শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। আর সঠিক শিক্ষাদানের মাধ্যমে শিক্ষকরা মানুষের ভেতর সত্যিকারের মানুষ সৃজন করেন। তাই শিক্ষককে বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু এ শিক্ষকরা দিন দিন সম্মানের দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়ছেন। সম্প্রতি তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতাও দেখা দিয়েছে। অনেক শিক্ষক শিকার হয়েছেন নির্যাতনের।
এ অবস্থায় আজ বুধবার পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২২’। ইউনেস্কো এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, ‘শিক্ষার রূপান্তর শুরু হয় শিক্ষকদের মাধ্যমে’। সারা বিশ্বে সরকারি উদ্যোগে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হলেও বাংলাদেশে সরকারিভাবে পালন হয় না। তবে বাংলাদেশ জাতীয় ইউনেস্কো কমিশন, কিছু শিক্ষক সংগঠন ও কিছু বেসরকারি সংস্থা নানা আয়োজনে দিবসটি পালন করছে।
জানতে চাইলে প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা শিক্ষানুরাগী তারা আগে যেভাবে সম্মান পেতেন, এখন সেটা হারিয়ে গেছে। আসলে মূল্যবোধের অবক্ষয়ই এর মূল কারণ। এ ছাড়া এর পেছনে কিছু শিক্ষকও দায়ী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু শিক্ষক আদর্শচ্যুত হয়েছেন। তাদের জন্য পুরো শিক্ষক সমাজের প্রতিই শ্রদ্ধা কমে গেছে। শিক্ষকদের সম্মান দিতে সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। তাদের সুযোগ-সুবিধাও মর্যাদার জায়গায় নিয়ে আসতে হবে।’
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ছিল মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের ঘটনা। গত ২০ মার্চ দশম শ্রেণির একটি অনির্ধারিত ক্লাসে গিয়ে বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। এর সূত্র ধরেই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করা ও ধর্মীয় গ্রন্থের অবমাননার অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। ১৯ দিন কারাভোগের পর জামিন পান তিনি। আবার স্কুলে যোগদান করলেও এখনো আতঙ্কের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন, দেওয়া হচ্ছে হুমকিধমকিও।
গত ২৫ জুন দুপুরে আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকায় হাজি ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে ক্রিকেটের স্টাম্প দিয়ে পেটায় একই প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষার্থী। পরে শিক্ষককে উদ্ধার করে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। গত ১৮ জুন শিক্ষক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়। এর জেরেই গুজব ছড়িয়ে পুলিশের উপস্থিতিতেই কলেজের তখনকার গলায় পরানো হয় জুতার মালা।
ব্রিটেনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চের ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, চীনের ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্বাস করে, শিক্ষকদের সম্মান করতে হবে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে এ গড় মাত্র ৩৫ শতাংশ। বিশেষ করে চীন, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, ভারত, নিউজিল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা অনেক ওপরে। আন্তর্জাতিকভাবে যেসব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হয়, সেখানে এসব দেশের ছাত্রছাত্রীরাই সবচেয়ে ভালো করছে। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, মর্যাদা আছে বলে ভালো শিক্ষক পাওয়া এবং ধরে রাখাও সহজ হয় এসব দেশে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মান ও মর্যাদা শব্দ দুটো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মর্যাদা বেশি থাকলে মানসম্পন্নরা সেই পেশায় আসেন। কিন্তু আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষকরা এখনো তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। মাধ্যমিকের শিক্ষকরা তাদের বেতনভাতা নিয়ে মোটেই সন্তুষ্ট নয়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হলে এখন দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, আর্থিক লেনদেনই এক নম্বর যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে মেধাবীদের পছন্দের তালিকায় নেই শিক্ষকতা পেশা।
জানতে চাইলে স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের (স্বাশিপ) সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষকদের মর্যাদা এখন উপেক্ষিত। তারা নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছেন। অথচ বঙ্গবন্ধু ঠিকই শিক্ষকদের মর্যাদা দিয়ে গেছেন। তার পথ অনুসরণ করলে শিক্ষকদের মর্যাদাহানি হওয়ার কথা নয়।’
শিক্ষক নেতা শাহজাহান আলম সাজু বলেন, ‘এখনো অনেক শিক্ষক নন-এমপিও। তারা যদি বেতনই না পান, তাদের পেটে যদি ভাতই না থাকে, তাহলে তারা কীভাবে শিক্ষা দেবেন? আর শিক্ষকদের দুরবস্থা দেখে মেধাবীরা আর এ পেশায় আসছেন না। মেধাবীরা না এলে শিক্ষার মানের উন্নয়ন হবে না। এ ব্যাপারগুলো চিন্তা করে সরকারকে করণীয় ঠিক করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো করতে হবে।’
জানা যায়, আমাদের দেশের শিক্ষকতা পেশা মোটেই আকর্ষণীয় নয়। এমনকি বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি গত ১২ বছরেও। এ ছাড়া অন্যান্য ক্যাডারের চেয়ে পদোন্নতি ও মর্যাদায় পিছিয়ে আছেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যরা। প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্রসহ অন্যান্য ক্যাডার কর্মকর্তার চাকরিজীবনে প্রথম গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ তৃতীয় গ্রেডে যেতে পারেন। বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসেই যেখানে শিক্ষকরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন সেখানে মাধ্যমিক, প্রাথমিক ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবস্থা আরও খারাপ।