টেলিস্কোপের নেশাতেই জ্যোতির্বিজ্ঞানী লামীয়া

পৃথিবীর জন্মেরও আগের মহাকাশের নানা মহাজাগতিক ঘটনার একগুচ্ছ ছবি তুলেছে নাসার টেলিস্কোপ জেমস ওয়েব স্পেস। এই বিশাল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন এক নারী বিজ্ঞানী। তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লামীয়া আশরাফ মওলা। নাসার যে বিজ্ঞানী দল জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ বানিয়েছে তরুণ এই বিজ্ঞানী তাদেরই একজন। লিখেছেন নাসরিন শওকত

লামীয়া আশরাফ মওলা

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ দলের বিজ্ঞানী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লামীয়া আশরাফ মওলা। পেশায় একজন অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট। পৃথিবীর জন্মেরও আগের মহাশূন্যের হাজারো ছায়াপথের ছবি তুলেছে জেমস ওয়েব। এই টেলিস্কোপ তৈরির পেছনে অবদান রাখা একমাত্র বাঙালি বিজ্ঞানী লামীয়া। ছোট্টবেলা থেকে তার ইচ্ছা ছিল পদার্থবিজ্ঞানী হওয়ার। কিন্তু কলেজের পড়া শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলেসলি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান নিউরোসায়েন্সে। জানতে চেয়েছিলেন মানব মস্তিষ্ক কাজ করে কীভাবে। কিন্তু হঠাৎ এক দিন বিশ^বিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোনমি ক্লাসে ঢুকে পড়েন। যে ক্লাসে প্রথম দিন থেকে মহাবিস্ফোরণের (বিং ব্যাং) কারণে সৃষ্ট ছায়াপথ নিয়ে পড়ানো হতো। প্রতি সপ্তাহে টেলিস্কোপ দিয়ে চোখ রাখা হতো আকাশে। এরপর থেকে নিউরোসায়েন্সে আর পড়া হলো না লামীয়ার। ফিরে গেলেন ছোট্টবেলার সেই ফিজিক্সে। এভাবেই জ্যোতিঃপদার্থবিদ হয়ে ওঠেন জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে ছায়াপথের গঠন কোঠামো পরিমাপের জন্য বিশ্লেষণ পাইপলাইন তৈরি করা লামীয়া। টেলিস্কোপটির পেছনে যৌথভাবে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, ইউরোপের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইএসএ) ও কানাডার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (সিএসএ)। কানাডা-প্রবাসী এই বিজ্ঞানী বর্তমানে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডানল্যাপ ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকসে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে গবেষণা করছেন। জেডব্লিউএসটির কানাডার দলের সঙ্গে ২০২০ সাল থেকে কাজ করছেন লামীয়া।

শৈশব ও পড়াশোনা

১৯৯১ সালে ঢাকার মালিবাগে জন্ম নেন লামীয়া আশরাফ। ঢাকার শান্তিনগরে বেড়ে ওঠা। কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে ও-লেভেল এবং এ-লেভেল পাস করেন। এরপর পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সম্পূর্ণ অর্থবৃত্তি নিয়ে সেখানকার ওয়েলেসলি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন প্রথমে। পরে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ^বিদ্যালয় থেকে। সে সময় তরুণ এই বিজ্ঞানী প্রাথমিক একটি পরিকল্পনা করলেন। পেশা হিসেবে ভিন্নধারার একটি পথকেই বেছে নেবেন তিনি। পরে ২০২০ সালে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডানলপ ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকসে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু একটি মাত্র টেলিস্কোপই (দূরবীক্ষণ যন্ত্রই) তার সবকিছুকে বদলে দিল শেষ পর্যন্ত।

জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী হয়ে ওঠার পেছনের গল্প জানাতে গিয়ে লামীয়া বলেন, ‘সে সময় ওয়েলেসলি কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম আমি এবং প্রতি সেমিস্টারের প্রথমে ক্যাম্পাসে একটি টেলিস্কোপ পেতাম। যখন আমি ওই টেলিস্কোপে প্রথমবার চোখ রাখি, সে মুহূর্ত থেকেই চিরতরে ভাগ্য বদলে যায় আমার। আমি স্নায়ুবিজ্ঞানে পড়তে চেয়েছিলাম। কারণ মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে তা জানতে খুবই কৌতূহলী ছিলাম। কিন্তু আমি খুব যুক্তি খুঁজে বেড়াতাম। আর পদার্থবিদ্যা পুরোপুরি যুক্তিনির্ভর।’ লামীয়া যখন ঢাকায় থাকতেন তখন বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের একজন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ বাংলাদেশেও (আইসিডিডিআর,বি) কাজ করেছেন তিনি। সে সময় চলমান গবেষণার বিষয় রপ্ত করেন। ৩১ বছরের তরুণ এই বিজ্ঞানী তার দীর্ঘ পরিশ্রমের পুরো কৃতিত্ব তার মাকে উৎসর্গ করে বলেছেন, ‘আমার মা আমার অনুপ্রেরণা। তার সমর্থন ছাড়া কোনো কিছুই অর্জন করা সম্ভব হতো না।’

২০১৮ সাল। একদল মহাকাশবিজ্ঞানী মহাকাশে কালো, পদার্থহীন বা স্বচ্ছ স্থান খুঁজে পেয়েছিলেন। বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল নেচার এ বিষয় নিয়ে তখন একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সে সময়েই প্রথমবারের মতো আলোচনায় উঠে আসেন লামীয়া। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও জার্মানির ওই বিজ্ঞানীদের দলে লামীয়াও ছিলেন। তখন তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের নিউহ্যাভেনের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী। গবেষণা দলের অন্য সদস্যরা হলেন পিটার ভ্যান ডোকাম, অ্যালিসন মেরিট, জি ঝেং, ডেবরাহ লাকোস্ট, শানি ড্যানিয়েল ও রবার্তো আব্রাহাম। এর আগে সংবাদমাধ্যমকে লামীয়া বলেছিলেন, তিনি কানাডা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার ভ্যান ডোকাম ও অধ্যাপক রোবার্তো আব্রাহামের গবেষণা দলে ২০১৫ সালে যোগ দিয়েছিলেন। এই অধ্যাপকরা সে সময় ড্রাগনফ্লাই নামে একটি টেলিস্কোপ তৈরি করেছিলেন, যা মহাকাশে কম উজ্জ্বল ক্ষুদ্র পদার্থকেও শনাক্ত করতে সক্ষম। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (জেডব্লিউএসটি) প্রকল্পে এক হাজার বিজ্ঞানী কাজ করছেন। লামীয়া তাদের একজন। প্রথমবারের মতো ফেইসবুকে বন্ধু ও দলের সদস্যদের সঙ্গে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের ছবি শেয়ার করেছিলেন লামীয়া। সে সময় জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের শৈল্পিক ব্যাখ্যা দিয়ে লামীয়া বলেন : মহাবিশ্বের প্রথম ছায়াপথের সন্ধান করবে জেডব্লিউএসটি, যা আমাকে ৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল সুফির অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথের প্রথম ছায়াপথ পর্যবেক্ষণের কথা ভাবতে বাধ্য করেছে।’

জেমস ওয়েব প্রকল্পে যোগদান

লামীয়া তখন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী তখন প্রথমবারের মতো হাবল টেলিস্কোপ প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পান। সেখান থেকেই জেডব্লিউএসটি প্রকল্পে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এর মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রি শেষ করেন। এরপর জেডব্লিউএসটি প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন তিনি। ঘটনাক্রমে এই প্রকল্পের কানাডার দলের হয়ে কাজ করার সুযোগও পেয়ে যান তিনি।

১২ জুলাই প্রথম ক্লাস্টারের ছবি প্রকাশ করেছিল নাসা। এই ক্লাস্টারেই লামীয়ার দল কাজ করেছিল। চারটি যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে জেডব্লিউএসটি টেলিস্কোপ তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্য থেকে লামীয়ার দল একটি যন্ত্র তৈরি করেছিল। ওই যন্ত্র আবিষ্কারের পুরস্কার হিসেবে তার দল এ বছরের জন্য ২০০ ঘণ্টার ‘গ্যারান্টি টাইম’ অর্জন করেছে। অর্থাৎ এর মানে হলো এ বছরের জন্য বরাদ্দ এই ২০০ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে লামীয়ার দল এই টেলিস্কোপের মাধ্যমে ছবি তুলতে ও তা পর্যালোচনা করার সুযোগ পাবে। এ সময়ের মধ্যে তারা পাঁচটি ছবি তুলবেন। কমপক্ষে ১০ হাজারটি ছায়াপথের মধ্য থেকে এই ছবি তোলা হয়। এ ছবি মূলত মহাবিশে^র সবচেয়ে ছোট একটি অংশ। যদি জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের মাধ্যমে পৃথিবীর পুরো আকাশের ছবি তোলা সম্ভব হয়, তাহলে এটা গণনা করা সম্ভব হবে যে সেখানে কতগুলো ছায়াপথ রয়েছে। এই ছবি পর্যালোচনা করেই মহাবিশে^র প্রথম ছায়াপথ কোনটি তা খুঁজে বের করা যায়। আমাদের দলে ১৫ জন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে ১১ জন কানাডায় কাজ করছেন। অন্যরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন। নাসা ছবিগুলো প্রকাশের পরই আমরা সবাই সেগুলো আমাদের ফোনে তুলে রাখি। দ্রুত স্নাপশটের মাধ্যমে সেগুলো তুলেছি।’

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ

২০২১ সালের ডিসেম্বরের এক সকাল। মহাকাশের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছিল জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। পৃথিবীরও জন্মের আগের প্রাচীন মহাকাশের ছবি জুলাইয়ের মাঝামাঝি প্রকাশ করেছিল নাসা, যা বিশ^জুড়ে সাড়া ফেলে। নানা সময়ের নানা মহাজাগতিক ঘটনার এসব ছবি তুলেছে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার দুটি মহাকাশ টেলিস্কোপ রয়েছে। এর একটি হলো জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। এটিকে সংক্ষেপে জেডব্লিউএসটি বা ওয়েব বলা হয়। অন্যটি হলো হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। হাবল ওয়েব টেলিস্কোপ থেকে ১০ গুণ শক্তিশালী এটি। জেমস ওয়েব স্পেস হলো একটি ইনফ্রারেড অনুসন্ধানী বা পর্যবেক্ষণকারী টেলিস্কোপ, যা পৃথিবী থেকে প্রায় ১ লাখ মাইল দূরের সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে থাকে। এর লক্ষ্য হলো দূরবর্তী নক্ষত্রের জন্মস্থান ও এর ছায়াপথগুলো পর্যবেক্ষণ করা। এটি এ যাবৎকালে মহাকাশে পাঠানো নাসার সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী টেলিস্কোপ। সবশেষ পৃথিবী থেকে ১৮ লাখ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ।

আমাদের মহাবিশ্বের ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়কে পর্যবেক্ষণ করবে জেমস ওয়েব। মহাবিস্ফোরণ সৃষ্টির পর প্রথম আলোকিত আভা থেকে শুরু করে পৃথিবীর মতো গ্রহে জীবন ধারণে সক্ষম সৌরজগতের গঠন পর্যন্ত সবকিছুকে অনুসন্ধান করবে এই টেলিস্কোপ। আকাশে অনেক কিছুকে পর্যবেক্ষণ করা এই টেলিস্কোপের প্রধান দুটি লক্ষ্য রয়েছে। একটি হলো মহাকাশে ১ হাজার ৩৫০ কোটি বছর আগে প্রথমবারের মতো জন্ম নেওয়া ছায়াপথগুলো খুঁজে বের করা। সে সময় আলোর বিচ্ছুরণ কীভাবে ঘটেছিল তার ছবি নেওয়া। দ্বিতীয়টি হলো দূরের গ্রহগুলো মানুষের বাসযোগ্য কি না সে বিষয়ে অনুসন্ধান করা। প্রথম ছায়াপথ থেকে আলোককণাগুলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে প্রায় ১৩ কোটি বছর সময় নেয়। কারণ তাদের অবস্থান পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে। তাই পৃথিবীতে এই আলো আসার সময় লাল-বর্ণালি ছটাকে শনাক্ত করতে নির্দিষ্ট যত্নের প্রয়োজন হয়। সে সময় জেমস ওয়েবের আয়ু থাকবে মাত্র পাঁচ বছর। নাসার এই মহাপর্যবেক্ষণকারী টেলিস্কোপের মধ্যে বিশাল যন্ত্রাংশ রয়েছে। এর ফলে অতিশক্তিশালী এই টেলিস্কোপ দিয়ে মহাশূন্যের অনেক ভেতর পর্যন্ত দেখা ও তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। কয়েক হাজার প্রকৌশলীর দীর্ঘ ২৫ বছরের পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে টেলিস্কোপটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ইউরোপের মহাকাশ বন্দর ফ্রেঞ্চ গিয়ানার কুরু মহাকাশ স্টেশন এটি নির্মিত হয়। ২০০২ সালে এই টেলিস্কোপটি পরিচিতি ছিল পরবর্তী প্রজন্মের মহাকাশ টেলিস্কোপ নামে। পরে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। মহাকাশ অনুসন্ধানের ইতিহাসে এ যাবৎকালের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। এ প্রকল্পে যৌথভাবে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের নাসা, কানাডার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা সিএসএ ও ইউরোপের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইএসএ। ১৯৯০-এর দশকে মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার কথা ছিল জেমস ওয়েবের। তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০০ কোটি ডলার। ২০২১ সালে যখন এই টেলিস্কোপ মহাকাশে পাড়ি দেয়, তখন এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০০০ কোটি ডলার। সে সময় নাসাকে কানাডা ও ইউরোপের মহাকাশ সংস্থা দুটো আর্থিক সহায়তার হাত না-বাড়ালে এই টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়ত। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের নকশায়ও রয়েছে বিশেষত্ব। যাতে এর মাধ্যমে মহাবিশ্ব সৃষ্টির পর কয়েক লাখ বছর আগের ছায়াপথগুলোর ছবি তোলা যায়। সর্বশেষ ২২ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী পৃথিবী থেকে ১৬ লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ। এত দূরের পৃথিবী ও সূর্যের তাপ থেকে বাঁচাতে ৫টি পর্দা লাগানো হয়েছে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে। এক-একটি পর্দার মাপ টেনিস কোর্টের সমান। এ ছাড়া টেলিস্কোপে সোনার প্রলেপ লাগানো ১৮টি প্রতিফলক আয়নাও রয়েছে। যার সম্মিলিত ব্যাস ৬ দশমিক ৫ মিটার। আরও আছে অতিসংবেদনশীল ইনফ্রারেড তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে যন্ত্রপাতি। যেভাবে রাতের আঁধারে কোনো কোনো ফুল পাপড়ি মেলে সেভাবেই ১৮টি আয়না মহাকাশে উন্মীলিত হয়েছে। তা দিয়েই চলেছে মহাকাশের অতীত সন্ধান।

ঐতিহাসিক ছবি প্রকাশ

২০২১ এর ২৫ ডিসেম্বর। দক্ষিণ আমেরিকার ইউরোপের মহাকাশ বন্দরে অবস্থিত ফ্রেঞ্চ গিয়ানার কুরু মহাকাশ স্টেশন। এই স্টেশন থেকে এদিন জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ  মহাকাশে পাড়ি জমায়। এর সাত মাস পরে আসে ঐতিহাসিক সেই দিন ১২ জুলাই ২০২২। এর আগে মহাকাশে নিজস্ব অবস্থানে পৌঁছে পৃথিবীরও জন্মের আগের প্রাচীন মহাকাশের ছবি পাঠায় নাসায়। ঐতিহাসিক ওই দিনে মাত্র ২৯ কোটি আলোকবর্ষ দূরের পাঁচটি ছায়াপথের একটি ছবি প্রকাশ করে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা ওই সংস্থাটি। যে ছবিতে নক্ষত্রপুঞ্জ ও ছায়াপথের আলোকরশ্মির বিচ্ছুরণ দেখতে পাওয়া যায়। যা কয়েক কোটি বছর পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে। আরও দেখা যায়, নক্ষত্র তার চারদিকে গ্যাসের ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে চলেছে।

১১ জুলাই সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ছবিটি প্রকাশ করেন। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ও নাসার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বিল নেলসন। বাইডেনের প্রকাশ করা স্পষ্ট ওই ছবিতে ছিল পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধের এক ফালি আকাশের এসএমএসিএস ০৭২৩ ছায়াপথগুচ্ছ। যা থেকে পৃথিবীতে আলো হয়ে আসতে সময় লেগেছে ৪৬০ কোটি বছর। তিনি ওই ঘটনাকে একটি ‘ঐতিহাসিক’ মুহূর্ত হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘এটি আমাদের মহাজাগতিক ইতিহাসে একটি নতুন জানালা খুলে দিয়েছে।’

এরপর দিন ১২ জুলাই এক অনুষ্ঠানে মহাকাশ টেলিস্কোপ জেমস ওয়েবের ইনফ্রারেড ক্যামেরায় তোলা সবচেয়ে স্পষ্ট ও উজ্জ্বল রঙের আরও ছবি প্রকাশ করে নাসা।  সেখানে দেখা যায় কারিনা নেবুলা, সাদার্ন রিং নেবুলা, স্টেফানস কুইনটেট ও একটি গ্যাস দানব গ্রহের আবহাওয়ার বিশ্লেষণ। নাসার গবেষক বিল নেলসন বলেছেন, ‘আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে এক লাখ ৮৬ হাজার মাইল। আর এই ছবিতে  আপনি ছোট ছোট যে আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে পাচ্ছেন, সেগুলো ভ্রমণ করেছে ১৩শ’ কোটি বছর। তবে আমরা আরও পেছনে ফিরে যাচ্ছি। কারণ এটি হলো প্রথম ছবি। ওরা সাড়ে ১৩০০ কোটি বছর পেছনের ছবি তুলতে যাচ্ছে। আমরা যেহেতু জানি মহাজগতের বয়স ১৩৮০ কোটি বছর। তাই আমরা মহাবিশ^ সৃষ্টির একেবারে আদি অবস্থায়  ফিরে যেতে পারছি।’

নাসার প্রকাশ করা উজ্জ্বল রঙিন ছবিগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু হালকা বিচ্ছুরণ দেখতে পাওয়া গেছে। স্পাইক সদৃশ এই বিচ্ছুরণগুলো হলো পৃথক এক একটি নক্ষত্র। এগুলোই আমাদের আকাশগঙ্গা বা ছায়াপথ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কমলা রঙের স্থানগুলো হলো এক একটি ছায়াপথ। এর মধ্যে সাদা ও নীল রঙের বর্ণালি অংশগুলো হলো আমাদের মহাবিশ্বের কাছের অংশ । লাল হলো দূরের অংশ। আমাদের এই মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর আগে। এরও ৫০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং বা মহা বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল মহাবিশ্বের। তার মাত্র ৬০ কোটি বছর পরে তোলা হয়েছে নতুন করে প্রকাশ পাওয়া এই ছবি। তবে এই টেলিস্কোপের মহাকাশ যাত্রাও একসময়  অনিশ্চিত হয়ে উঠেছিল। ২০০৭ সালে প্রথম মহাকাশে ওড়ার পরিকল্পনা ছিল টেলিস্কোপটির। ২০১১ সালে অর্থ বরাদ্দের সংকটের মুখেও পড়তে হয় জেমস ওয়েবকে । অবশেষে ২০২১ সালে ২৫ ডিসেম্বর ফ্রেঞ্চ গিয়েনার কুরু মহাকাশ স্টেশন থেকে স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২০ মিনিটে আরিয়ান ৫ রকেটে চড়ে মহাকাশে পাড়ি জমায় জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। বর্তমানে পৃথিবী থেকে ১৬ লক্ষ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে জেমস ওয়েব। সেখান থেকে এমন সব অসাধারণ ছবি পাঠিয়ে চলেছে যা এর আগে মানুষ কখনো দেখেনি। এসব ছবির মাধ্যমে মানব সভ্যতার বড় বড় প্রশ্নের উত্তর পেয়ে চলেছে পৃথিবীবাসী।