জননেত্রী শেখ হাসিনা একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক। আজ তার ৭৬ তম জন্মদিন। গণতন্ত্র, স্বাস্থ্য ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, দারিদ্র্য বিমোচন, উন্নয়ন, সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকেরা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবার পরিজনদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
এ সময় বিদেশে থাকায় বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনে জাতির এক ক্রান্তিলগ্নে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ডাক আসে দেশমাতৃকার হাল ধরার। সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন শেখ হাসিনা। দেশে ফিরে আসার পর তিনি ঘোষণা দেন স্বৈরশাসকের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র কায়েম করতে হবে। এরপর দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে সামরিক জান্তা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে চলে তার একটানা অকুতোভয় সংগ্রাম। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ক্রীড়াসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন সূচকের প্রবৃদ্ধির ফলে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনার প্রথমবারের (১৯৯৬-২০০১) শাসনকাল চিহ্নিত হয় স্বর্ণযুগ হিসেবে।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এককভাবে আওয়ামী লীগই লাভ করে তিন-চতুর্থাংশের বেশি আসন। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তিনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে রেকর্ড সৃষ্টি করে তিনি চতুর্থবারের মতো দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছেন। বিশ্ববিখ্যাত প্রভাবশালী সাময়িকী ফোর্বসের মূল্যায়নে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ১০০ নারীর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান প্রথম দিকে। শেখ হাসিনার হাত ধরেই ‘বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল’।
বর্তমান সময়ে বিশ্বমানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অঙ্গনের অন্যতম অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী রাজনীতিকের নাম শেখ হাসিনা। দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে শেখ হাসিনা পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বপ্ন দেখতেন সেই স্বপ্ন আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যম নানা উপাধি দিয়েছেন।
শেখ হাসিনা বারবার বুলেট ও গ্রেনেডের মুখ থেকে বেঁচে ফেরা বহ্নিশিখা। তিনি তার জীবন বাংলার মেহনতি দুঃখী মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করেছেন। রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের কল্যাণই তার রাজনীতির দর্শন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার পর ১৯৮১ সালের শুরুতে দলের দায়িত্ব নিয়ে দলকে শুধু চারবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়ই আনেননি, দেশকেও এগিয়ে নিয়েছেন অনেক দূর। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে যেমন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি উদার গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি তিনি।
আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন। তার কারণেই বাংলাদেশ আজ শিখর স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত দিয়ে যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে তেমনি তার কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে এসেছে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা। সাফল্য স্বীকৃতি স্বরূপ প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ম শেখ হাসিনা অর্জন করেছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার। তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছেঃ
১. এজেন্ট অব চেঞ্জ পুরস্কার, ২০১৬: গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘এজেন্ট অফ চেঞ্জ’ পুরস্কারে ভূষিত করে গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফোরাম। নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য ও সাহসী ভূমিকা পালনের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সকল নারীকে এই অর্জন উৎসর্গ করেন।
২. প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন, ২০১৬: নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ‘ইউএন ওম্যান’। গত ২১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে এক উচ্চ পর্যায়ের অনুষ্ঠানে তার হাতে এই পুরস্কার তুলে দেয়া হয়।
৩. চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ: ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মান ‘চ্যাম্পিয়নস অফ দ্যা আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন, জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড গঠনের মাধ্যমে অর্থ বিনিয়োগ ইত্যাদিসহ তার নেতৃত্বাধীন সরকারের সামগ্রিক পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করে ‘পলিসি লিডারশিপ’ শাখায় তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
৪. সাউথ-সাউথ ভিশনারি পুরস্কার, ২০১৪: ২০১৪ সালের ২১ নভেম্বর, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাতিসংঘের সাউথ-সাউথ ভিশনারি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। বাংলাদেশে তৃণমূলপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার, সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা চালু, সর্বসাধারণের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বিশ্বের দরবারে রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপনের জন্য তাকে এই সম্মাননা দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এই পুরস্কার গ্রহণ করেন।
৫. শান্তি বৃক্ষ, ২০১৪: নারী শিক্ষায় অনবদ্য অবদানের জন্য ২০১৪ সালে ইউনেস্কো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ‘শান্তি বৃক্ষ’ স্মারক তুলে দেয়। ৮ সেপ্টেম্বর ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা তার হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন। ইউনেস্কোর মহাপরিচালক স্মারকটি হস্তান্তর করার আগে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী শিক্ষায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন জোরালো বক্তা। রাজনৈতিক ও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
৬. MK Gandhi পুরস্কার: সাম্প্রদায়িক ভ্রাতৃত্ব, অহিংসা, সামাজিক বোঝাপড়া এবং তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রের উত্থানের স্বীকৃতিস্বরূপ অসলোভিত্তিকM K Gandhi Foundation, ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনাকে MK Gandhi পুরস্কারে ভূষিত করে।
৭. CERES মেডেল: শেখ হাসিনা নিরলস সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ খাদ্য এবং কৃষি সংস্থা (FAO) ২ আগস্ট, ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্মানজনক CERES মেডেল দিয়ে ভূষিত করে।
৮. Pearl S. Buck পুরস্কার: ২০০০ সালের ৯ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের Randolph Macon Womens College শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মানবিক ক্ষেত্রে তার লক্ষ্য, সাহস এবং অর্জনের জন্য Pearl S. Buck পুরস্কার প্রদান করে।
৯. পার্বত্য চট্টগ্রামের ২৫ বছরব্যাপী পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই পুরস্কার প্রদান করে।
১০. ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার: ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শান্তি, নিরস্ত্রীকরণ এবং উন্নয়ন এর জন্য তার নিরন্তর সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়। ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল তার হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন।
১১. জাতিসংঘ পুরস্কার- ২০১০: শিশুমৃত্যুর হার ৫০% কমিয়ে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকারকে ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১০ সালে এই স্বীকৃতি প্রদান করে। জাতির পক্ষ থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল, গোটা দেশ আজ উন্নয়নে ভাসছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটের জাল ছিন্ন করে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। দেশের দরিদ্র পরিবারের শতভাগ শিশু শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তির আওতায় আনা হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে ভর্তির ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
শেখ হাসিনা একজন বিশ্ব নেতা। তার সুষ্ঠু নেতৃত্ব বাংলাদেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তিনি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন। তার জন্য বাংলাদেশেকে অনেকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে মডেল হিসেবে নিচ্ছেন। তিনি দেশেকে দরিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছেন। তার নেতৃত্বের পেছনে যারা কাজ করছেন তাদের স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
লেখক: পরিচালক, এফবিসিসিআই, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জুয়েলার্স এসোসিয়েশন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেড।