টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে বিদেশি কুকুরের খামার করে রীতিমত আলোচনায় উঠে এসেছেন দিলীপ কুমার সাহা নামের এক ব্যক্তি। শখ করে এক জোড়া কুকুর পালন করতে গিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন বড় ধরনের একটি বাণিজ্যিক কুকুরের খামার। দিলীপ কুমারের বাড়ি উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের মহেড়া গ্রামে।
দিলীপ কুমারের গড়ে তোলা খামারে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট বড় ৭৫টি কুকুর। দেশের বিভিন্ন স্থান এবং আশপাশের এলাকার উৎসুক মানুষেরা প্রতিদিনই ছুটে আসছেন ব্যতিক্রমী এই খামার দেখতে। কেউ কেউ কিনে নিয়ে যান পছন্দের কুকুর।
জানা যায়, দিলিপ কুমার সাহা দীর্ঘদিন সৌদি আরবে থেকেছেন। তাছাড়া তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। তার ভাই গৌতম সাহা সিঙ্গাপুরে এবং ছেলে বিবেক সাহা বিভিন্ন দেশে ঘুরেছেন। এসময় সৌখিন কুকুর প্রেমীদের নানা প্রজাতির কুকুর পালন দেখে তারা আগ্রহী হয়ে ওঠেন। আট বছর আগে শখের বশে নিজের বাড়িতে বিদেশি প্রজাতির এক জোড়া কুকুর পালন শুরু করেন তার ছেলে বিবেক সাহা। পরবর্তীতে এর পরিধি আস্তে আস্তে বাড়িয়ে নিজ বাড়িতে ২০ শতাংশ জমিতে ২০২০ সালের শেষের দিকে গড়ে তোলেন ‘অর্ক ক্যানেল খামার’ নামে একটি বিদেশি কুকুরের খামার। এই খামার পরিচালনার দায়িত্ব দেন তার ছোট ভাই গৌতম সাহাকে। এরই মধ্যে দিলীপ কুমারের ছেলে বিবেক সাহার সঙ্গে ভারতের দিল্লিতে পরিচয় হয় অভিষেক শর্মা নামে একজন ভেটেরনারি চিকিৎকের। টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিতে তিনি আসেন মহেড়াতে। এখন তিনি সেখানে অবস্থান করে নিয়মিতই খামারে সময় দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
বর্তমানে এই খামারে ডগ আর্জিন্টিনা, পিট বুল, ইউএস বুলি, কান কোর্সো, ফ্রান্স মার্সিভ, চাউচাউসহ ২৪ প্রজাতির ৭৫টি ছোট বড় কুকুর রয়েছে। যাদের বসবাসের জন্য রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর। এসব কুকুর তিনি ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করেছেন। কুকুরগুলোকে সকাল-বিকেল ভাত, মাংস, সবজি একত্রে রান্না করে খাওয়ানো হয়। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮ কেজি মুরগি, দুইটি মিষ্টি কুমড়া ও চাল রান্না করে কুকুরকে দিনে দুইবার খাওয়ানো হয়। ওই খামারে স্থানীয় তিনজন দরিদ্র লোকের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা এই খামারে আসেন কুকুর দেখতে। অনেকে আবার নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী কুকুর কিনে নেয়। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কুকুর বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে। এই খামার থেকে কুকুর ক্রয় করলে অন্য দেশ থেকে আমদানি করা কুকুরের চেয়ে ৫০ শতাংশ সাশ্রয় হবে বলে জানালেন খামারের পরিচালক ।
দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা এ খামারে শিকার, দোকান ও অফিস পাহারাদারি, ছাগল-ভেড়া ইত্যাদির হেফাজত, ঘরবাড়ি পাহাদারি, অপরাধের উৎস সন্ধান ও অপরাধীকে চিহ্নিত করার মতো কুকুর পাওয়া যায়। প্রতিটি কুকুর প্রজাতি ও আকারভেদে ২০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়।
খামারে কাজ করা শ্রমিক মাসুদ মিয়া বলেন, আগে কৃষিকাজ করতাম তখন নিয়মিত কাজ হতো না। দুই বছর ধরে এই খামারে কাজ করি। নিয়মিত কাজ হওয়ায় এখন আর আগের মত কাজ নিয়ে চিন্তা করতে হয় না।
খামারের টেকনিক্যাল সাপোর্ট প্রদানকারী কর্মকর্তা অভিষেক শর্মা জানান, দিলীপ সাহার ছেলে বিবেক সাহা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার প্রস্তাব উপেক্ষা করতে না পেরে তিনি ভারতের দিল্লি থেকে বাংলাদেশে কুকুরের খামার দেখভাল করতে এসেছেন। খামারে কাউজিয়া ম্যাদার্ব, আলাবার সেন্ট্রাল, রাশিয়ান সামায়েল, তিব্বতি স্যাস্টিট, পেটবোল ও জার্মন ফেফার্ড প্রজাতির কুকুরও আছে।
অর্ক ক্যানেলের মালিক দিলীপ কুমার সাহা বলেন, উন্নত বিশ্বে পোষা প্রাণী হিসেবে কুকুর বেশ জনপ্রিয়। আমার খামারের কুকুরগুলো অফলাইন-অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। প্রতিটি কুকুর প্রজাতি ও আকারভেদে ২০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি হয়। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত খামারে সব মিলিয়ে দেড় কোটি টাকা খরচ হয়েছে। স্বল্প সুদে ঋণ পেলে খামারটি পরিচালনা করতে সহজ হবে।
মহেড়া ইউপি চেয়ারম্যান বিভাষ সরকার নুপুর বলেন, তাদের উদ্যোগটি ভাল। তবে খামার থেকে দুর্গন্ধ বের হয়ে যাতে আশপাশের পরিবেশ নষ্ট না হয় সেদিকেও খামার মালিক এবং পরিচলককে খেয়াল রাখতে হবে।
উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. এ কে এম আতিকুর রহমান জানান, বিষয়টি নিঃসন্দেহে ভাল উদ্যোগ। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পোষা কুকুরের চাহিদা রয়েছে। প্রজননের মাধ্যমে কুকুর উৎপাদন করে পোষাপ্রাণী হিসেবে বিক্রি করতে পারলে পরিবারটি বেশ লাভবান হবে।