মজদুরদের নেতা নাকি রক্ষণশীল অভিভাবক

ব্রাজিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা প্রার্থিতার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী কট্টর ডানপন্থি নেতা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো। সাবেক সামরিক কর্মকর্তা বলসোনারো নাকি জুতা পালিশ করে শৈশব কাটানো জনপ্রিয় শ্রমিক নেতা লুলা হবেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট? লিখেছেন নাসরিন শওকত 

দক্ষিণ আমেরিকার পাওয়ার হাউজ ব্রাজিল। যেখানে চার দশক হলো গণতন্ত্রের উত্তরণ ঘটেছে। ২ অক্টোবর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম দফার ভোটগ্রহণ হয়েছে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে বামপন্থি সাবেক প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বিজয়ী হলেও ৫০ শতাংশ ভোট পাননি। কট্টর ডানপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারোর চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন তিনি। জনমত জরিপকে ভুল প্রমাণ করে ভালো জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো। সবশেষ দেশটির সুপিরিয়র ইলেকটোরাল ট্রাইব্যুনালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৯৯ শতাংশের বেশি কেন্দ্রের ভোট গণনার পর লুলা পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ ভোট। বলসোনারো পেয়েছেন ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ। নিয়ম অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য কোনো প্রার্থীই সর্বনিম্ন ৫০ শতাংশ ভোট নিশ্চিত করতে পারেননি। তাই ব্যাপক বিভক্তির এ নির্বাচনী লড়াই দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে। ৩০ অক্টোবর দ্বিতীয় দফা ভোটে গ্রহণ হবে। যেখানে শুধু এই দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

এবারের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদের প্রধান দুই প্রার্থী বিপরীত রাজনৈতিক মতাদর্শের। লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ব্রাজিলের একজন রাজনীতিবিদ ও শ্রমিক নেতা। যিনি লুলা নামেই বেশি পরিচিত। ৭৬ বছর বয়সী সাবেক জনপ্রিয় এই প্রেসিডেন্ট বামপন্থি। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি ব্রাজিলের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি দেশটির রাজনৈতিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির (পিটি) একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও। পরপর তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ব্যর্থ হন। লুলা ২০০২ সালে ব্রাজিলের জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করেন। আবার ২০০৬ সালেও পুনর্নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালে দুর্নীতির দায়ে তার ১০ বছরের কারাদ- হয়। ফলে তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে লড়তে পারেননি। ২০১৯ সালে তার বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগ খারিজ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণেরও অনুমতি দেয় সুপ্রিম র্কোট। সবশেষ ২০২১ সালে তৃতীয়বারের মতো ২০২২ সালের জাতীয় নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন। ২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত দেশটির প্রথম জাতীয় নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে এগিয়ে আছেন। ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে লুলা ষষ্ঠবারের মতো প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়বেন। মজদুর শ্রমিক শ্রেণির প্রথমবারের এই প্রেসিডেন্ট ২০ বছর আগে যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতাদের একজন। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগের পর তার সেই সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। যার ফলে তাকে নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে ব্রাজিলের সাধারণ মানুষ। কেউ তাকে ব্রাজিলের রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখে থাকেন, আবার কারও কাছে তিনি দুর্নীতিবাজ একজন রাজনীতিক।

এদিকে ৬৭ বছর বয়সী জেইর বলসোনারো কট্টর ডানপন্থি মতাদর্শের রাজনীতিবিদ ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি দেশটির ৩৮তম প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৮ সালে তিনি কনজারভেটিভ সোশ্যাল লিবারেল পার্টির সদস্য হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন এবং ক্ষমতায় বসেই দলটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। ১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি রিও দ্য জেনিরিও রাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে ব্রাজিলের চেম্বার অব ডেপুটিজ হিসেবে কাজ করেন। ২০১৬ সালে তিনি সোশ্যাল ক্রিসচিয়ান পার্টিতে যোগ দেন। পরে ওই দল ত্যাগ করে ২০১৮ সালের ৭ অক্টোবর সোশ্যাল লিবারেল পার্টির সদস্য হিসেবে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তখন তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির ফার্নান্দ হাদ্দাদ। ওই বছরের ২৮ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে বলসোনারো ৫১ শতাংশ জনপ্রিয় ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্টের মেয়াদকালে বলসোনারো আমাজনের অভয়ারণ্যের অদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিরক্ষা থেকে সরে দাঁড়ান ও বন উজাড় কর্মসূচিতে সহায়তা করেন। যা তাকে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে ফেলেছিল। এবারের নির্বাচনের ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। ভোটগ্রহণের আগে বলসোনারো সতর্ক করে বলেছেন, হেরে গেলে সেই ফলকে চ্যালেঞ্জ করবেন তিনি।

২০২২ সালের জাতীয় এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি দেশটির ২৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় জেলার জন্য গভর্নর, সিনেটর, ডেপুটিজ নির্বাচন করেছেন ভোটাররা। মোট ১১ প্রার্থী প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে জোরালো অবস্থানে ছিলেন দুই রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রধান এই দুই প্রার্থী। বাকি প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের হার চার বা তিন শতাংশ কিংবা তারও কম।

প্রশ্ন একটাই, লুলা না বলসোনারো, কে হবেন ব্রাজিলের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট তা নির্ধারিত হবে দ্বিতীয় দফার ভোটে (রানঅফ)। তবে প্রথম দফার নির্বাচনে সরাসরি জয়ী হওয়া যেকোনো প্রার্থীর জন্যই অনেক কঠিন। তাই কয়েক দশকের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবারের নির্বাচনে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থাকলেও লুলার জন্য জয় পাওয়া সহজ হবে না।

লুলা দা সিলভা

১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর। ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পের্নামবোয়ুকোর কাইটেই জেলার একটি গ্রামে দরিদ্র এক পরিবারে সেদিন জন্ম নেন লুলা। পরিবারে আট ভাই বোনের মধ্যে লুলা ছিলেন সপ্তম। সামান্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের সুযোগ পেয়েছিলেন লুলা। যখন লুলার বয়স ১২, তখন পরিবারের আর্থিক ব্যয় মেটাতে প্রথমবারের মতো জুতা পালিশ করার কাজ করেন। পরে রাস্তায় ফেরি করেও কাটে তার শৈশব। ১৪ বছর বয়সে তিনি একটি গুদামে চাকরি পান। সেখানে অফিস বয়ের কাজ করতেন লুলা। ১৯৬০ সালে ব্রাজিলে সামরিক শাসন শুরু হয়। তখন লুলা একজন লেথ অপারেট হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে সাও পাওলোর চার্চের বাইরে একটি বেঞ্চে বসে ছিলেন লুলা। তখন এক গুপ্ত এজেন্ট তাকে বামপন্থি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। লুলা তার ভাই ফ্রেই শিকোর অনুপ্রেরণায় শ্রমিক আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৭৫ ও ১৯৭৮ সালে সাও বেরনার্দো দো কাম্পো ও জিয়াদেমাএই দুই শহরের স্টিল মিলের শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭০ সালের শেষ দিকে সামরিক শাসন তখনও জারি ছিল ব্রাজিলে। তখন লুলা ইউনিয়ন কর্মকা- সংঘটনে সহযোগিতা করেন। এর মধ্যে প্রধান শ্রমিক অবরোধও ছিল। ওই সময়ের অবরোধকে শ্রম আদালত অবৈধ ঘোষণা করে। ফলে লুলাকে এক মাসের কারাভোগ করতে হয় তখন।

আন্দোলন-সংগ্রামে

১৯৭৫ সালে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন লুলা। ১৯৭৯ সালের দিকে বেশকিছু ঐতিহাসিক অবরোধ করেন তিনি। এর মধ্যদিয়ে নিজেকে ব্রাজিলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইউনিয়ন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। যা তার নিজের দল ওয়ার্কার্স পার্টি গঠনের পথকে প্রশস্ত করেছিল। ১৯৮০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারিতে একদল শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ইউনিয়ন নেতাসহ লুলা সেদিন তার দল ওয়ার্কার্স পার্টি (পিটি) গঠন করেন। ব্রাজিলের সামরিক শাসনের মাঝামাঝি সময়ে প্রগতিশীল ধারণার সঙ্গে বামপন্থি আদর্শের সমন্বয়ে ওয়ার্কার্স পার্টি কাজ করতে শুরু করেছিল। ১৯৮১ সালে তিনি তার ডাকনাম লুলাকে বৈধতা দেন। পরের বছর ইউনিয়ন অ্যাসোসিয়েশন গঠনে সহায়তা করেন। ১৯৮৪ সালে লুলা ও তার দল পিটি জনপ্রিয় প্রচারণায় ‘সরাসরি (নির্বাচন) এখন’-এ যোগ দেয়। এর মধ্য দিয়ে তখন তারা সরাসরি জনপ্রিয় ভোটের মাধ্যমে ব্রাজিলের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানান। যার ফসল হিসেবে ২৯ বছর পর ১৯৮৯ সালে প্রথমবারের মতো সরাসরি জনপ্রিয় ভোটে একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিল ব্রাজিলে।

জনপ্রিয়তা

লুলা ব্রাজিলের লৌহ মানবী খ্যাত রাজনীতিক দিলমা রৌসেফের উত্তরসূরি। সমাজে নিয়ন্ত্রিত পুনর্গঠনের জন্ম দিয়ে ব্রাজিলের রাজনীতিতে লুলাইজম নামে একটি দীর্ঘস্থায়ী ধারার প্রবর্তন করেছেন তিনি। যা লুলাকে লাতিন আমেরিকার রাজনীতির ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদদের একজন করে তোলে। তার রাজনৈতিক জীবনে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রোর প্রভাব ছিল যথেষ্ট। ১৯৮২ সালে লুলা ছিলেন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা। সে সময় রাজধানী সাও পাওলোর গভর্নর হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ও হেরে যান। এরপর তিনি রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে সরে থাকেন। পরে ক্যাস্ত্রোর পরামর্শে আবারও রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৮৯ সালে লুলা শ্রমিক শ্রেণির পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরেও যান। পরের আরও দুটি মেয়াদে ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের দুটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে আবারও ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালে ব্রাজিলের সাধারণ জনগণের মাঝে আশা জাগিয়ে তিনি চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেন ও দেশটির ৩৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

২০০৩ সাল। প্রথম প্রেসিডেন্টের মেয়াদকালে লুলা দেশের শ্রমিক শ্রেণি ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য একাধিক সামাজিক প্রকল্প হাতে নেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘বলসা ফ্যামিলিয়া’ ও ‘ফোমে জেরো’ নামের প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে তিনি দারিদ্র্য নির্মূলের চেষ্টা করেন। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে লুলা ব্রাজিলের কয়েক লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেনযা তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানিত একজন রাষ্ট্রনায়কের মর্যাদা এনে দেয়। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তখন তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুতে তিনি জোরালো অবস্থান নেন। তার দৃঢ় ওই ভূমিকার জন্য সে সময় তাকে ‘বিশে্বর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে একজন দুঃসাহসিক উচ্চাকাক্সক্ষী নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

২০১০ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান লুলা। তখন তার দল পিটি বড় ধরনের ধারাবাহিক দুর্নীতির কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং ব্রাজিলকে ভয়াবহ মন্দায় ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য লুলার দলকে দায়ী করা হয়। এর পরপরই ২০১৬ সালে লুলার রাজনীতির পথপ্রদর্শক দিলমা রৌসেফকে অভিসংশিত করা হয়। এর দুই বছর পর ২০১৮ সালে লুলাকে দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদন্ড দেওয়া হয়। পরে সেই অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়, যা তাকে ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পথকে সহজ করে দিয়েছে। লুলা কারাগারে কাটিয়েছেন ৫৮০ দিন।

লুলা ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে এবারের নির্বাচনে বেশকিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার মধ্যে সামাজিক বৈষম্য কাটিয়ে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ তার প্রচারণার মূল বিষয়। এ ছাড়াও তিনি যেসব পদক্ষেপের প্রস্তাব করেছেন তার মধ্যে রয়েছে ধনীদের ওপর কর বাড়ানো, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রশস্ত করা এবং ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করা, ব্রাজিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও আমাজনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

জেইর বলসোনারো

১৯৫৫ সালের মার্চ মাস। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য সাও পাওলোর গ্লিসারিও শহরে জার্মান-ইতালীয় বংশোদ্ভূত এক পরিবারে জন্ম নেন বলসোনারো। তারা বাবা ছিলেন পার্সি জেরালদো বলসোনারো ও মা ওলিন্দা বুন্তুরি। তার দাদা ১৮৮৩ সালে ব্রাজিলের সাও পাওলোতে অভিবাসী হিসেবে এসেছিলেন। ২০২২ সালে তার মা ওলিন্দা মারা যান। আর বাবা জেরালদো মারা যান ১৯৯৫ সালে। সাও পাওলোতে পরিবারের সঙ্গে কৈশোর কেটেছে বলসোনারোর। যেখানে তিনি তার পাঁচ ভাইয়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠেন। তার হাইস্কুল জীবনের শেষ দিকে ১৯৭৩ সালে তিনি ব্রাজিলের সামরিক স্কুলে ভর্তি হন। পরের বছর মূল সামরিক একাডেমিতে যান। বলসোনারো ১৯৭৭ সালে অগাস্থাস নেগারাস সামরিক একাডেমি থেকে আর্টিলারি কর্মকর্তা হিসেবে স্নাতক অর্জন করেন। পরে তিনি রিও ডি জেনিরিওর সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৮৬ সালে ভেজা নামের একটি ম্যাগাজিনে সামরিক বাহিনীর নিম্ন বেতন নিয়ে সমালোচনা করে প্রবন্ধ লিখে পরিচিতি পান। এ জন্য ১৫ দিন কারাবরণ করতে হয় তাকে।

ক্ষমতা গ্রহণ

১৯৮৮ সালে সামরিক বাহিনীতে ক্যাপ্টেন পদে ফিরে আসেন। ওই বছরই ক্রিসচিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্য রিও ডি জেনিরিওর সিটি কাউন্সিলে নির্বাচন করেন। ১৯৮৯ সালে কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বে বহাল থাকনে। ১৯৯১ সালে তিনি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে আরও ছয় মেয়াদের জন্য একই পদে পুনর্নির্বাচিত হয়ে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পলেন করেন। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তখন ব্রাজিলের রাজনীতিকে স্বচ্ছ করার ও আর্থিক খাতে সংস্কার আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। তবে নির্বাচনে তার জন্য জয় পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। তারপরই জোট গড়ে ক্ষমতায় বসেন বলসোনারো। তখন অভিষেক অনুষ্ঠানের আগেই বলসোনারো তার মন্ত্রিসভায় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে কিছু সামরিক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়ে সমালোচনার জন্ম দেন। যে সরকারে রয়েছে ধর্মপ্রচারক থেকে শুরু করে বন্দুক ব্যবসায়ী ও অন্য সব রক্ষণশীলরা। যারা ঐতিহ্যগত পারিবারিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার প্রেসিডেন্টের মেয়াদকালে আইন, শিক্ষা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (সেক্রেটারি অব গভর্নমেন্ট) ও ডাক বিভাগসরকারের সঙ্গে মতাদর্শগত দিক থেকে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। দেশের অর্থনৈতিক মন্দা চলার মধ্যেই মতবিরোধের জেরে ২০১৯ সালে সোশ্যাল লিবারেল পার্টির থেকে বেরিয়ে যান তিনি। এরপরই অ্যালায়েন্স ফর ব্রাজিল দল গঠন করেন।

রাজনৈতিক মতাদর্শ

কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘ ২৭ বছর কাজ করেছেন। এ সময় জাতীয় রাজনীতিতে রক্ষণশীল মতাদর্শের কারণে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি সমলিঙ্গের বিয়ে, সমকামিতা, গর্ভপাত, ইতিবাচক পদক্ষেপ, মাদকের সহজলভ্যতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেন। বৈদেশিক নীতিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়ান। বলসোনারো ২০১৮ সালের নির্বাচনে মুক্তবাজার অর্থনীতির পক্ষে প্রচারণা শুরু করেন। তার অতি রক্ষণশীল ও পপুলিস্ট মতামত ও মন্তব্যের জন্য ব্রাজিলজুড়ে তার প্রশংসা ও সমালোচনা দুই-ই রয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে বলসোনারোকে জাতীয়তাবাদী ও পপুলিস্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়। জীবনবাদী এই রাজনীতিককে একজন প্রতিষ্ঠানবিরোধী ও আগ্নেয়াস্ত্রপন্থি রাজনীতিবিদ বলা হয়। তবে নিজেকে তিনি উগ্র-ডান নীতির একজন সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেন। বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিরুদ্ধে সোচ্চার তিনি। এবারের নির্বাচনে বলসোনারোর সে্লাগান ছিল‘ঈশ^র, পরিবার, মাতৃভূমি ও স্বাধীনতা’। রক্ষণশীল এই রাজনীতিক যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার মধ্যে রয়েছেদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানির বেসরকারিকরণ, খনির জন্য আমাজন অঞ্চলকে আরও উন্মুক্ত করা ও আগ্নেয়াস্ত্র আইন সহজ করা।

ব্রাজিলের নির্বাচনের ইতিহাসে ২৪ বছর আগে একজন প্রার্থী প্রথম দফার নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। তবে এবারের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীই নিজেদের জয় পাওয়ার বিষয়ে আশা দিয়েছে সমর্থকদের।