সীমান্তঘেঁষে মিয়ানমারে গোলাগুলি

জিরো পয়েন্টের ক্যাম্প থেকে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের তমব্রু সীমান্তঘেঁষে ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলছে প্রচণ্ড গোলাগুলি। এরই মধ্যে ওপার থেকে ছোড়া বেশকিছু গুলি ও মর্টারশেলের গোলা এসে পড়েছে বাংলাদেশ ভূখণ্ডেও। এ ছাড়া তমব্রু সীমান্তের শূন্য রেখার (জিরো পয়েন্ট) রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে ওপার থেকে আসা গোলায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। শূন্যরেখার এই আশ্রয় শিবিরের বাসিন্দা রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, তাদের প্রত্যাবাসন ঠেকাতেই মিয়ানমারের জান্তা সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী পরিকল্পিতভাবে সীমান্তঘেঁষে গোলাগুলি করছে। যেকোনো সময় আবার তাদের শিবিরে গোলা এসে পড়ে বড়সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে অনেক রোহিঙ্গা গোপনে শূন্যরেখার শিবির ছেড়ে পালাচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তারা কক্সবাজারের উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে গিয়ে উঠছে বলে শূন্যরেখার শিবিরের একাধিক রোহিঙ্গা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। তমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখার রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরটিতে চার হাজারের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস। কোনো ধরনের সীমানাপ্রাচীর বা তারকাঁটার বেড়া দিয়ে ঘেরা নেই এই আশ্রয় শিবির। মাঝখানে এক দিন বিরতির পর এই আশ্রয় শিবিরঘেঁষে ওপারে মিয়ানমারে গত শুক্রবার রাতে ও গতকাল শনিবার সকালে ফের প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়। এ সময় আর্টিলারি শেল ছোড়ার পাশাপাশি বিমান থেকেও গোলাবর্ষণ করা হয়। এতে আশ্রয় শিবিরটির বাসিন্দা রোহিঙ্গাদের মধ্যে নতুন করে গোলায় আক্রান্ত হওয়ার ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে।

এ প্রসঙ্গে শূন্যরেখার আশ্রয় শিবিরটির বাসিন্দা রোহিঙ্গা মোহাম্মদ সাদেক মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওপারে মিয়ানমারে প্রতিদিন গোলাগুলি চলছে। রাত হলেই অজানা আতঙ্ক আমাদের ঘিরে ধরে। কখন কোন দিক থেকে না আবার গোলা এসে পড়ে। সে কারণে আমাদের ক্যাম্পের কিছু কিছু লোক উখিয়ায় তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে চলে যাচ্ছে।’ তবে ইতিমধ্যে কতজন রোহিঙ্গা এই আশ্রয় শিবির ছেড়েছে তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলতে পারেননি তিনি। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত করতে মিয়ানমারের জান্তা সরকার তাদের আশ্রয় শিবিরঘেঁষে পরিকল্পিতভাবে গোলাগুলি করছে বলেও অভিযোগ করেন সাদেক মিয়া।

গতকাল শনিবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে শূন্যরেখার রোহিঙ্গাদের পালানোর চেষ্টার একটি দৃশ্যের সাক্ষী এই প্রতিবেদক নিজেও। বেলা দেড়টার দিকে তুমব্রু থেকে একটি ইজিবাইক উখিয়ার বালুখালীর দিকে যাচ্ছিল। বিজিবির তল্লাশি চৌকিতে ইজিবাইকটি থামার সংকেত দেওয়া মাত্রই গাড়িটিতে থাকা পাঁচ রোহিঙ্গা দৌড়ে পালিয়ে যান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ওই তল্লাশি চৌকিতে দায়িত্বরত এক বিজিবি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এরা (শূন্যরেখার রোহিঙ্গা) উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলে যাচ্ছে। সে কারণে সীমান্তে মোড়ে মোড়ে চৌকি বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।’

তুমব্রুর শূন্যরেখার রোহিঙ্গাদের পালানোর বিষয়ে জানতে চাইলে উখিয়ার জামতলী ১৫ নাম্বার  রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা সলিম উল্লাহ বলেন, ‘মিয়ানমার সরকার চায় না আমরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যাই। বর্তমানে সৃষ্টি হওয়া সংঘাত সেটি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একধরনের নাটক। আমাদের অনেক আত্মীয়স্বজন আরকান রাজ্যে রয়েছে। তাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম, আরাকান আর্মি (এএ) ও মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলেছে। আর না হলে তাদের ওপর হামলা চালানো হবে। আমাদের সন্দেহ মিয়ানমার সরকার চায় না আমরা আমাদের অধিকার নিয়ে সে দেশে ফিরে যাই। তাই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে সীমান্তবর্তী এলাকাজুড়ে মাসের পর মাস হামলা চালানো হচ্ছে।’

উখিয়ার থাইংখালীর ১৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা নুরুল আলম (২৬) বলেন, ‘২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী দমন পীড়ন ও নির্যাতন চালায়। এরপর জীবন বাঁচাতে ঘরবাড়ি-জায়গাজমি ছেড়ে অনেক আত্মীয়স্বজনকে হারিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছি। এই হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে সীমান্তে গোলাগুলি মিয়ানমারের জান্তা সরকারের একটি কৌশল। বিভিন্নভাবে আমরা জানতে পেরেছি যে, আরাকান রাজ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের নতুন করে সেখান থেকে বিতাড়িত করার জন্য নতুন যড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে।’