পোশাক খাতে রপ্তানির ক্ষেত্রে ম্যান-মেইড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক তৈরিতে ১০ শতাংশ প্রণোদনা দাবি করেছে বিজিএমইএ। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর প্রস্তুতির লক্ষ্যে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এ নীতিগত প্রণোদনা দেওয়ার আহ্বান জানায় তারা।
বিজিএমইএ বলছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিশ্ববাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ বিশে্বর দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘ম্যান-মেইড ফাইবার ফর মুভিং আপ দ্য ভ্যালুচেইন অব আরএমজি ইন দ্য কনটেস্ট অব এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব দাবি করেন ব্যবসায়ী নেতারা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ও বিজিএমইএর যৌথ আয়োজনের এ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সচিব শরিফা খান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নূর মোহাম্মদ মেজবাউল হক এবং বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান।
সভায় বিজিএমইএ জানায়, উত্তরণের পর বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে এলডিসি হিসেবে প্রাপ্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, যেমন প্রেফারেন্সিয়াল রুলস অব অরিজিন ও শুল্কমুক্ত কোটামুক্ত বাণিজ্য-সুবিধা হারাবে। বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে তৈরি পোশাকশিল্পের বিশাল অবদানের প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে তৈরি পোশাকশিল্পেই।
যে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাকের বাজারে কটন বা প্রাকৃতিক তন্তুর বদলে কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের চাহিদা উত্তরোত্তরভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত তৈরি পোশাকের সিংহভাগই হচ্ছে কটন বা প্রাকৃতিক তন্তুভিত্তিক। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কটনের বদলে কৃত্রিম তন্তুর দিকে ক্রমশ ঝুঁকতে পারলে তা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা বৃদ্ধিতে ও বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে রুলস অব অরিজিনের কঠোরতর মানদ- পূরণে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক পণ্য অধিকতর সহায়তা করবে বলে ধারণা করা হয়ে থাকে।
বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুতির লক্ষ্যে তৈরি পোশাক খাতের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এ ছাড়া তিনি সংশ্লিষ্ট আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও লজিস্টিক খাতে আরও উন্নতির ওপর জোরারোপ করেন।
ম্যান-মেইড ফাইবারে ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি এখানে দেওয়ার কেউ নই। এটা নিয়ে আলোচনা হবে। এই নগদ প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি সবার সঙ্গে বসে এনবিআর ঠিক করবে। আমি এটার পক্ষে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মতে ইনসেনটিভের বাজার ফেয়ার হওয়া উচিত। কেউ পাচ্ছে না কিংবা কেউ বেশি পেয়ে গেল, এটা হওয়া উচিত নয়। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে ইনসেনটিভ ইকোনমিতে বিশ^াসী নই। তবে আমার সরকার যেটা সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা অবশ্যই আমি প্রতিপালন করব। সরকার বহু বছর যাবৎ এখানে-ওখানে ইনসেনটিভ দিয়ে আসছে। এটা একটা অন্তর্নিহিত ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এর কায়েমি স্বার্থ আছে। ব্যবসা শেষ হয়ে গেছে। তারপরও ইনসেনটিভ রয়ে গেছে এমনও মাঝে মাঝে শুনি।’
গত সেপ্টেম্বরে পণ্য রপ্তানি ৭ শতাংশ কমার বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, রপ্তানি কমার বিষয়টাতে আমিও একটা ধাক্কা খেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আগামী মাসের মধ্যেই এটা ঘুরে আসবে।’
তবে একটা আশঙ্কার বিষয় উল্লেখ করে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হচ্ছে এই যে এই কৃত্রিম তন্তুর বাজারে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। অতি তাড়াতাড়ি আমরা এখানে যদি ট্রানজেকশনের ব্যবস্থা না করি, তাহলে আমাদের যে এখন একটা অ্যাডভান্টেজ আছে কটনে, সেটা হয়তো টিকবে না। সুতরাং আলোচনা হচ্ছে কীভাবে ট্রানজিট করা যায়।
তিনি বলেন, তবে এই ট্রানজিশনে অত বেশি টাকা লাগবে না। বর্তমানে যেসব যন্ত্র দিয়ে কটন তৈরি করা হয় বা কাপড় তৈরি করা হয়, সেখানে আরও কিছু ইনভেস্ট করলেই কৃত্রিম তন্তুতে যাওয়া যাবে।
এলডিসি-পরবর্তী জটিলতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এলডিসি-পরবর্তী বেশি জটিলতা হলো, আমাদের এই মুহূর্তে বাজারে সমস্যা। এলডিসি-পরবর্তী সবাই যে সুবিধা পাবে, আমরাও সেটা পাব। এখন যেটা হচ্ছে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কী করবে না করবে, সেটা আমরা বুঝতে পারছি না। এ সব বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে কীভাবে এটাকে পাশ কাটিয়ে এগানো যায়।’
ইআরডি সচিব শরিফা খান বলেন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকপণ্যের অবস্থান আরও শক্তিশালীকরণের জন্য প্রাকৃতিক তন্তুর তৈরি পোশাকের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ম্যান-মেইড ফাইবারভিত্তিক পোশাকের বাজারের সম্ভাবনাকে অধিকতরভাবে কাজে লাগাতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নূর মো. মাহবুবুল হক টেক্সটাইল খাতে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের ওপর জোর দেন।