আজ ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। সারা বিশ্বে সরকারি উদ্যোগে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হলেও বাংলাদেশে সরকারিভাবে পালনের তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ে না। তবে ইউনেসকো কমিশন, কিছু শিক্ষক সংগঠন ও দু-একটি এনজিও দিবসটি পালন করে থাকে। ১৯৬৬ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে এবং ইউনেসকোর তত্ত্বাবধানে প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধিদের এক সভায় এই দিনটিকে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ওই সভায় শিক্ষকদের মর্যাদাবিষয়ক একটি সুপারিশমালা গৃহীত হয়। ‘আইএলও’ এই সুপারিশমালা অনুসমর্থন করে। এই সুপারিশমালাটি মূলত বিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য রচিত হয়েছিল। পরে ইউনেসকো ও আইএলওর ১৯৭৭ এবং ১৯৮৮ সালে শিক্ষকদের মর্যাদাবিষয়ক আরও দুটি ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। ফলে সর্বস্তরের শিক্ষকের অধিকার, মর্যাদা ও কর্র্তৃত্ব সমন্বয়ে ইউনেসকো-আইএলও একটি অভিন্ন নীতিমালা তৈরি করে। এসব নীতিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তায় জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর।
ইউনেসকো দিবসটি উপলক্ষে প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে থাকে। এবারের প্রতিপাদ্যশিক্ষার রূপান্তর শুরু হয় শিক্ষকদের মাধ্যমে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানান আয়োজনে শিক্ষক দিবস উদযাপন করে থাকে। পাশের দেশ ভারতে একটি বিশেষ দিনে শিক্ষকদের সম্মানে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এদিন শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মিষ্টিমুখ করান এবং বিভিন্ন উপহারসামগ্রী দেন। শিক্ষকরাও তা উপভোগ করেন এবং তাদের সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের আশীর্বাদ করেন। শিক্ষকদের সম্পর্কে এক জাপানির প্রবাদে বলা হয়‘সহস্র দিবসের পাঠচর্চা অপেক্ষা একজন মহান শিক্ষকের এক দিনের সান্নিধ্য অনেক ভালো।’ গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলের মতে‘যারা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রত তারা অভিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মানীয়।’ বাংলাদেশে শিক্ষার অধিকার ও শিক্ষকের মর্যাদার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। টানা ২০০ বছরের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং তেইশ বছরের পাকিস্তানি শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন ও শিক্ষা-সংকোচননীতি শিক্ষা ও শিক্ষকের মর্যাদার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ফলে শিক্ষা-দীক্ষায় আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ি। বাংলাদেশে একসময় শিক্ষকদের কোনো বেতনই দেওয়া হতো না। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৪৪ সালে শিক্ষকদের জন্য মাসিক ৫ টাকা ভাতা চালু হয়। তখন শিক্ষক বলতে বোঝাত জীর্ণশীর্ণ চেহারা, মলিন জামা, পায়ে ছেঁড়া জুতা, হাতে তালি দেওয়া ছাতা।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে বঙ্গবন্ধু সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষার ভিত রচনা করেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে একসঙ্গে ৩৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছিলেন। তিনি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন পঁচাত্তর টাকা এবং কলেজ শিক্ষকদের বেতন একশ টাকা চালু করেছিলেন। তখন অনেকেই অর্থনৈতিক সংকটের কথা উল্লেখ করে ওই মুহূর্তে শিক্ষায় এত বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি সোনার বাংলা গড়বএজন্য সোনার মানুষ চাই। সেই সোনার মানুষ তৈরি করবেন আমার শিক্ষকরা। তাদের পেটে ক্ষুধা রেখে সোনার মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়।’ শুধু তা-ই নয় দেশের শিক্ষানীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শিক্ষকদের মেধা মননের সৃজনশীল চিন্তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে গঠিত শিক্ষা কমিশন তার প্রমাণ। তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. এ আর মল্লিক ও অধ্যাপক কবির চৌধুরীকে স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাসচিব করেছিলেন। শিক্ষকদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর এরূপ অনুরাগ, ভালোবাসা ও সম্মান জানানোর এ রকম অনেক নজির রয়েছে। কালের বিবর্তনে আমাদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধাও বেড়েছে। বর্তমান সরকার শিক্ষার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তথাপিও শিক্ষা খাতে এখনো নানান সমস্যা বিরাজমান। শিক্ষকদের মর্যাদার ক্ষেত্রেও অনেক ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৯৮ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা ও গভর্নিং কমিটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি নির্ভর করে এসব কমিটির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। কমিটিতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেক অনাকাক্সিক্ষত ব্যক্তি অযাচিত হস্তক্ষেপ করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে শিক্ষকদের মর্যাদা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। মর্যাদার সঙ্গে শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিও জড়িত। একজন শিক্ষক যদি তার জীবিকা নির্বাহের জন্য কর্র্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সাপোর্ট না পান তখন তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য টিউশনি বা পার্টটাইম অন্য কোনো পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে বাধ্য হন। অনেক ক্ষেত্রে সেটা তার শিক্ষকতা পেশা বা সম্মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আবার শুধু আর্থিক সচ্ছলতার ওপরই একজন শিক্ষকের মর্যাদা নির্ভর করে না। শিক্ষকতা পেশা যেহেতু জ্ঞানচর্চা বা জ্ঞান বিতরণের সঙ্গে জড়িত, তাই রাষ্ট্র বিনির্মাণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের কতটুকু ভূমিকা রাখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে সেটাও বিবেচ্য বিষয়। একসময় বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান, অধ্যক্ষ হুমায়ুন খালিদ, সামসুল হকসহ অনেক শিক্ষকই জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বর্তমানে জাতীয় সংসদে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব একেবারেই নগণ্য। জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ঘোষিত জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৮ শতাংশ এবং সর্বশেষ ডাকারে অনুষ্ঠিত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের সভায় আপাতত জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশ সরকারও এই সিদ্ধান্তে স্বাক্ষরকারী দেশ। কিন্তু আমাদের সরকার শিক্ষা খাতে জিডিপির ২.০৮ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
অথচ ১৯৭০ সালের এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সুষ্ঠু সমাজ গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর হইতে পারে না।’ বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার রূপকল্প ২০৪১ ঘোষণা করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক ঘোষণা করেছে। এতে করে শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি আমূল পরিবর্তন ঘটবে বলে সবাই আশা প্রকাশ করছেন। তবে শিক্ষার নতুন ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নে অনেক চ্যালেঞ্জও সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে এখন থেকেই সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য বাজেটে শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। শিক্ষকদের ব্যাপকভাবে ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি তাদের পর্যাপ্ত আর্থিক সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। দেশ গঠনে তাদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ সেক্রেটারি, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব টিচার্স ইউনিয়ন
salamshaju@yahoo.com