বড় সংখ্যার গণিতটাই বড় নয়, আসলটা হচ্ছে যোগফলটা নির্ভুল কি না। বলা হলো এ কারণে যে, স্বাধীনতা-উত্তর ঢাকা শহরে অসংখ্য বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারি বাণিজ্য পুঁজির হাত ধরে জন্ম নিয়েছে। চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় তো বটেই, প্রযুক্তি মহাবিদ্যালয় ও হোটেল ম্যানেজমেন্টের মতো সেবামূলক উচ্চতর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও উচ্চশিক্ষা কেন্দ্রের ‘জাতে ওঠার’ চেষ্টায় রত। অন্যদিকে উপনিবেশ যুগের অন্তিম পর্বে শিক্ষা-সুযোগ বঞ্চিত কৃষিনির্ভর পূর্ববঙ্গীয় ‘বাঙাল’ রক্তে সামন্তবাদী জীবনচর্চার বাইরে আধুনিকতার হিমোগ্লোবিন বয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ তকমা দেনেওয়ালাদের উদ্দেশ্য যে খুব মহৎ ছিল তা বলা যাবে না। সরকারি অর্থের সঙ্গে নবাব-জমিদার-ব্যবসায়ীদের দানে গড়ে ওঠা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অখণ্ড দু-এক দশক শিক্ষার্থী হিসেবে ধারণ করেছিল পূর্ববঙ্গের শহর, উপশহর এবং কৃষ্টিভিত্তিক গ্রামের হিন্দু-মুসলমান অভিজাত শ্রেণির সন্তানদের। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির বদল ঘটে। শিক্ষার্থীদের বড় অংশটিই হয়ে ওঠে গ্রামের শিক্ষাবঞ্চিত কৃষক পরিবারের। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণবাদ অর্থাৎ উচ্চবর্গীয় হিন্দু শিক্ষক ও ছাত্রদের যে দাপট টিকে ছিল দীর্ঘদিন, এই অভিশাপমুক্ত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চিরদিনই।
হিন্দু-মুসলমান শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ছাত্রাবাস থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে হিন্দু উচ্চবর্গীয় ছাত্রদের অত্যাচারে তিতিবিরক্ত হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নমশূদ্র সম্প্রদায়ের মতো পৃথক ছাত্রাবাস তৈরির দাবি তোলার প্রয়োজন। তৎকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে বর্ণবাদের শিকার হয়েছিলেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। অপমানের কারণেই নিজের নামের বানান বদলে ‘মেঘনাথ’-এর বদলে ‘মেঘনাদ’ অর্থাৎ মেঘের গর্জন রেখেছিলেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এর সাক্ষী ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল শুধু মুসলিম সমাজে শিক্ষা বিস্তার নয়, উচ্চতর দর্শন সৃষ্টি। উচ্চতর মানবিক দর্শন, আধুনিকতা, বিজ্ঞান-মনস্কতা, আধুনিক অর্থনীতি, কল্পিত নয়, বাস্তব ইতিহাসচর্চা। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্ররাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণ শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন রাষ্ট্রের দাপুটে আমলা হওয়ার লোভ পরিহার করে। এসব কারণেই আজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মানুষ পূর্ববঙ্গের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক নবজাগরণের ধাত্রীভূমি হিসেবে সালাম জানায়। অথচ এই মহান বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে ঘিরে আজ কী হচ্ছে?
সাতচল্লিশের বাংলা ভাগের সময় ঢাকা ছিল খুবই ছোট একটি শহর। তার চারপাশ ঘিরে ছিল না ছিন্নমূল মানুষে ঠাসা বস্তি। দরিদ্র মানুষের বস্তিতে ঢাকা ঘেরাও হতে থাকে দেশ ভাগের পর। এর আগে অল্প আয়ের দরিদ্রদের বসবাস মূল শহরের সীমানা কাঠামোর ভেতর ছিল। শ্রেণির ভাগাভাগি থাকলেও এত স্পষ্ট ছিল না। নগর ঢাকার শ্রেণি ভাগাভাগিটা বেআব্রু হয়ে ওঠে একাত্তরের স্বাধীনতা-উত্তর। সারা বাংলায় যুদ্ধের ধ্বংসলীলা আর চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ কর্মহীন ক্ষুধার্ত মানুষকে বাধ্য করে বাস্তুভিটা ফেলে রাজধানী শহরে ছুটে আসতে। আর ঠিক তখনই নাগরিকের শ্রেণি-পরিচয়টা ব্যাপক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাঙালির একাংশের ধনী হওয়ার প্রবণতা নীতিহীন প্রতিযোগিতা শ্রেণি-বদলকে উসকে দেয়। রাখঢাক নয়, ঝলমল করে ওঠে দরিদ্রের ঢাকা শহর, ধনীর শহর, মধ্যবিত্তের শহর ও ছিন্নমূলের শহর। দ্রুত ঢাকার জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। নানা পেশার শ্রমজীবীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে রূপান্তরিত ঢাকায় বৃদ্ধি পায় ধনী আর উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে দরিদ্রের সংখ্যা।
উন্নত বিশ্ব ইউরোপ-আমেরিকা তো বটেই, এশিয়ার ধনী দেশগুলোতেও দারিদ্র্য আছে, দরিদ্র আছে, কিন্তু বোঝা যায় না। লজ্জাটা নানা কৌশলে ঢাকা থাকে। ঢাকার লজ্জা কিন্তু আড়াল থাকে না। আড়ালের রাজনীতিটা জানা নেই নগর ঢাকার। কেননা অনন্ত সমস্যা তার। ঢাকার ভূতলে পানীয় জল নেই। শুষে নিয়েছে নগর তৃষ্ণা। সেই কবে ভূভাগের ওপরে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ মরণদশায় চলে গেছে। নগর তৃষ্ণার ড্রাগনের মতো দীর্ঘ জিহ্বা পৌঁছে গেছে পদ্মায়। পদ্মাকে শুধু ইলিশ জোগালেই হয় না, তৃষ্ণাও মেটাতে হয়। নগর ঢাকার সেসবে ভ্রুক্ষেপ নেই। পূর্বপাশের জলাভূমি গিলে নদী শীতলক্ষ্যাকে জাপটে ধরে পূর্বতীরের ফসল ভূমি ডিঙিয়ে ছুটছে আরও আগে। পদ্মা নদীটা শীতলক্ষার মতো ছোট নয় বলে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। দখলদারির দায়িত্ব পেয়েছে এবার পদ্মা সেতু। মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুরে গিলবে ঢাকা শহর। মেট্রোরেল বা পাতাল রেল নগরীর নিজের বুক খুঁড়ে পাতালে যেতে পারছে না বলে মাথার ওপরে উঠে আকাশ দখল নিচ্ছে। মেট্রোরেল বাঙালির মাথার ওপর দিয়ে ছুটবে, আর কী চাই উন্নয়ন বাঙালির?
ঐতিহাসিক কারণেই ইংরেজরা ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির আদলে গড়ে তুলেছিল কলকাতাকে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে কিছু বাঙালিকে সঙ্গী করে ইংরেজরা ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিচর্চা শুরু করে কলকাতায়। সেই সংস্কৃতির ভেতর লুকিয়েছিল আধিপত্যবাদ, আনুগত্য আর শাসকের প্রতি মুগ্ধতা। সঙ্গে ছিল তাদের শিল্প-সাহিত্য, ঐতিহ্য, সংগীত, কলাবিদ্যা, বিজ্ঞান ইত্যাদির প্রতি মুগ্ধতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হলে অনিবার্য হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক আর উত্তর-ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব। সেই দ্বান্দ্বিক বাস্তবতা যত তীব্র ছিল নগর কলকাতায়, ততটা ছিল না ঢাকায়। স্বাধীন পূর্ববঙ্গবাসীর নগর ঢাকা তখন গঠন-পুনর্গঠনে ব্যস্ত। মুসলিম লীগের ভাঙন, আওয়ামী মুসলিম লীগের উদ্ভব, পূর্ববঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের বিপর্যয়, কমিউনিস্ট পার্টির নিষিদ্ধকরণ ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বেরই ফল। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, এর সবকিছুরই ধাত্রীভূমি ছিল নবাবি বাংলা আর কোম্পানি বাংলার এই ঢাকা শহর।
সাতচল্লিশের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে থেকেই পূর্ববঙ্গের বাঙালির রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক রাজধানী হয়ে ওঠে নগর ঢাকা। এ ক্ষেত্রে সংকট ছিল সংস্কৃতির। প্রশ্নগুলো ছিল বাঙালি নাকি মুসলমান? ‘বাঙালি’ সংস্কৃতিটা কত পার্সেন্ট মুসলিম আর কত পার্সেন্ট হিন্দু? নির্মম সত্য এই যে, একাত্তরের শ্রদ্ধাটাও এর মীমাংসা ষোলোআনা করতে পারল না। পারার কথাও নয়। জাতীয়তাবাদ এর মীমাংসা করতে পারে না। পারে একমাত্র সমাজতন্ত্র। বাঙালিরা অনেক কিছুই করেছে। ভাষার জন্য লড়াই করেছে, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছে, যা অসমাপ্ত রেখেছে তা পাশ কেটে গেছে তার নাম সাংস্কৃতিক আন্দোলন। সাংস্কৃতিক বিপ্লব তো দূর-অস্ত।
একাত্তরের চেতনা-স্নাত এবং দর্শনজাত বাঙালি আজ নগর ঢাকায় দুর্লভ হয়ে যাচ্ছে। বিবর্তনবাদে প্রজাতি বিলুপ্তের দশা যেন। কয়েকজন ক্ষমতালোভী সেনানায়ক আর ক্ষুদ্র স্বার্থান্বেষী মহলের সামরিক অভ্যুত্থান কি লড়াকু জাতির সব অর্জন ধ্বংস করে দিতে পারে? পারে না তো! অথচ পঁচাত্তরে পারল। কেন পারল? পারল, কেননা সাংস্কৃতিক চর্চাবর্জিত কোনো জাতীয়তাবাদই টেকসই হয় না। ক্ষণভঙ্গুর হতে বাধ্য। বাঙালি জাতীয়তাবাদে শুধু ছিল রাজনীতি। ছিল না শক্ত ভিতের সাংস্কৃতিক শক্তি। রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক খুঁটিগুলো দাঁড়িয়ে থাকে যে সংস্কৃতির পোক্ত ভিতের ওপর তা না থাকলে সামান্য চাপেই পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের হিসাব দরকার। দেখতে হবে কীভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে একাত্তরের বাঙালিত্ব। শূন্যস্থান পূর্ণ করছে যুদ্ধের ভেতর দিয়ে পরিত্যাগ করা বা বর্জন করা বর্জ্যপদার্থ। মৌলবাদ।
রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক দর্শন নড়বড়ে হয়ে যায় যদি সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র গড়ে না ওঠে। অন্যদিকে চর্চার কেন্দ্রগুলোর দুয়ার বন্ধ করে দিলে একসময় অন্ধকার ঘরটা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে ইঁদুর-উই পোকার দাপটে। যেমনটা ঘটেছিল সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার পতনের আগেই। সংস্কৃতি শুধু তো নাচ-গান-যাত্রাপালা চর্চা বা উপভোগ করা নয়, মূল চর্চাটা হচ্ছে মৌলবিজ্ঞানচর্চা, বস্তুবাদী দর্শনচর্চা। জ্ঞানচর্চার সর্বক্ষেত্রে নিত্যনতুন জিজ্ঞাসা ও উত্তরের জন্য গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা একটি আধুনিক নগরের লক্ষণ। ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় শহরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমনি গবেষণা কেন্দ্র আছে। ওসবেই তৈরি হয় নোবেল বিজয়ীদের। সংস্কৃতি ক্ষেত্রের নানা অভিনতুন তত্ত্বও সৃষ্টি হয় তাতে। একটি নগর সেই কেন্দ্রগুলোকে লালন-পালন করে। অন্যদিকে নগর ঢাকা? দেখেশুনে মনে হচ্ছে পুরো ঢাকা শহরটাকেই দখল করে আছেন রাজনীতি আর রাজনীতিবিদরা। গলি, রাজপথ যেখানেই চোখ যায় শুধু রাজনৈতিক দলের ছোট-বড় ক্লাব-অফিস, নেতা-পাতি নেতা। দেয়ালগুলো ভরে আছে ভুল বানানে লেখা রাজনৈতিক সেøাগান। অন্যদিকে ইউরোপ-আমেরিকার শহরে হেঁটে হেঁটে কালঘাম ছুটে যাবে রাজনৈতিক দলের কার্যালয় খুঁজে পেতে।
ইউরোপের নগরগুলোকে কেন্দ্র করে যেমনি মধ্যযুগ, তেমনি আধুনিক যুগেও বিশ্বসভ্যতার চিন্তা ও মতবাদের উদ্ভব ঘটেছে। আশ্চর্য এটাও যে পৌরাণিক এবং ঐতিহাসিক ধর্মীয় অবতারদের জন্মও নগরে। আসলে নগরকেন্দ্রিক সমাজ ও জীবনসভ্যতার বিকাশের অন্যতম উচ্চস্তর। শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে বিজ্ঞান মনস্কতার চর্চা, সমাজচিন্তার নানা রকম মতবাদের উদ্ভব ঘটে নগর জীবনকে কেন্দ্র করে। বাস্তব সত্য হচ্ছে বাঙালির কাছে শিল্পবিপ্লবের কনসেপ্টটাই অনার্জিত এবং অজানা। স্বাধীন বাঙালির নব নব গবেষণার নগরী হয়ে উঠল না। ঢাকা শুধু শাসকশ্রেণির বসবাসের নগরী, লুটেরা নব্য ধনীদের ভোগবাদের নগরী হয়েই রইল। প্রাচীন এথেন্স কিংবা আধুনিক লন্ডন এবং আরও অনেক নগরীর দূরবর্তী এক নগরের নাম ঢাকা। বাঙালিকে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক যুগ ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছিল বিদ্যাসাগর, রামমোহন, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জগদীশ বসু, সত্যেন বসু, কাজী আবদুল ওদুদের মতো মহান ব্যক্তিদের পেতে। বিশ্ব যেমনি অপেক্ষা করেছিল সক্রেটিস, মার্কস, লেনিন, নিউটন, আইনস্টাইন, শেক্সপিয়ারকে পেতে। কোথায় বসে? নিশ্চয়ই কোনো না কোনো নগর ঠিকানায়। বাঙালিরাও কি নগর ঢাকায় বসে এমনি কারও অপেক্ষায় আছে? কে বা কারা এবং কত দিন?
লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক