ইসির ইভিএম উৎসাহ বাড়াচ্ছে দূরত্ব!

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) যে সিদ্ধান্ত, তাতে অংশীজনদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির দূরত্ব বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইসির ভাষ্য উল্লেখ করে কেউ কেউ বলছেন, সর্বোচ্চ ১৫০ আসনে ভোট করার সিদ্ধান্ত যদি সুষ্ঠু ভোটের জন্য হয়, তাহলে বাকি আসনে ব্যালটে ভোট সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো যদি সমঝোতায় আসে, ইসির ভাষ্য অনুযায়ী, সে ক্ষেত্রে ব্যালটে ভোট নিতে যদি সমস্যা না-ই থেকে, তাহলে এখন এত টাকা খরচ করে ইভিএম কেনার তোড়জোড় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দুই লাখ ইভিএম কিনতে ইতিমধ্যে প্রকল্প চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আর যন্ত্র কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকা।

কেউ কেউ বলছেন, ইভিএম নিয়ে এখন বিতর্ক চলছে, অন্যদিকে সামনে দুর্দিনের আশঙ্কায় ব্যয় কমিয়ে সাশ্রয়ী হতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। অনেকেই মনে করেন, ব্যালটে ভোট নিয়ে দেশে বিভিন্ন সময় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইভিএমে ভোট হলে নির্বাচনে কারচুপি ঠেকানো সম্ভব। ইভিএমের মাধ্যমে যদি সুষ্ঠু ভোট হয়, তবে এ খরচ স্বাভাবিক।

তবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ব্যাপারে ইসি নিজেই ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। ইসির মতে, এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটা সভা করতে হবে। তারপর সেটা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন করবে কি করবে না, এটা তাদের বিষয়।

এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, ‘ইভিএম নিয়ে কোনো সংকট দেখছি না। রাজনৈতিক অঙ্গনে যে সংকট দেখছি তা ইভিএম নিয়ে নয়, আরও মোটা দাগের সংকট। আমরা আশা করি এই সংকট কেটে যাবে। যদি ফয়সালা হয়, সব ভোট ব্যালটে হবে। রাজনৈতিকভাবে শতভাগ সমঝোতা যদি হয়, অসুবিধা নেই। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’

বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরু থেকে ইভিএম নিয়ে বিতর্ক চলছে। অনেক রাজনৈতিক দল  ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে তাদের মতামত দিয়েছে। তবুও ইসি ইভিএম নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে ইসির প্রতি বিদ্যমান আস্থার সংকট আরও বাড়বে। দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় এ ধরনের প্রকল্প ভেবেচিন্তে নেওয়া উচিত। তা ছাড়া এর আগে ইভিএম কেনায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় শুধু ইভিএম কেনায় প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ আছে। এবারও এ ধরনের প্রকল্প অনুমোদন পেলে ব্যাপক দুর্নীতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জুলাই মাসে নির্বাচন সামনে রেখে উন্মুক্ত আলোচ্যসূচি নিয়ে সংলাপ ডাকে ইসি। বিএনপিসহ ৭টি দল সংলাপ বর্জন করে। দুটি দল পরে বসবে বলে জানায়। দুটি দল সংলাপে না এসে তাদের মত জানিয়ে দেয়। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ ২৮ দলের সঙ্গে ইসির সংলাপে ৩০০-এর বেশি প্রস্তাব আসে।

যারা আলোচনায় অংশ নিয়েছে, তাদের অর্ধেক এই যন্ত্র ব্যবহারের কথা বলেছে। বাকি অর্ধেক দল বলেছে, এই যন্ত্র ব্যবহার করা উচিত হবে না। বিএনপি ও তার জোটের শরিকদের অবস্থান হলো, বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে তারা কোনো ভোটে অংশ নেবে না। তারা ইভিএম ব্যবহারেরও ঘোরবিরোধী।

জানা গেছে, প্রকল্পটিতে ভ্যাট ও ট্যাক্স ছাড়া প্রতি ইউনিট ইভিএমের খরচ ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে ভ্যাট ও ট্যাক্স যুক্ত করলে খরচ প্রতি ইউনিটে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা পড়বে। অবশ্য ডলারের মূল্য ও ভ্যাট-ট্যাক্সের হারের তারতম্যে এর মূল্যও কমবেশি হতে পারে।

ইভিএম কেনা ছাড়াও একই প্রকল্পের আওতায় নির্বাচন কমিশনের ১০টি আঞ্চলিক অঞ্চলে ১০টি ওয়্যারহাউজ (গুদামঘর) স্থাপন, ইভিএম পরিবহনসহ দাপ্তরিক কাজে ব্যবহারের জন্য প্রতিটি উপজেলা নির্বাচন অফিসের অনুকূলে একটি করেসহ মোট ৫৩৪টি ডাবল কেবিন পিকআপ ভ্যান, চারটি পাজেরো জিপ, ১ হাজার ৩০৫ জন জনবল নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট জনবল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এর আগে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম কেনার জন্য কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশনের দেওয়া প্রস্তাবে ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাস করেছিল একনেক। তখন প্রতিটি ইভিএমের পেছনে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ খরচ হয়েছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। ডলারের মূল্য বৃদ্ধির ফলে ইভিএমপ্রতি ১ লাখ থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকার মতো খরচ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

২০১১ সালের পর থেকে বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে সীমিত পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে মেশিন ক্রয়কে কেন্দ্র করে এত টাকা ব্যয় করছে, সেই মেশিন নিয়ে প্রথম থেকে বিতর্ক চলছে। এই মেশিনে রাজনৈতিক দলগুলোর অস্থা নেই, বিশেষজ্ঞদের অস্থা নেই, জনগণেরও আস্থা নেই। যতই নির্বাচন কমিশন বলুক তাদের ওপর আস্থা আনতে।’ ইভিএম কেনার প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশনের ওপর সবার আস্থার সংকট আরও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন,  ‘দেশের অর্থনৈতিক সংকট যখন চরমে, তখন দাতাগোষ্ঠী উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সাত বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা চাইছি, ঠিক সেই সময়ে এক বিলিয়ন খরচ করে এ রকম নির্বাচনের কোনো মানে হয় না।’ 

নির্বাচন পর্যবেক্ষক মনিরা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ইভিএম ব্যবহারে যে প্রকল্প নিয়েছে, সেটা বর্তমান আর্থিক অবস্থায় আমাদের দেশের গরিব রাষ্ট্রের জন্য অপচয়। যেখানে সরকারপ্রধান সব ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, সেখানে এত অর্থ খরচের কোনো মানে হয় না; বরং কমিশন যে চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় তাদের রোডম্যাপে দিয়েছে, সেটা বাস্তবায়ন করলে সুন্দর নির্বাচন করা সম্ভব।’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইভিএম কিনবে কি কিনবে না, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু যারা ইভিএমের বিরোধিতা করছেন, তারা মিথ্যাচার করছেন। আগের ইভিএম ও বর্তমানের ইভিএমের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আগের মেশিনগুলোর চেয়ে এখনকার মেশিনগুলো অনেক উন্নত। বিশেষজ্ঞ যারা রয়েছেন, তারা দেখেছেন। এখানে কারচুপির কোনো সুযোগ নেই।  ভোটের সময় অনিয়ম ঠেকানো, ভোটাররা কত সহজে ভোট দিতে পারে, সেই পদ্ধতি ইভিএমে অ্যাপ্লাই করা হয়েছে।’

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, ‘প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিয়েই আমাদের সামনে আগাতে হবে। আগের ইভিএমে যান্ত্রিক জটিলতার কারণে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কিন্তু বর্তমান যে ইভিএম ব্যবহার হচ্ছে, সেখানে বিতর্ক বা প্রশ্ন থাকার কথা না। এখন যদি নির্বাচন নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়, তবে ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো একটা নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়নের ধারাবাহিতা সবকিছু নিয়ে বড় একটা জটিলতা তৈরি হবে। সেটা নিরসনে এই অর্থটা একটা ইনভেস্টমেন্ট।’

তবে এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করতে চায় তার গুরুত্বটা তুলে ধরতে হবে। আমি মনে করি তাদের এ ব্যাপারে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।’