্ষ পাঁচটি বড় অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ডিপোর (আইসিডি) মধ্যে অন্যতম বিএম কন্টেইনার ডিপোটি যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার পাশাপাশি কাস্টমসের অন্যান্য আদেশ লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়েছে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে।
গত ২৪ আগস্ট সরকারের উচ্চ-পর্যায়ের কাছে জমা দেওয়া কাস্টমস কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিপোটি আন্তর্জাতিক মান না থাকা সত্ত্বেও রপ্তানিমুখী কোম্পানি আল-রাজি কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেডের হাইড্রোজেন পারক্সাইডের পাত্র সংরক্ষণ করেছে। রপ্তানিকারক ও ডিপো একই মালিকানায় থাকায় আল-রাজি কেমিক্যাল ডিপোর খোলা জায়গাটিকে গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করে এবং শুল্ক মূল্যায়নের পর চালান ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে সেখানে রাসায়নিক রেখে দেয়। বিষয়টি ডিপো মালিকরা কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে জানায়নি। কন্টেইনার ডিপো হাইড্রোজেন পারক্সাইডের মতো দাহ্য রাসায়নিকের হ্যান্ডলিং এবং কন্টেইনার সংরক্ষণের বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ডেঞ্জারাস গুডস নীতি অনুসরণ করেনি। আগুনের ঘটনায় যে রাসায়নিক পণ্যের উপস্থিতি দায়ী সে সম্পর্কেও ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সঠিক তথ্য দেয়নি ডিপো কর্তৃপক্ষ। এমনকি, ডিপোতে পর্যাপ্ত ফায়ার সেফটি সিস্টেম এবং ফায়ার হাইড্রেন্ট ছিল না। ইন্টারন্যাশনাল শিপ অ্যান্ড পোর্ট ফ্যাসিলিটিস (আইএসপিএস) অনুসারে এটিতে ফাস্ট-এইড চিকিৎসা সুবিধা এবং সুরক্ষা ব্যবস্থারও অভাব ছিল।
চলতি বছরের ৪ জুন বিএম কন্টেইনারে ভয়াবহ অগ্নিকা- ও বিস্ফোরণে ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন দুই শতাধিক। এ ঘটনার পরের দিন ৫ জুন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের দেওয়া কারণ দর্শাও নোটিসে বলা হয়েছে, শর্ত না মানায় কেন বিএম কন্টেইনার ডিপোর লাইসেন্স বাতিল করা হবে না, তা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে জানাতে হবে। বিএম কন্টেইনার কর্তৃপক্ষ জবাব না দিলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আইন ১৯৬৯ অনুযায়ী নিষ্পত্তি করবে বলে নোটিসে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিএম কন্টেইনারের পক্ষে স্মার্ট গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক মেজর (অব.) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএম কন্টেইনারে দুর্ঘটনার সময় আমি চট্টগ্রামে ছিলাম। তখন তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছি। আমি এখন ঢাকায় অবস্থান করছি। এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।
ডিপোতে থাকা কন্টেইনারগুলো পরিচালনার জন্য বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীনে কাস্টম কর্তৃপক্ষের দেওয়া বিভিন্ন বিধিনিষেধের মধ্যে চলতি বছরের ২২ আগস্ট থেকে আংশিকভাবে কাজ করছে বিএম কন্টেইনার ডিপো।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইসিডিএ) সভাপতি নুরুল কাইয়ুম গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রামে কাজ করা বড় কন্টেইনার ডিপোগুলোর মধ্যে বিএম কন্টেইনার একটি বড় কন্টেইনার ডিপো। তাদের কিছু সমস্যা ছিল। কাজ করতে গেলে সবারই কমবেশি ঘাটতি থাকে। বিএম কন্টেইনারও তার বাইরে নয়। এখন সরকার যেটা ভালো মনে করবে সেটাই করবে। তবে বিএম কন্টেইনার ডিপোর লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত করলে কন্টেইনার হ্যান্ডেলিংয়ে ব্যাঘাত ঘটবে। একটা বিষয় মনে রাখা উচিত। কোনো উদ্যোক্তাই নিজেদের প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির জন্য বিনিয়োগ করে না।
নুরুল কাইয়ুম আরও বলেন, অফ-ডকের প্রতিটির জন্য প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। এখন বন্ধ করে দেওয়া হলে আইসিডির বিনিয়োগকে ঝুঁকিতে ফেলবে। বর্তমানে সমুদ্রবন্দরের প্রায় ১৯টি অফ-ডক সবধরনের রপ্তানি পণ্য এবং ৩৮টি আমদানি পণ্য পরিচালনা করে।