অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতা অর্জন ব্যতিরেকে স্বাধীনতা যে নির্মল নয় একুশ শতকের এই প্রারম্ভিক পর্যায়ে তা বেশি করে অনুভূত হচ্ছে। এরই মধ্যে এ কথা বহুল উচ্চারিত হয়ে আছে যে একুশ শতকে অর্থনৈতিক উন্নয়নই হবে তাবৎ রাষ্ট্র ও জাতির শ্রেষ্ঠত্বের ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম নিয়ামক। আর সে কারণে অন্যান্য অনুষঙ্গের চেয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রসঙ্গকে এগিয়ে আনা হচ্ছে উন্নয়ন কৌশলের সব পরিকল্পনাপত্রে। অর্থনৈতিক মুক্তিকে গণতন্ত্রায়ণের অন্যতম উপলক্ষ ও উপায় হিসেবে বিবেচনার দাবি সোচ্চার হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এখনো নিরলস প্রচেষ্টা ও আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্ব সংস্কৃতি ও সভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটেছিল এশিয়ায়। সামরিক শক্তিমত্তার পাশাপাশি দর্শন ও বিজ্ঞানচর্চার অবদান সেখানে ছিল। পরে এশীয় সমৃদ্ধি ও জ্ঞানবিজ্ঞান অধ্যয়ন অনুধাবনের প্রসার ঘটে ইউরোপে। একে অবলম্বন করেই ইউরোপে শিল্পবিপ্লব সংঘটিত হয় এবং বিশ্বনেতৃত্ব ইউরোপের হাতে চলে যায়। এরপর ইউরোপীয় শিল্পবিপ্লবের ঢেউ আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকার উপকূলে আছড়ে পড়ে। বিগত শতাব্দীতেই আমেরিকা শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে প্রযুক্তির উৎকর্ষ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক শক্তিতে উন্নীত হয়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক তথা বিশ্ব রাজনৈতিক পরাশক্তির পরিচিতিতে পৌঁছে দেয়। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান-উত্তর পরিবেশে এখন তার শক্তিশালী অবস্থান মূলত অর্থনৈতিক শক্তিমত্তার স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতার ওপরই নির্ভর করছে। জাপানসহ পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে গত চার দশকে অর্জিত অর্থনৈতিক সাফল্যও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে একুশ শতকে এশিয়া আবার ফিরে পেতে পারে তার গৌরব। ইনফরমেশন টেকনোলজির উৎকর্ষই হবে অর্থনৈতিক সাফল্যের সোপান, যা নিয়ন্ত্রণ করবে বিশ্ব রাজনীতিকে।
এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতা জীবনযাত্রার মান ও মূল্যবোধকে এমন একটি প্রত্যয় প্রদান করে, যা অন্য সব অনুষঙ্গ অনুশাসনে বা সুনীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়। ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষেত্রে যে কথা সে কথা রাষ্ট্র বা দেশের ক্ষেত্রেও। সাম্প্রতিককালে বিশ্বে যতগুলো জাতীয় স্বাধীনতা বা মুক্তিসংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে সেগুলোর মূল প্রেরণায় ছিল অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার আকাক্সক্ষা, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতা তথা স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের বলয় থেকে রাষ্ট্রীয় সৌভাগ্য ও সুযোগকে সবার আয়ত্তে বা অধিকারে আনা। অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের নিশ্চয়তা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য সুবিধা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ, উন্নত অবকাঠামো এবং মানবাধিকারসহ সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের বিষয়গুলোকে রাষ্ট্রের কাছ থেকে শুধু দাবিই করা হচ্ছে না বরং এসবের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির সূচকই এখন সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের প্রতি জনসমর্থন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের পরিচায়ক।
মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রসার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে অধিকতর উদারীকরণের লক্ষ্যে দেশে দেশে অর্থনৈতিক সংস্কারের যে কর্মসূচি গৃহীত হচ্ছে তার অভীষ্টই হচ্ছে রাষ্ট্রীয় তথা বৈশ্বিক সম্পদ ও সুযোগে সবার অবারিত অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা। স্বচ্ছতা ও সুশাসনের তাগিদ এসব সংস্কার ব্যবস্থাপত্রে প্রকৃতপক্ষে আমজনতার ক্ষমতায়নের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদিত। বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কাক্সিক্ষত এ সংস্কার ক্রমান্বয়ে আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের অন্যান্য রীতি পদ্ধতির (যেমন ইমিগ্রেশন, ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইট ইত্যাদি) ওপর প্রভাব ফেলবে এ কথা বলাই বাহুল্য। পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে কিছুকাল আগে থেকে পরিলক্ষিত অর্থনৈতিক বিপর্যয় এই দেশগুলোর নেতৃত্বকে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশকে যেভাবে স্পর্শ করেছে তাতে এটা স্পষ্টতর হচ্ছে যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সুশাসন, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত না হলে সেখানে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি টেকসই হতে পারবে না।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ভাবনাকে করপোরেট সংস্কৃতি সম্ভাবনার বলয়ে নিয়ে যাওয়ার যে চিন্তা-চেতনা তা মানুষের মধ্যে পরস্পর প্রযুক্ততার বোধ-বুদ্ধি ও উপলব্ধিরই বহিঃপ্রকাশ, তা তো সবাইকে এক ছাতার তলায় শামিলকরণের ধারণার ও প্রয়াসেরই প্রতিবিম্ব। ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশানের উদ্দেশ্য তো তাই। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সবার অন্তর্ভুক্তির প্রয়াস ভেলকিবাজি প্রতীয়মান হবে যদি রাজনৈতিক সামাজিকভাবে পক্ষপাতিত্বের, জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের লক্ষ্যে বিচ্যুতিকরণের (এক্সক্লুশান বা আইসোলেট) প্রথা ক্রিয়াশীল থাকে। দেশের সার্বিক উন্নয়ন স্বার্থচিন্তা যদি বিদেশি স্বার্থের প্রতিভূ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে জাতীয় উন্নয়ন প্রয়াসে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হবে না। বিদেশি শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা অর্থবহ হবে না যদি নিজের স্বনির্ভরতা বা স্বয়ম্ভরতা অর্জনের আকাক্সক্ষা ভিন্ন অর্থনীতির স্বার্থরক্ষার বেদীমূলে নিবেদিত হয়। একটি শুদ্ধ সংগীত সৃষ্টিতে সুরকার, গায়ক, গীতিকার ও বাদ্যযন্ত্রীর সমন্বিত প্রয়াস যেমন অপরিহার্য, তেমনি দেশ বা সংসারের সামষ্টিক অর্থনীতির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সব পক্ষের সহযোগিতা ছাড়া সুচারুরূপে সম্পাদন সম্ভব নয়। আধুনিক শিল্প ও বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার বেলায়ও এমনকি যেকোনো উৎপাদন ও উন্নয়ন উদ্যোগেও ভূমি, শ্রম ও পুঁজি ছাড়াও মালিক-শ্রমিক সব পক্ষের সমন্বিত ও পরিশীলিত প্রয়াস প্রচেষ্টাই সব সাফল্যের চাবিকাঠি। মানবসম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রমের দ্বারা দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়াও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়াসকে সুসমন্বয়ের আবশ্যকতা অপরিহার্য হয়ে উঠছে। স্থান-কাল-পাত্রের পর্যায় ও অবস্থানভেদে উন্নয়ন ও উৎপাদনে সবাইকে একাত্মবোধের মূল্যবোধে উজ্জীবিত করাও সামগ্রিক সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার একটা অন্যতম উপায় ও উপলক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একটি কল্যাণ অর্থনীতিতে সব পক্ষকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন এবং সব প্রয়াস প্রচেষ্টায় সমন্বয়ের মাধ্যমে সার্বিক উদ্দেশ্য অর্জনের অভিপ্রায়ে অয়োময় প্রত্যয়দীপ্ত হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টির আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। একজন কর্মচারীর পারিতোষিক তার সম্পাদিত কাজের পরিমাণ বা পারদর্শিতা অনুযায়ী না হয়ে কিংবা কাজের সফলতা ব্যর্থতার দায়-দায়িত্ব বিবেচনায় না এনে যদি দিতে হয় অর্থাৎ কাজ না করেও সে যদি বেতন পেতে পারে, কিংবা তাকে বেতন দেওয়া হয় তাহলে দক্ষতা অর্জনের প্রত্যাশা আর দায়িত্ববোধের বিকাশ ভাবনা মাঠে মারা যাবেই। এ ধরনের ব্যর্থতা ভারী হতে থাকলেই যেকোনো উৎপাদনব্যবস্থা কিংবা উন্নয়ন প্রয়াস ভর্তুকির পরাশ্রয়ে যেতে বাধ্য। দারিদ্র্য প্রপীড়িত জনবহুল কোনো দেশে পাবলিক সেক্টর বেকার ও অকর্মণ্যদের জন্য যদি অভয়ারণ্য কিংবা কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রতিভূ হিসেবে কাজ করে তাহলে সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। বিপুল জনগোষ্ঠীকে উপযুক্ত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে যদি জনশক্তিতে পরিণত করা না হয়, তাহলে উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় বড় বিনিয়োগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। চাকরিকে সোনার হরিণ বানানোর কারণে সে চাকরি পাওয়া এবং রাখার জন্য অস্বাভাবিক দেনদরবার চলাই স্বাভাবিক। দায়-দায়িত্বহীন ব্যক্তির চাকরি পাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকার ফলে নিজ উদ্যোগে স্বনির্ভর হওয়ার আগ্রহতেও অনীহা চলে আসে। মানবসম্পদ অপচয়ের চেয়ে বড় নজির আর হতে পারে না। দরিদ্রতম পরিবেশে যেখানে শ্রেণিনির্বিশেষে সবার কঠোর পরিশ্রম, কৃচ্ছ্রসাধন ও আত্মত্যাগ আবশ্যক, সেখানে সহজে ও বিনা ক্লেশে কীভাবে অর্থ উপার্জন সম্ভব সেদিকেই ঝোঁক বেশি হওয়াটা সুস্থতার লক্ষণ নয়। ট্রেড ইউনিয়ন নির্বাচনে প্রার্থীর পরিচিতিকরণে যে অঢেল অর্থব্যয় চলে তা যেন এমন এক বিনিয়োগ, যা অবৈধভাবে অধিক উশুলের সুযোগ আছে বলেই। শোষক আর পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় বঞ্চিত নিপীড়িত শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ উদ্ধারে নিবেদিত চিত্ত হওয়ার বদলে ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্ব নিজেরাই উৎপাদনবিমুখ আর শ্রমিক স্বার্থের পরিবর্তে আত্মস্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে দেখা যায় তারা যাদের প্রতিনিধিত্ব করছে তাদেরই তারা প্রথম ও প্রধান প্রতিপক্ষ। প্রচণ্ড স্ববিরোধী এই পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে উৎপাদন, উন্নয়ন তথা শ্রমিক উন্নয়ন সবই বালখিল্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
সমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ ভাবনা ব্যক্তিবন্দনা, চর্চা, স্বার্থ ও শর্তের বেড়াজালে আটকে গেলে তা বুমেরাং হয়ে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনীতিতে সরবরাহ চাহিদায় বণ্টন-বৈষম্য যেমন সুষম সম্পদ সৃষ্টির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যেভাবে সমন্বিত উৎপাদন অভীপ্সায় বিভ্রান্তি বিসংবাদ উপস্থিত করে। ওভারটেক করার প্রবণতা যেমন যাত্রাপথে বিশৃঙ্খলা উপহার দেয়, তেমনি পরমতসহিষ্ণুতার অভাব সুশীল ও সুষম আচরণকে নির্বাসনে পাঠাতে পারে। গণতন্ত্রের জন্য যা কোনো অবস্থাতেই পুষ্টিকর পরিস্থিতি নয়। একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে কারও কারও অতি ধনী হওয়ার সুযোগ সেই অর্থনীতিতে বৈষম্য বৃদ্ধির অশনিসংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে। দশটি কাজের সাতটি ভালো, তিনটি মন্দ হতে পারে। ভালোকে ভালো বলে স্বীকৃতি, মন্দকে মন্দ বলে তিরস্কারের নীতিগত অবস্থানে যেকোনো আপস আত্মঘাতের নামান্তর। মন্দকে লুকিয়ে শুধু ভালোর বন্দনা এবং ভালোকে ছাপিয়ে একতরফাভাবে মন্দকে সামনে আনা সুস্থতার লক্ষণ নয় কোনো পরিবেশেই। তিরস্কার পুরস্কারে পক্ষপাতিত্ব কিংবা অন্ধত্ব অবলম্বন অর্থনৈতিক উন্নয়নেও যেমন, সমাজ সুসংগঠনের বেলায়ও সমান দুঃসংবাদবাহী।
লেখক: কলামিস্ট, উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান
mazid.muhammad@gmail.com