জর্জা মেলোনি। ২০০৬ সালে ইতালির ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স পার্টির সর্বকনিষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এর মধ্য দিয়েই জাতীয় রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে তার। কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিকের সিলমোহর লেগে যায় তার কপালে। শুরুতে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী আদর্শের অনুসারী ছিলেন। পরে কট্টর জাতীয়তাবাদী দল ব্রাদার্স অব ইতালি গঠন করেন। ইতালির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন এই আপসহীন নেতা। লিখেছেন নাসরিন শওকত
ইতালির প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দেন মারিও দ্রাঘি। তার জোট সরকার পার্লামেন্টে আস্থা হারালে পদত্যাগ করেন তিনি। এরপরই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। অনিশ্চয়তা কাটাতে ২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় দেশটিতে। নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থি দল ব্রাদার্স অব ইতালি বড় ধরনের জয় পেয়েছে। বিজয়ী হয়েছেন ৪৫ বছর বয়সী কট্টর জাতীয়তাবাদী ও আপোসহীন নেতা হিসেবে পরিচিত জর্জা মেলোনি। ‘ঈশ্বর, দেশ ও পরিবার’এই সেøাগানকে সামনে রেখে ভোটের প্রচারে ঝড় তুলেছিলেন তিনি। হতে যাচ্ছেন ইতালির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর এই প্রথম ইতালি পেতে যাচ্ছে কট্টর ডানপন্থি সরকার।
ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নির্বাচনের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, জর্জা মেলোনির দল ব্রাদার্স অব ইতালি ২৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টি পেয়েছে ১৯.৬ শতাংশ ভোট। এর আগে বুথফেরত সমীক্ষায়ও মেলোনির দলের জয়ী হওয়ার আভাস পাওয়া গিয়েছে। মেলোনির প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্য বামপন্থি এনরিকো লোত্তা পিছিয়ে রয়েছেন। মেলোনির ডানপন্থি জোটে রয়েছে মাত্তেও সালভিনির কট্টর ডানপন্থি দল লিগ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বার্লুসকোনির মধ্য ডানপন্থি দল ফোরজা ইতালিয়া। ফোরজা ইতালিয়া ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে দেশটির পার্লামেন্টের সিনেট ও চেম্বার অব ডেপুটিস উভয় কক্ষে নিয়ন্ত্রণ পেতে যাচ্ছে। সবশেষ নতুন জোট সরকার গড়তে যোগ্য প্রার্থী বাছাই শুরু করেছেন মেলোনি।
ইউরোপে ডানপন্থার উত্থান
সংকট সবসময় একটি দেশের বিরোধী দলগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়। সেক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে না। সংকটের এ প্রেক্ষাপট ভয়ের রাজনীতির প্রতিষ্ঠাতা ডানপন্থি পপুলিস্টদের কাছে আরও সহজে ধরা দেয়।
ইউরোপে কট্টর ডানপন্থি শক্তির উত্থান নতুন ঘটনা নয়। বেশ কয়েক বছর ধরেই ইউরোপের রক্ষণশীল ডানপন্থিরা নিজেদের পুনরুজ্জীবন উপভোগ করছে। এমনকি এর আগে এই শক্তি একাধিক দেশে সরকারও গঠন করেছে। হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডের মতো দেশে কট্টর ডানপন্থি সরকার আগে থেকেই ক্ষমতায় রয়েছে। এর মধ্যে ফ্রান্সের সবশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দল জয় পেয়েছে। তা সত্ত্বেও মেরিন ল্যা পেনের কট্টর ডানপন্থি দল জনপ্রিয় ভোট অর্জনে নতুন রেকর্ড গড়েছে। যা ফ্রান্সের মধ্যপন্থি রাজনীতিকে নাটকীয়ভাবে ডানপন্থার দিকে টেনে নিয়ে গেছে। এদিকে নাৎসি যুগের পর জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থি দল এএফডি নতুন যুগের সূচনা করেছে যারা বর্তমান সরকারে অন্যতম বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি করেছে। এ মাসের শুরুর দিকে সুইডেনে অভিবাসনবিরোধী দল ‘সুইডেন ডেমোক্র্যাট’ নতুন সরকার গড়েছে। মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করা এই দলের রয়েছে নব্য নাৎসিবাদী শেকড়। সবশেষ ইতালিতেও কট্টর ডানপন্থি ও রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী দল ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে।
বর্তমানে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলার জের ধরে ইউরোপজুড়ে জ্বালানি সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। নজিরবিহীন এই সংকটই এ অঞ্চলটির সাধারণ মানুষকে ডানপন্থিদের প্রতি আস্থাশীল করে তুলছে। যার ফলে সেখানে সরকার ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী ঢেউ প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে। যা বিভিন্ন প্রান্তে ‘পপুলিস্ট’ ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে সাফল্য এনে দিচ্ছে। কিংস কলেজ লন্ডনের ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক গ্রিফিনি বলেছেন, ইতালির সাম্প্রতিক দুর্দশা দেশটির ভোটারকে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠানবিরোধী ধারণার প্রতি আবেগি করে তুলেছে। ‘ইতালি করোনা মহামারীতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিশেষ করে প্রথম ঢেউয়ে অনেক মানুষ মারা গেছে, অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে পড়ে। তখন বাকি ইইউ দেশ থেকে সহায়তা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। সে কারণেই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সরকার হিসেবে কন্তে ও দ্রাঘির সরকারকে লক্ষ্যবস্তু করা সহজ হয়ে উঠেছে।’
মেলোনির শৈশব ও লেখাপড়া
জর্জা মেলোনি হলেন ইতালির একজন রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক। ২০০৬ সাল থেকে তিনি ইতালির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ চেম্বার অব ডেপুটিসের সদস্য। ২০১৪ সালে কট্টর ডানপন্থি দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’কে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। ২০২০ সাল থেকে ইউরোপিয়ান কনজারভেটিভস অ্যান্ড রিফর্মিস্ট পার্টির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।
১৯৭৭ সালের ১৫ জানুয়ারি। রোমের এক খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নেন জর্জা মেলোনি। তার বাবা ফ্রান্সেসকো আর মা আনা। ফ্রান্সেসকো ছিলেন একজন কর উপদেষ্টা। তিনি সার্দিনিয়া থেকে ও আনা সিসিলি থেকে ইতালিতে এসেছিলেন। ফ্রান্সেসকো ছিলেন বামপন্থি আর আনা ডানপন্থি ছিলেন। মেলোনির বয়স তখন ১১। ফ্রান্সেসকো তার পরিবারকে ছেড়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে চলে যান। এরপর মেলোনির মা আনা তাকে নিয়ে নানাবাড়ির কাছে গারবাতেল্লায় চলে আসেন। রোমের দক্ষিণাঞ্চলের এই জেলাটিতেই শ্রমজীবী শ্রেণি বাস করত। এলাকাটি বামপন্থিদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। সে সময় গারবাতেল্লায়ই বেড়ে উঠেছিলেন মেলোনি। অনেকে মনে করেন, বাবার অনুপস্থিতিতে প্রতিশোধের নেশায় মেলোনি রাজনীতির পথ বেছে নিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সাল। মেলোনি রোমের আমেরিগো ভেসপুচি ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তখন তিনি ওই ইনস্টিটিউট থেকে ভাষার ওপর হাই স্কুল ডিপ্লোমা পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। যা পরে বিতর্কের জন্ম দেয়। কারণ কারিগরি শিক্ষার ওই ইনস্টিটিউটটি তখন পর্যটনশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। সেখানে ভাষার ওপর কোনো কোর্স ছিল না।
রাজনৈতিক জীবন
১৯৯২ সাল। মেলোনির তখন বয়স ১৫। সে সময় নব্য ফ্যাসিবাদী দল ইতালিয়ান সোশ্যাল মুভমেন্টের (এমএসআই) তরুণ শাখার যুব ফ্রন্টে যোগ দেন তিনি। দলটি তখন নব্য ফ্যাসিবাদী ভাবধারায় উজ্জীবিত ছিল। শিক্ষা পুনর্গঠন কর্মসূচির আন্দোলনে তখন অংশ নিয়েছিলেন মেলোনি। পরে ১৯৯৬ সালে তিনি ছাত্র আন্দোলনের জাতীয় জোট (এএন) স্টুডেন্ট অ্যাকশনের জাতীয় নেতা হয়ে ওঠেন। এমএসআই’র বৈধ উত্তরসূরি ছিল জোট এএন । ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় সেই সময়ে মেলোনি এমএসআই’র মার্কো মার্সিলির একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রাজনৈতিক মিত্র হয়ে ওঠেন। তিনি সবসময় নিজেকে গম্ভীর, আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছাত্রনেতার ভূমিকায় রেখেছিলেন।
পরের পাঁচ বছর (১৯৯৮ থেকে ২০০২ পর্যন্ত) তিনি রোম প্রদেশের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালে মেলোনি ইয়ুথ অ্যাকশনের যুব ফ্রন্টের জাতীয় পরিচালক ও ২০০৪ সালে নারী সভাপতির দায়িত্ব পান। ২০০৬ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে তিনি ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সের সদস্য হিসেবে চেম্বার অব ডেপুটি নির্বাচিত হন। এ বছরই তিনি সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
২০০৮ সাল। মেলোনির বয়স তখন ৩১। ইতালির ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে তিনি সিলভিও বারলুসকোনির যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী নিযুক্ত হন। ২০১১ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বে বহাল ছিলেন তিনি। এর আগে ২০০৯ সালে তার দল ফরজা ইতালিয়ার সঙ্গে যোগ দেয়। নতুন দল হিসেবে দ্য পিপলস অব ফ্রিডম নামে আত্মপ্রকাশ করে। সে সময় তিনি ইউনাইটেড দলের যুব শাখার সভাপতির দায়িত্ব নেন। ২০১২ সালের ডিসেম্বর। মেলোনি লা রুসা ও ক্রেসেত্তোকে সঙ্গে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল ব্রাদার্স অব ইতালি (এফডিআই) গঠন করেন। ২০১৪ সালের মার্চে তিনি এফডিআইর সভাপতি নির্বাচিত হন। ওই বছরই ইতালিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন মেলোনি। এর এক বছর পর তিনি রোম পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু এই দুই নির্বাচনে জয় পেতে ব্যর্থ হন তিনি।
নিজের নির্বাচনী প্রচারণার জন্য ২০১৫ সালে একটি রক্ষণশীল রাজনৈতিক কমিটি গঠন করেন মেলোনি যার নাম রাখা হয় আওয়ার ল্যান্ড ইতালিয়ানস উইথ জর্জা মেলোনি। এফডিআইর এই অঙ্গ-সংগঠনটি জাতীয়তাবাদী দলটির জনপ্রিয়তার ভিত গড়েছিল। সে সময় দলের নেতা হিসেবে মেলোনি সালভানির দল লিগের সঙ্গে জোট গড়েন। ডেমোক্র্যাটিক পার্টি পরিচালিত সরকারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি প্রচারণায় সালভানির সঙ্গে যোগও দিয়েছিলেন তিনি।
পরে ২০১৮ সালে ইতালিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে তিনি ব্রাদার্স অব ইতালিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তবে এই নির্বাচনে তার দল মাত্র চার শতাংশ ভোট পেলেও জনমত গঠনে সমর্থ হয়। এর পরই মারিও দ্রাঘি জাতীয় ঐক্যজোট সরকার গঠন করে। এই সরকারের পুরোটা সময় এফডিআই বিরোধী দল হিসেবে পার্লামেন্টে সরব ছিল। দ্রাঘির ঐক্যজোট সরকার পার্লামেন্টে অনাস্থার মুখে পড়ে। ফলে চলতি বছর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই সাধারণ নির্বাচনে প্রাজ্ঞ রাজনীতিক মেলোনির নেতৃত্বে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে ব্রাদার্স অব ইতালি দল।
আদর্শ ও এফডিআই গঠন
দুটি বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানি যতটা দক্ষ হাতে নাৎসিবাদের মূল উৎপাটন করেছে, ইতালি ততটা পারেনি। যার ফলে সেখানে ডানপন্থি আদর্শের অনুসারী অতি রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী (ফ্যাসিস্ট) দলগুলো বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে। ৪৫ বছর বয়সী জর্জা মেলোনিও সতর্কতার সঙ্গে এই রাজনৈতিক ভাবাদর্শ বজায় রেখে চলেছেন। তৃণমূল পর্যায়ে ছাত্র আন্দোলন দিয়ে শুরু করেছিলেন রাজনীতি। পরে জাতীয় রাজনীতির একজন প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠেন। এজন্য মেলোনিকে ৩ দশকের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। তবে শুরু থেকেই নিজের পপুলিস্ট জাতীয়তাবাদী ও কট্টর ডানপন্থি ভাবমূর্তি ধরে রেখেছেন। ব্রাদার্স অব ইতালি দলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নেতা তিনি। দলটির রাজনৈতিক শেকড় ফ্যাসিবাদের গভীরে গাঁথা। মুসোলিনির ফ্যাসিবাদ থেকে যার গোড়াপত্তন। ব্রাদার্স অব ইতালি যুদ্ধ-পরবর্তী কট্টর ডানপন্থি লোগোর ব্যবহার জারি রেখেছে। যাতে রয়েছে তিন রঙা অগ্নিশিখা। যে লোগোকে অনেকেই মুসোলিনির সমাধিতে জ্বলন্ত আগুনের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। মেলোনিকে বরাবর এই ফ্যাসিবাদের অনুসারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তার রাজনৈতিক পরিচয়ে বরাবর কট্টর ডানপন্থি বা ফ্যাসিস্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে এই তকমা প্রত্যাখ্যান করে মেলোনি নিজেকে একজন খ্রিস্টান হিসেবে বরাবর ঈশ^র ও জন্মভূমির রক্ষাকারী হিসেবে তুলে ধরেন।
নিজের ফ্যাসিস্ট পরিচয় জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে এক ভিডিও বার্তায় জর্জা মেলোনি জোর দিয়ে বলেছেন, ফ্যাসিবাদী আদর্শ ইতিহাস হয়ে গেছে। এদিকে রোমের সাপিয়েঞ্জা বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জিয়ানলুকা প্যাসারেলি বলেন, ‘জর্জা মেলোনি এই প্রতীকটি বাদ দিতে চান না। কারণ এই রাজনীতির পরিচয় থেকে তিনি পালাতে পারবেন না, এটি তার যৌবনের অলঙ্কার। তার দল সরাসরি ফ্যাসিবাদী নয়। কিন্তু সেখানে নব্য-ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অংশ রয়েছে। তিনি কোনো না কোনোভাবে সবসময় এর মধ্যে থেকেই খেলে গেছেন।’
নীতি ও চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে মেলোনি অতিরক্ষণশীল নীতিতে বিশ্বাসী। গত কয়েক বছর ধরে তাকে কট্টর ডানপন্থিদের মতামত অনুসরণ করে চলতে দেখা গেছে। দ্রাঘি সরকারের ইউক্রেনপন্থি অবস্থানকে জোরালোভাবে সমর্থন করেন তিনি। তবে কঠোর রক্ষণশীল সামাজিক নীতির পক্ষে তার জোরালো অবস্থান উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এ সময় তাকে খোলাখুলিভাবে গর্ভপাতের অধিকার, ইউথানেশিয়া (যন্ত্রণাহীন মৃত্যু), বিবাহহীন সম্পর্ক এবং সমকামিতা থেকে বিশ্বায়ন পর্যন্ত সব কিছুর বিরুদ্ধেই কঠোর অবস্থান নিতে দেখা যায়। আবার অভিবাসী বিদ্বেষ ও ইসলাম বিদ্বেষের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সামরিক জোট ন্যাটোর সমর্থক হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্প্রসারণ নীতির বিরোধী মেলোনি। ১৯৯৬ সালে ইতালীয় স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনি এবং ২০২০ সালে নাৎসি সহযোগী ও এমএসআইর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জর্জিও আলমিরান্তের প্রশংসা করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন মেলোনি।
ইতালিতে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক স্থবিরতা চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই স্থবিরতা ও প্রবীণদের রাজনীতির সামাজিক প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে তিনি রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারেন। তাই রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা তাকে গণতন্ত্রের জন্য বিপদ হিসেবে না দেখলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য বিপদ বলে মনে করছেন। তাকে হাঙ্গেরি ভিক্টর অরবান ও ফ্রান্সের মেরিন ল্য পেনের মতো জাতীয়তাবাদী নেতাদের মিত্র হিসেবে ভাবা হয়। যিনি ‘এক জাতির ইউরোপ’-এর পক্ষে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, মেলোনির ইতালি ইউরোপকে দুর্বল করতে কাজ করবে।
মেলোনির কৈশোর ও তরুণ বয়স কেটেছে অতি ডানপন্থি আদর্শে। তবে তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সাধারণ মানুষের কাতারে বেড়ে ওঠা জনগণের প্রতিনিধি একজন নারী। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য মেলোনি তার নারী পরিচয়টি ব্যবহার করেছেন। তবে তা করেছেন পুরুষ রাজনীতিকের কায়দায়। ঐতিহ্যানুযায়ী ইতালিতে পরিবারের আধিপত্য থাকে মায়েদের হাতে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের লিঙ্গ সমতা জরিপ অনুসারে, ইতালিতে মাত্র ৪৯ শতাংশ নারী বাড়ির বাইরে কাজ করেন। এমন একটি দেশে মেলোনির পক্ষে নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা খুব সহজ নয়। সে তুলনায় বিশ^রাজনীতির অঙ্গনে তিনি হয়তো সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারবেন।
সরকার গঠন
এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে জর্জা মেলোনি ইতালির রাজনীতিতে দুটি ইতিহাস সৃষ্টি করেন। লিঙ্গের দিক থেকে যেমন জর্জা মেলোনি হলেন প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। আবার তিনি এমন একটি রাজনৈতিক দলকে নেতৃত্ব (ব্রাদার্স অব ইতালি) দিচ্ছেন, যারা মুসোলিনির সময় থেকে এ পর্যন্ত মূলধারার যেকোনো রাজনৈতিক দলের চেয়ে বেশি কট্টর ডানপন্থি আদর্শ অনুসরণ করছে। তবে ইতালিতে মেলোনিই একমাত্র কট্টর ডানপন্থি নন। তার আগেও দেশটিতে সফল পপুলিস্ট রাজনীতিবিদদের একটি দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। যারা সফল হয়ে সরকার গড়েছিলেন তারাই পরে বিরোধী দলে মেলোনির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ভোট অনুষ্ঠানের পর রাজধানী রোমে সাংবাদিকদের উদ্দেশে মেলোনি বলেছিলেন, তার ব্রাদার্স অব ইতালি দল সম্ভবত সরকার গড়তে যাচ্ছে। ‘যে সরকার হবে সবার’ এবং তারা জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করবে না। ব্রাদার্স অব ইতালির নেতৃত্বে একটি ডানপন্থি সরকার গড়তে এবার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ইতালিবাসী। এজন্য তোমাকে ধন্যবাদ ইতালি।’
২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফল অনুযায়ী অক্টোবরের শেষে নতুন সরকার গঠন করা হবে। একটি স্থিতিশীল সরকার কিভাবে নেতৃত্ব দিতে পারে তা নির্ধারণ করতে সব দলের নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করবেন রাষ্ট্রপতি সার্জিও মাত্তারেলা। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীত্বের দৌড়ে এগিয়ে থাকা জর্জা মেলোনি নিজের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করবেন।