করোনা মহামারী, শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, পাকিস্তানের ভয়াবহ বন্যা ও বিশ্ব অর্থনীতি পরিস্থিতি টালমাটাল। এ কারণে দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক অর্থনীতি রয়েছে হুমকির মুখে। খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে এ অঞ্চলে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি হবে ৯ দশমিক ২ শতাংশ।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। গতকাল বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় সংস্থাটি।
দক্ষিণ এশিয়ার সর্বশেষ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বিশ্বব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্বব্যাংক বছরে দুইবার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে থাকে। এবারের পর্যালোচনায় আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় চলছে। এ প্রবৃদ্ধির স্থিতিস্থাপকতা আরও বাড়াতে হবে।
‘কোপিং উইথ শকস: মাইগ্রেশন অ্যান্ড দ্য রোড টু রেজিলিয়েন্স’ শিরোনামের ওই পর্যালোচনায় বলা হয়, এ বছর দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি জুনে করা পূর্বাভাসের চেয়ে ১ শতাংশ কমে ৫ দশমিক ৮ শতাংশে নামতে পারে। করোনার পর অধিকাংশ দেশ অর্থনীতির সঙ্গে যুদ্ধ করে, ফলে ২০২১ সালে এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশে।
বিশ্বব্যাংকের এ পূর্ভাবাসে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৬ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। অবশ্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এটি বেড়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশে উঠতে পারে। এ অঞ্চলে সবচেয়ে খারাপ জিডিপিতে আছে শ্রীলঙ্কা। ঋণাত্মক ৯ দশমিক ২ শতাংশে আছে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন। ২০২৩ অর্থবছরে তা একটু ভালো হয়ে ঋণাত্মক ৪ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
শুধু আফগানিস্তান ছাড়া সব দেশেরই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের এ অর্থবছরের জিডিপি ৬ শতাংশ থেকে নেমে ২ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ভুটান ৪ দশমিক ১ ও নেপাল ৫ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে ভারতে। চলতি অর্থবছরে দেশটির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে আছে। এটি আগামী অর্থবছরে ৭ শতাংশে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এ অঞ্চলের অধিকাংশ দেশ অর্থনীতির বেহালদশা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, যদিও কয়েকটি দেশ তুলনামূলক ভালো করছে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ ভারতের সেবা খাত ও রপ্তানি আয় খুব শক্তিশালী রয়েছে। অথচ একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে টানাপড়েনে আছে অধিকাংশ দেশ। অন্যদিকে মালদ্বীপ ও নেপালে পর্যটন খাত আবার চাঙ্গা হওয়ায় এই দুই দেশে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
করোনা অতিমারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ খুব বাজেভাবে নাড়া দিয়েছে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকে। দেশটিকে অতিমাত্রায় ঋণ নিতে হয়েছে, তলানিতে ঠেকেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। এ বছর দেশটির আসল দেশজ উৎপাদন ৯ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়াবে। ২০২৩ সালে এটি দাঁড়াতে পারে ৪ দশমিক ২ শতাংশে। এ ছাড়া পাকিস্তানে দ্রব্যম্যূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমেই কমছে। এরপরই এ বছরের বন্যায় দেশটির ৩ ভাগের এক ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রেইজার বলেন, করোনা মহামারী, বিশ্বব্যাপী তারল্য সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ অঞ্চল বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এই তিন কারণকেও শক্তভাবে মোকাবিলা করে গত দুই বছর সফল হয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। এখন এখানে এগুলোর নতুন পরীক্ষা চলছে।
বিশ্বব্যাংক জানায়, বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও জ¦ালানি সংকটের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমাগত ভর্তুকি দেওয়ার পরও জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। এ অঞ্চলের অধিকাংশ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে থাকেন। করোনার সময় এ শ্রমিকরা ভয়াবহ সংকটে পড়েছিলেন। শ্রমিক রপ্তানি ২০২১-এর তুলনায় ২০২২০এর শুরুতে কিছুটা বেড়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ হ্যানস টিমার বলেন, এ অঞ্চলের শ্রমিকদের আরও উৎপাদনশীল ও গতিশীল করা প্রয়োজন অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে। দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির জন্য এ অঞ্চলের শ্রমিকদের যেসব বাধা-বিপত্তি আছে সেগুলোর সমাধান করা জরুরি।
এই লক্ষ্যে, প্রতিবেদনে দুটি সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথমত, অভিবাসীদের যে খরচের সম্মুখীন হতে হয় তা কমানো নীতি এজেন্ডা বেশি হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, নীতিনির্ধারকরা আরও নমনীয় ভিসা নীতি, কঠিন পরিস্থিতির সময় অভিবাসী কর্মীদের সহায়তা করার ব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন উপায়ে অভিবাসনকে ঝুঁকিমুক্ত করতে পারেন।