দুই পরিবারের বিরোধের বলি শামীমা-নোমান

মো. নোমান (২৭) সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে গত বছর নভেম্বরে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন কলেজপড়ুয়া শামীমা আক্তারকে। শামীমার পরিবারের সিদ্ধান্ত ছিল, এইচএসসি পরীক্ষার আগে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বামীর বাড়িতে পাঠাবে না। বাবার বাড়িতে থেকে পড়ালেখা করবে। তবে নোমানের পরিবারের ইচ্ছা ছিল শামীমাকে ঘরে তুলে নেবে আর নোমান দেশেই কিছু করবে। এ বিষয়ে নোমানেরও সায় ছিল। তবে মত ছিল না শামীমার পরিবারের। এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। নোমান ছুটি শেষ করে চার মাস আগে সৌদি চলে যান। এ সময় নোমান তার পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। গত ৯ সেপ্টেম্বর হঠাৎ দেশে এসে ভোলার লালমোহন থানার চরবুতা গ্রামের শ্বশুরবাড়িতে ওঠেন তিনি। এর এক দিন পর সেখান থেকে ঢাকা ঘুরে দেখানোর কথা বলে স্ত্রী শামীমাকে নিয়ে ওঠেন মোহাম্মদপুরে বাবর রোডের একটি ভাড়া বাসায়। নোমানের স্বজন ও পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত রবিবার রাতে মোহাম্মদপুরের ওই বাসা থেকেই এ দম্পতির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শামীমার মরদেহ পড়েছিল বিছানায় আর নোমান গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলছিলেন। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে যান মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। মরদেহ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেয় পুলিশ। গতকাল সোমবার সন্ধ্যার পর একটি লাশবাহী গাড়িতে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন এ দম্পতির স্বজনরা। পুলিশের ধারণা, স্ত্রীকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেছেন নোমান।

মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে শামীমার বিষয়ে বলা হয়েছে মাথা, কপাল, মুখমন্ডল, গলা স্বাভাবিক। কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। নাক ও মুখ দিয়ে তরল রক্ত নির্গত হচ্ছে। ঠোঁট কালচে এবং বন্ধ অবস্থায় আছে। জিহ্বা কালো এবং অর্ধেক বের হওয়া যা দাঁত দিয়ে কামড়ানো অবস্থায় আছে। বুক, পেট, পিঠ স্বাভাবিক। কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই।

সুরতহালে নোমানের বিষয়ে বলা হয়েছে, কপাল মুখম-লসহ সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও গলায় অর্ধচন্দ্রাকৃতির বাম পাশ থেকে ডান পাশ পর্যন্ত প্রায় ৯ ইঞ্চি কালচে ছিল।

নোমানের বন্ধু ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হলেও পরবর্তীকালে দুই পরিবারের মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। কারণ বিয়ের পর নোমান আর বিদেশে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করতে চেয়েছিলেন। নোমানের পরিবারও তাই চেয়েছিল। কিন্তু শামীমার পরিবার বলেছিল, এইচএসসি পরীক্ষার পর আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে তুলে দেওয়া হবে। এর আগ পর্যন্ত নোমান বিদেশে থাকুক। পরবর্তী সময়ে নোমান সৌদি আরব যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিদেশে যাওয়ার পর বাবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছিলেন তিনি।

মোহাম্মদপুর থানা সূত্রে জানা গেছে, এ দম্পতির মৃত্যুর ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। একটি হত্যা মামলা, অন্যটি আত্মহত্যা। হত্যা মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে স্ত্রীকে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যার পর নোমান ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। আমরা জানতে পেরেছি দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ চলছিল। স্ত্রীকে হত্যা এবং স্বামীর আত্মহত্যার নেপথ্য কারণ জানতে তদন্ত চলমান আছে।

নিহত শামীমার ভাই শামীম হোসেন জানান, তার বোন আগামী বছর এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। নোমান প্রায় তিন বছর ধরে সৌদিপ্রবাসী। তার গ্রামের বাড়ি একই থানা এলাকায় ধলীগর নগরে। গত নভেম্বরে দেশে এসে পারিবারিকভাবে শামীমার সঙ্গে বিয়ে করেন। শামীমা যেহেতু শিক্ষার্থী তাই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বামীর ঘরে পাঠানো হয়নি। বাবার বাড়িতেই ছিল। স্ত্রীকে রেখে নোমান সৌদি চলে যান। গত ৯ সেপ্টেম্বর দেশে এসে তাদের বাসায় যান তিনি। স্ত্রীকে ঢাকা ঘুরে দেখানোর কথা বলে নিয়ে আসেন।

শামীমের দাবি, তাদের জানামতে নোমান-শামীমার মধ্যে কোনো মনোমালিন্য ছিল না। কিন্তু কেন স্ত্রীকে হত্যার পর তিনি আত্মহত্যা করলেন তা সবার ধারণার বাইরে। দুজনের মধ্যে কী ঘটেছিল কেউই জানেন না। দুই পরিবারের বিরোধের বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেছেন।

নোমানের ফুপা কামাল হোসেন জানান, নোমানের দেশে ফিরে আসার খবর তারা কেউ জানতেন না। রবিবার রাতে তারা নোমান-শামীমার মৃত্যুর খবর পান।

নোমানের বন্ধু রাহাত হোসেন জানান, নোমান বিদেশে থাকতে তাকে ফোন করে বলেছিলেন দেশে ফিরে স্ত্রীকে ঢাকায় বেড়াতে আনবেন। একটি বাসা ভাড়া করে দিতে বলা হয়েছিল তাকে। ওই বাসায় কিছুদিন কাটিয়ে স্ত্রীকে গ্রামের বাড়ি রেখে ফের সৌদি আরবে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল নোমানের। এরপরই তিনি বাবর রোডের ১৩ নম্বর সড়কের ভবনের তৃতীয় তলায় একটি বাসা ভাড়া করে দেন। ১২ সেপ্টেম্বর স্ত্রীকে নিয়ে নোমান ওই বাসায় ওঠেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমার জানামতে নোমান-শামীমার মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। তারা প্রায় প্রতিদিন একসঙ্গে রিকশায় ঘুরতে যেত। তবে দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল না বলে জানিয়েছিল নোমান।’