অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করা বিদেশিদের নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায় বলেও অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
ওয়ার্কিং ভিসায় না এসেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এসব বিদেশি নাগরিকদের ভিসা ক্যাটাগরি পুনঃপরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ট্যাক্সেস লিগ্যাল অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট সদস্য মো. মাহমুদুর রহমান গত সপ্তাহে অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের অনেকেই বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং সরকার নিয়োজিত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগে অনুমতি নেওয়া ছাড়াই এ-৩ বিজনেস (বি), এ৩, ট্যুরিস্ট (টি), স্টুডেন্ট (এস) ও অন অ্যারাইভাল ভিসা (ভিওএ) নিয়ে কর্মরত রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই চার ক্যাটাগরির ভিসাতেই ৫১ শতাংশ বিদেশি বাংলাদেশে অবস্থান করছে। দেশে কর্মরত বিদেশিদের ৩০ শতাংশ হারে আয়কর নেওয়ার বিধান থাকলেও উল্লিখিত চার ক্যাটাগরির ভিসার কারণে সরকার বছরে ৪ হাজার ৫৪১ কোটি ৮৩ লাখ ২০ টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়।
চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলছে, রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নে সরকার চলমান উন্নয়ন কর্মকা-ের ধারা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে অব্যাহত রাখতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আয় আহরণের ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছে।
এনবিআর বলছে, রাজস্ব আহরণের অন্যতম উৎস হলো আয়কর। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয়কর আদায়ের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায়ে অর্থ বিভাগের সহযোগিতা চেয়েছে এনবিআর। প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্প বাস্তবায়নে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দেশে একটি ব্যবসা, শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে সংঘবদ্ধ বিদেশি নাগরিকদের একচেটিয়া ব্যবসা ও সিন্ডিকেট প্রক্রিয়া চালুর সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশিদের আইন অমান্য করার প্রবণতা বাড়ছে। চীনসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের অবৈধ অবস্থান, ভিসা নীতিমালা পরিপক্ষী’ কার্যক্রম এবং অবৈধভাবে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় বাংলাদেশিদের কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে এবং বেকার সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে অনভিপ্রেত পরিস্থিতি পরিহার করতে অর্থ মন্ত্রণালয়, অধীনস্থ দপ্তর এবং প্রকল্পসমূহে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ভিসা ক্যাটাগরি পুনঃপরীক্ষা ও কোনো বিদেশি নাগরিক ইতিমধ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিবন্ধিত না হয়ে থাকলে তাদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ধারা ১৬ (বি) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিডার প্রাক অনুমোদন ছাড়া অবৈধভাবে বিদেশি নাগরিকদের কাজে নিয়োজিত করলে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা প্রদেয় আয়করের ৫০ শতাংশ (যেটা বেশি) অতিরিক্ত আয়কর আরোপ করার বিধান রয়েছে। এছাড়া একই অধ্যাদেশের ধারা ১৬৫ (সি) মোতাবেক তিন বছর পর্যন্ত জেল এবং ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা আরোপেরও বিধান রয়েছে।
অবৈধভাবে কাজ করা এসব বিদেশির কারণে সরকারের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। এদের অনেকেই মাদক চোরাচালান, জনবিধ্বংসী সরঞ্জাম, অস্ত্র, গোলাবারুদ দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করাচ্ছে। একইসঙ্গে মানব পাচারের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।
গত ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ২১২ দেশের ২ লাখ ১২ হাজার ৬৭ জন নাগরিক অবস্থান করছে, যা ২০২১ সালের তুলনায় চারগুণ বেশি। এসব বিদেশির যথাযথ শ্রেণির ভিসা না দেওয়ায় গমনাগমনের তৎপরতা বিগত বছরগুলোর তুলনায় বেড়েছে। বিদেশি নাগরিকরা বাংলাদেশে কী কাজ করছে তা নিরীক্ষণের আওতায় আনা দুরূহ হওয়ায় তাদের অবৈধ অবস্থান দেশের অর্থনীতিকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করছে। বর্তমানে দেশে অবস্থানকারী বিদেশি অবৈধ নাগরিকের সংখ্যা ৯৭ হাজার ৬৯৫ জন।