মহিষ বাঁচাতে নিরাপদ কেল্লার দাবি

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৬ এএম

জুলাইয়ে অতি জোয়ারে ভোলার দৌলতখানের নেয়ামতপুর চরে মুহূর্তের মধ্যে পানিতে তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে থাকে রাখাল ও খামারিরা। কিন্তু ততক্ষণে স্রোতে ভেসে যায় একের পর এক মহিষ। কয়েক দিন পর বেশিরভাগ মহিষের সন্ধান মিললেও কয়েকটি আর ফিরে আসেনি। এ চিত্র এখন শুধু একটি চরের নয়, বরং ভোলার অধিকাংশ চরাঞ্চলের। নিরাপদ ও টেকসই কেল্লার অভাবে প্রতিটি বড় জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতির মুখে পড়ছে জেলার অন্যতম সম্ভাবনাময় প্রাণিসম্পদ খাত।

দুর্যোগপ্রবণ ভোলার চরাঞ্চলে মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও মহিষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব প্রতি বছরই নতুন করে সামনে আনছে একটি প্রশ্ন অর্থনীতি, ঐতিহ্য ও হাজারো খামারির জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই খাত সুরক্ষায় টেকসই উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ভোলা সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, লালমোহন, তজুমদ্দিন, চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলার ৮৫টি চরাঞ্চলে ৩ হাজার ২৫০ জন খামারির ১৭৮টি বাথানে প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার মহিষ রয়েছে। এর মধ্যে ৯২ হাজার গাভী ও ৩২ হাজার বলদ মহিষ। প্রতিদিন এসব মহিষ থেকে ৮ থেকে ১০ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদিত হয়। জেলার ঐতিহ্যবাহী মহিষের দুধের কাঁচা টক দই ইতিমধ্যে জিআই স্বীকৃতিও পেয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় খাত এখনো দুর্যোগের কাছে অসহায়।

২০২৪ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রেমালের সময় টানা তিন দিনের জলোচ্ছ্বাসে ভোলার চরাঞ্চলের ৯ হাজার ৯৩১টি মহিষ ভেসে যায়। পরে অধিকাংশ মহিষ উদ্ধার হলেও ২৬৯টির মৃত্যু হয়। এতে প্রায় ৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। একই দুর্যোগে ৬ হাজার ৬৫৯টি গরুও ভেসে যায়। পরে ১৭৬টি গরুর মৃত্যু হয়। যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা।

চলতি বছরের জুলাই মাসেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। অতি জোয়ারে জেলার বিভিন্ন চর থেকে ৫৪৭টি মহিষ ভেসে যায়। শুধু দৌলতখান উপজেলার নেয়ামতপুর চর থেকেই ১৮ জন বাথানির ১০০টি মহিষ স্রোতে হারিয়ে যায়। পরে ৯৫টির সন্ধান মিললেও পাঁচটি আর পাওয়া যায়নি। গোখাদ্যসহ ওই এলাকার ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

দৌলতখানের নেয়ামতপুর চরে প্রায় তিন যুগ ধরে মহিষ পালন করছেন মো. জাকির হোসেন বাবুল। তার খামারে শতাধিক মহিষ রয়েছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক অতি জোয়ারে সাতটি মহিষ ভেসে যায়। পরে তিনটি পাওয়া গেলেও চারটির আর কোনো খোঁজ মেলেনি। প্রায় ৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সরকারিভাবে নিরাপদ কেল্লা না থাকায় পানির মধ্যেই মহিষ রাখতে হয়। নিজেদের উদ্যোগে তৈরি মাটির কেল্লাও বড় জলোচ্ছ্বাসে টিকে না।

ভোলা সদর উপজেলার খামারি আবু কাশেম জানান, গত তিন দশকে তার বাথান থেকে ৩০টি মহিষ জলোচ্ছ্বাসে হারিয়ে গেছে। তিনি বলেন, বারবার ক্ষতির মুখে পড়ে এবার নিজের অর্থে প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি উঁচু কেল্লা নির্মাণ করছেন। কিন্তু সব খামারির পক্ষে এমন ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়।

আরেক বাথানি বেলায়েত হোসেন বলেন, ১৫ বছরে অন্তত ১২টি মহিষ হারিয়েছেন তিনি। সামান্য জোয়ারেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মিত কেল্লা ডুবে যায়। সিরাজ মুন্সি জানান, ঘূর্ণিঝড় রেমালে তার তিনটি মহিষ ভেসে যায়, পরে আর খুঁজে পাননি। আবহাওয়ার সতর্কবার্তা শুনলেই এখন তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা থাকে বাথানে থাকা মহিষ নিয়ে। এদের মতো ফারুক বেপারী, নাজিম হাওলাদার, খোকন, নজির হাওলাদারসহ ভোলার অসংখ্য বাথানি একই সংকটের মুখোমুখি।

বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহাবুদ্দিন ফরাজি বলেন, বাথানিরা নিজেদের উদ্যোগে যে কেল্লা তৈরি করেন, তা বড় জলোচ্ছ্বাসে টিকে না। ফলে মহিষ, গরু ও ছাগল ভেসে গিয়ে তারা প্রতি বছর বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শিকার হন। তাদের জন্য সরকারি টেকসই কেল্লা নির্মাণ এবং বীমা সুবিধা চালু করা প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতে জিআই স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মহিষের দুধের দইয়ের ঐতিহ্যও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মানুষের জন্য চরাঞ্চলে ২২টি মুজিব কিল্লা থাকলেও গবাদি পশুর জন্য সরকারি কোনো নিরাপদ কেল্লা নেই। বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত মাত্র চারটি কেল্লা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। জেলার সব চরাঞ্চলে অন্তত ২৫০টি টেকসই কেল্লা নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে।

ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম খান বলেন, টেকসই কেল্লা ও মিঠাপানির উৎস নিশ্চিত করা গেলে মহিষের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমে আসবে। জনবল সংকট ও সরকারি বরাদ্দ না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, মহিষের জন্য কেল্লা নির্মাণ অবকাঠামোগত ও প্রকল্পনির্ভর বিষয়। এটি রাষ্ট্রীয় নীতিমালার সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। তবে দুর্গম চরাঞ্চলের অনেক স্থানে জমির মালিকানা জটিলতাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে তিনি খামারিদের দুর্যোগের সময় আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত