ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ সাত মাস ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ইউক্রেনের অলিভিয়া বন্দরে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় জাহাজটির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না বিএসসি কর্মকর্তারাও। তবে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে জাহাজটি স্ক্র্যাপে পরিণত হওয়ার আশংকা রয়েছে বলে জানান শিপিং সংশ্লিষ্টরা।
বিএসসি সূত্র জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ বাংলার সমৃদ্ধির ক্ষতিপূরণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানির কাছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের পক্ষ থেকে ২ কোটি ২৪ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক দুটি বীমা সংস্থার কাছে এ ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। বীমা প্রতিষ্ঠান দুটি হলো বাংলাদেশের সাধারণ বীমা করপোরেশন ও লন্ডনভিত্তিক টাইজার্স। নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের অঙ্কের ১০ শতাংশ সাধারণ বীমা ও ৯০ শতাংশ টাইজার্স পরিশোধ করার কথা।
বিএসসির উপ-মহাব্যবস্থাপক ক্যাপ্টেন মো. মুজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, অলিভিয়া বন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার জাহাজটি এখনো সেখানে পড়ে আছে। তবে জাহাজটি নতুন করে কোনো হামলার শিকার হয়নি। তিনি জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলমান থাকায় বীমা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে জাহাজের ক্ষতি নিরূপণ এখনো সম্ভব হয়নি। তাই কবে নাগাদ বীমা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত নয়।
এদিকে বিএসসির একটি সূত্র জানায়, অলিভিয়া বন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজের নেভিগেশন সিস্টেম ও মেইন জেনারেটর অচল হয়ে যায়। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাহাজটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ অবস্থায় জাহাজটি নিয়ে দুটি বিষয় চিন্তা করা হয়। প্রথমত, জাহাজটি সেখান থেকে উদ্ধার করে নিকটস্থ কোনো ইয়ার্ডে নিয়ে মেরামতের মাধ্যমে ব্যবহার উপযোগী করা। দ্বিতীয়ত, বীমা কোম্পানির কাছ থেকে সরাসরি ক্ষতিপূরণ আদায় করা।
সূত্র জানায়, পরিত্যক্ত অবস্থায় ইতিমধ্যে সাত মাস পার হয়েছে। আগামী পাঁচ মাসের মধ্যে জাহাজটিকে সেখান থেকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া গেলে বীমা কোম্পানির অর্থে জাহাজটি মেরামত করা সম্ভব। তবে যদি এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পাঁচ মাসের বেশি সময় লেগে যায় তাহলে বীমা প্রতিষ্ঠান থেকে পুরো খরচ বের করা কঠিন হবে। এক্ষেত্রে হয়ত জাহাজটি স্ক্র্যাপ করার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএমওএ) প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন মো. এনাম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ইউক্রেনের বন্দরে রয়েছে। সেখান থেকে কখন এই জাহাজ সরানো যাবে তা অনিশ্চিত। যুদ্ধ পরিস্থিতি যে অবস্থায় আছে তাতে কখন তা শেষ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যুদ্ধ বন্ধ হলেও সমুদ্র থেকে মাইন না সরালে সেখান থেকে কোনো জাহাজ বের করা যাবে না। এতে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে। তিনি বলেন, বিএসসির পক্ষ থেকে বীমা প্রতিষ্ঠানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করলেও এই ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে বীমা প্রতিষ্ঠানকে জাহাজে গিয়ে সার্ভে করতে হবে। কিন্তু যুদ্ধ না থামলে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন বাল্ক ক্যারিয়ার এমভি বাংলার সমৃদ্ধি গত ২১ ফেব্রুয়ারি কার্গো নেওয়ার জন্য তুরস্কের ইরেগলি বন্দর থেকে ইউক্রেনের অলিভিয়া বন্দরে যায়। ২২ ফেব্রুয়ারি ওই বন্দরে নোঙর করে জাহাজটি। ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলা শুরু হলে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েন জাহাজটির নাবিকরা। গত ২ মার্চ জাহাজটির ওপর রকেট হামলা হয়। হামলায় জাহাজটি বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। অচল হয়ে যায় এর নেভিগেশন সিস্টেম ও মেইন জেনারেটর। জাহাজটির থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান এ ঘটনায় প্রাণ হারান। পরবর্তীতে সরকারের প্রচেষ্টায় জাহাজটিতে থাকা অপর ২৮ নাবিক ও নিহত হাদিসুরের মরদেহ রোমানিয়া হয়ে বাংলাদেশ আনা হয়।