সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘যথোপযুক্ত সমাধান খুঁজে বের করা এবং তাদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য নেতৃত্বের দলে মহিলাদের থাকা গুরুত্বপূর্ণ। সংকটের সময় নারীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সংকটের কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।’
গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলে সাধারণ পরিষদের সভাপতি কাসাবা কোরোসি আহূত ইউএনজিএ প্ল্যাটফর্ম অব উইমেন লিডার্সের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ভাষণ দানকালে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘আজকের আন্তঃসংযুক্ত চ্যালেঞ্জে নারী নেতাদের দ্বারা রূপান্তরমূলক সমাধান’।
এর আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৭৭তম অধিবেশনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পৌঁছান। প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের বহন করা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ভিভিআইপি ভাড়া বিমান স্থানীয় সময় রাত ১০টা ২৫ মিনিটে নিউইয়র্কের জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ ইমরান এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মুহাম্মদ আবদুল মুহিত বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।
ইউএনজিএ প্ল্যাটফর্ম অব উইমেন লিডার্সের বৈঠকে শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, সব ধরনের গতানুগতিকতা ভেঙে এবং অদম্য সাহস ও নেতৃত্বের দক্ষতা দেখিয়ে নারীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তার দেশের দৃষ্টিকোণ থেকে, তারা বিশ্বব্যাপী নারী নেতৃত্বকে উৎসাহিত করার জন্য জাতিসংঘের প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখতে উন্মুখ হয়ে আছেন। এ বিষয়ে তিন দফা প্রস্তাব করেন তিনি। সেগুলো হলো লিঙ্গ সমতাবিষয়ক উপদেষ্টা বোর্ডের স্থানীয়করণ, পর্যাপ্ত রাজনৈতিক ও আর্থিক উপায়ে নারী নেতৃত্বাধীন সুশীল সমাজ-সংস্থাকে লালন ও সমর্থন এবং লিঙ্গ সমতার জন্য সাধারণ এজেন্ডাকে শক্তিশালী করতে নেতৃবৃন্দের একটি শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান।
শেখ হাসিনা তার প্রথম দফা প্রস্তাবে লিঙ্গ সমতা বিষয়ে উপদেষ্টা বোর্ড গঠনের সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, ‘এটি এখন স্থানীয়করণ করা দরকার। আমাদের সব স্তরে জেন্ডার চ্যাম্পিয়নদের প্রয়োজন, বিশেষ করে তৃণমূল স্তরে এবং আমরা উদাহরণ সহকারে নেতৃত্ব দিতে পারি।’
এ ছাড়াও নারী নেতৃত্বাধীন সুশীল সমাজ সংস্থাকে পর্যাপ্ত রাজনৈতিক ও আর্থিক উপায়ে লালনপালন এবং সমর্থন করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি তার দ্বিতীয় দফায় বলেন, ‘এ ধরনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।’
সর্বশেষে তিনি লিঙ্গ সমতার জন্য তাদের সাধারণ এজেন্ডাকে শক্তিশালী করতে নেতৃবৃন্দের একটি শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান করার লক্ষ্যে সবাইকে আমন্ত্রণ জানান।
শিশুদের বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় : দেশের শিশুদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযুক্ত করে বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে তার সরকার আগামী বছর থেকে নতুন জাতীয় পাঠ্যক্রম চালু করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের শিশুদের সত্যিকারের বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’ গত সোমবার (নিউইয়র্কের স্থানীয় সময়) জাতিসংঘ মহাসচিবের ট্রান্সফর্মিং এডুকেশন সামিটে সম্প্রচারিত একটি ভিডিও রেকর্ডিংয়ে জাতীয় বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘নতুন পাঠ্যক্রম আমাদের শিক্ষার্থীদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করবে। এ প্রয়াস তাদের জলবায়ু সহনশীল হওয়ার বিষয়ে সচেতন করবে এবং দেশকে একটি উন্নত, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে পরিণত করতে রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের সত্যিকারের এজেন্ট হিসেবে গড়ে তুলবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা গবেষণা ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কারিগরি শিক্ষার জন্য, আমাদের লক্ষ্য হলো আরও ভালো সংযোগ শিল্প স্থাপন করা। আমাদের সন্তানদের এমন দক্ষতা থাকা উচিত যা তারা বিশ্বের যেকোনো স্থানে ব্যবহার করতে পারে।’
নিউইয়র্কে পৌঁছানোর আগে প্রধানমন্ত্রীকে বহন করা বিমানটি গত সোমবার স্থানীয় সময় রাত ৮টায় যুক্তরাজ্যের লন্ডনের স্ট্যানস্টেড ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ছেড়ে যায়। যুক্তরাজ্য ছাড়ার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই দিন লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের নেতাদের সঙ্গে সদ্য প্রয়াত রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেন।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে অংশ নিতে রাষ্ট্রীয় সফরে লন্ডনে পৌঁছান।
নিউইয়র্কে আজ বুধবার জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত সংবর্ধনা এবং ইউএনজিএর ৭৭তম অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে শেখ হাসিনার। তিনি ইউএনএইচসিআরের ফিলিপো গ্রান্ডি এবং সেøাভেনিয়ার প্রেসিডেন্ট বরুত পহরের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এ ছাড়া ইউএনজিএর নারী নেতাদের প্ল্যাটফর্মে অংশ নেবেন। দিন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আয়োজিত সংবর্ধনায় অংশ নেবেন। বাসস