বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাতে দুঃসংবাদ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও উচ্চমূল্যস্ফীতি, এবার বড় দুঃসংবাদ এলো বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই খাত রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো জানিয়েছে, টানা ১৩ মাস প্রবৃদ্ধির পর সদ্য শেষ হওয়া সেপ্টেম্বরে দেশের রপ্তানি আয় কমেছে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। একই মাসে প্রবাসী আয়ও কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে প্রবাসী আয় সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্নে।

এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিটের (আকু) দেনা শোধ করার পর বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যেই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে পতনের খবরে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে অর্থনীতিতে। বাণিজ্য ঘাটতির কারণে রিজার্ভ আরও চাপে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান দুই অঞ্চল হচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকা। আর রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক বেড়েছে। এ কারণে তারা পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছে। খাদ্যের পেছনেই অনেক বেশি খরচ করতে হচ্ছে তাদের। সে কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমছে। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, সদ্য শেষ হওয়া সেপ্টেম্বরে পোশাক রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ কমে গেছে।

ইপিবির তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বরে রপ্তানির বিপরীতে আয় হয়েছে ৩৯০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২০ কোটি ডলার; অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৯ দশমিক ৪৯ কোটি ডলার বা ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ কম আয় হয়েছে। আর ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় রপ্তানি আয় ২৬ কোটি ডলার বা ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ কমেছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৪১৬ কোটি ৫৪ লাখ ডলার।

অবশ্য তৈরি পোশাক মালিকসহ অন্য ব্যবসায়ীরা আগেই শঙ্কা প্রকাশ করছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজার থেকে ক্রয়াদেশ কমে যাবে। ফলে দেশের রপ্তানি আয়ও কমে আসবে।

এ বিষয়ে গতকাল সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘আমরা কয়েক মাস ধরে বলে আসছি, আমাদের অর্ডার কম আসছে, সেপ্টেম্বরে পোশাক খাতের রপ্তানি কমে আসবে।’

এদিকে সেপ্টেম্বরে আয় কমলেও সার্বিকভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। এই প্রান্তিকে ১ হাজার ২৪৯ কোটি ৬৮ লাখ ডলারের পণ্য বিদেশে রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যা ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ছিল ১ হাজার ১০২ কোটি ১৯ লাখ ডলার। সেই তুলনায় চলতি প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

সেপ্টেম্বরে তৈরি পোশাক থেকে আয় কমলেও চলতি প্রথম প্রান্তিকে পোশাক রপ্তানিতে এখনো প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। বিজিএমইএ জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে পোশাক রপ্তানি ১ হাজার ২৭ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় ১৩ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি।

সদ্য শেষ হওয়া সেপ্টেম্বরে নিটওয়্যার রপ্তানি ৯ শতাংশ ও ওভেন ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমেছে। বিজিএমইএ জানিয়েছে, কভিড-পরবর্তী বিশ^ব্যাপী খুচরা বাজার বিভিন্ন সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে; বিশেষ করে কনটেইনারের অপ্রতুলতা, সাপ্লাই চেইন সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবর্তিত বিশ^ অর্থনীতিতে মন্দার পূর্বাভাসে খুচরা বিক্রি কমে গেছে। ক্রেতারা তাদের ইনভেন্টরি এবং সাপ্লাই চেইনকে নিজেদের জন্য লাভজনক রাখতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এমনকি কোনো কোনো ক্রেতা উৎপাদন ও অর্ডার পর্যন্ত আটকে রেখেছে। এতে করে সামগ্রিকভাবে শিল্পের জন্য একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি বৈধ চ্যানেলে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সও কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ২০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এলেও তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে তা প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গেছে। গতকাল রবিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে ১৫৩ কোটি ৯৫ লাখ মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন। প্রবাসী আয়ের এ অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ কোটি ৭২ লাখ ডলার বা ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৭২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার, যা গত ৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ১৪৯ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। সেপ্টেম্বরের চেয়ে কেবল ওই মাসে কম এসেছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত অন্য সব মাসে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে।

চলতি অর্থবছরের টানা দুই মাস ২০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স বৈধ পথে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। আগস্ট মাসে ২০৩ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। তার আগের মাস জুলাইয়ে এসেছিল ২০৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। জুলাই মাসে পবিত্র ঈদুল আজহার কারণে বেশি পরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছিল। তবে আগস্টে বড় উৎসব ছিল না, তারপরও  প্রবাসী আয় ২০০ কোটি ডলার ছাড়ায়।

বাফেদার ঘোষিত দাম অনুযায়ী, এখন দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে প্রতি ডলার সর্বোচ্চ ১০৭ টাকা ৫০ পয়সায় কিনতে পারবে ব্যাংকগুলো। গত মাসে (সেপ্টেম্বর) সর্বোচ্চ দর ছিল ১০৮ টাকা।