দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকেন বলে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তৃণমূলের জনপ্রতিনিধি বলা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৃণমূলের এই জনপ্রতিনিধিরা বারবার আলোচনা-সমালোচনায় আসছেন একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে। একইভাবে স্থানীয় সরকারের নানা পর্যায়ে পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে মারধর, বলপ্রয়োগ, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র রাখা, মাদকের কারবারে যুক্ত থাকাসহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এই বাস্তবতা এক দিনে তৈরি হয়নি। বলাবাহুল্য, দেশব্যাপী রাজনীতিতে যে দুর্বৃত্তায়ন চলছে তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য তা থেকে বিচ্ছিন্ন তো নয়ই, বরং তারই অনিবার্য পরিণতি। ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য এবং পেশিশক্তির আস্ফালন থেকেও সেটা স্পষ্ট।
কিন্তু কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার ২নং মানিকাচর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান জাকির হোসেনের প্রতারণা স্থানীয় পর্যায়ের অনিয়ম-দুর্নীতি ছাপিয়ে দুর্বৃত্তপনার সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। শুক্রবার দেশ রূপান্তরে ‘এক গাড়ি ৩৭ জনের কাছে বিক্রি ইউপি চেয়ারম্যানের’ শিরোনামের প্রতিবেদনে গাড়ি ব্যবসার নামে জাকির হোসেনের প্রতারণার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া ওই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রতারণার মাধ্যমে ৬০-৭০টি গাড়ি দেখিয়ে ৬০০-৭০০ জনের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। এ ছাড়া একটি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেখিয়ে ৩৭ জনের কাছে স্ট্যাম্প করে বিক্রি করেছেন। প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যে আরও ২০টি মাইক্রোবাস উদ্ধার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার তেজগাঁও বিভাগ। বৃহস্পতিবার ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, গত ৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মুগদা থানায় জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে একটি প্রতারণার মামলা হয়। মামলাটি গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগ ছায়া তদন্ত শুরু করে। তদন্তকালে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত জাকির চেয়ারম্যান পোর্ট থেকে স্বল্প দামে গাড়ি ক্রয় করে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে টাকা নেন। পরে ক্রয়কৃত গাড়ি রেন্ট-এ-কারের মাধ্যমে মাসিক ভাড়ায় পরিচালনার জন্য চুক্তি করেন। তিনি একই গাড়ির বিপরীতে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে ভুয়া কাগজপত্রে চুক্তি সম্পাদন করেন। তা ছাড়া একই রেজিস্ট্রেশন নম্বর সংবলিত গাড়ি একাধিক ব্যক্তির কাছে জাল দলিলের মাধ্যমে বিক্রি করে দেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধু ইঞ্জিন নম্বর ও চেসিস নম্বর দিয়ে গাড়ি বিক্রির চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করেন। গাড়িটি নিজেই ভাড়া নিয়ে মাসিক ভাড়া পরিশোধের ভিত্তিতে পরিচালনা করার কথা বলে কিছুদিন ভাড়া পরিশোধ করেন। পরে ভাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেন ও গাড়ি ক্রয়ের অর্থ আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া আগেই বিক্রি করা গাড়ি স্বল্প মূল্যে মালিকানা হস্তান্তরের লোভ দেখিয়েও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন। তিনি আনুমানিক হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন। জাকির হোসেনের প্রতিষ্ঠান আর. কে. মোটরস এবং তার আত্মীয়স্বজনের নামে ২৭টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তার নামে বিভিন্ন থানায় ১২টি প্রতারণার মামলাও রয়েছে।
একজন জনপ্রতিনিধির এমন প্রতারকের মুখচ্ছবি নিঃসন্দেহে পুরো জাতির জন্যই লজ্জার। কিন্তু সংগত কারণেই তৃণমূলের এই জনপ্রতিনিধির প্রতারণার প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি এবং জাতীয় সংসদের জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও উঠতে পারে। একথা বলার সুযোগ নেই যে, কেবল তৃণমূলের কিছু জনপ্রতিনিধিই এমন প্রতারণা কিংবা অনিয়ম-জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন সময়ে আমরা সংবাদমাধ্যমেই জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ দেখছি। ভুলে যাওয়া উচিত হবে না, জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত রাজনীতিকরা দেশসেবার শপথ গ্রহণকারী। যেমন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে জনগণের সেবায় সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য আমলারা অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু কালের অভিজ্ঞতায় জনগণের কাছে দুই পক্ষেরই নতুনতর বাস্তব পরিচিতি হয়েছে নিজ নিজ স্বভাবগুণে। সাধারণ মানুষ জানে, রাজনীতিকদের প্রতিশ্রুতি সর্বদাই ভবিষ্যৎকালবাচক, ফলে তারা এটাও জানেন যে, সুদূর ভবিষ্যতের কোনো আশা অদূর ভবিষ্যতে করে লাভ নেই। অন্যদিকে, আমলাদের কর্মনীতি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ‘লালফিতার দৌরাত্ম্য’ কিংবা ‘উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি’ কথাগুলো প্রবাদে পরিণত হয়েছে। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রথাগত অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি এখন আর কেবল স্থানীয় সরকারের পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং সামাজিক সুরক্ষা খাতসহ কেন্দ্রীয় সরকার গৃহীত নানা সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনপ্রতিনিধি সে স্থানীয় কিংবা জাতীয় যে পর্যায়েরই হোক জনগণের কাছে তার জবাবদিহি থাকা বাধ্যতামূলক। একইভাবে আমলারাও তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া এই জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতায় যেকোনো অনিয়ম-দুর্নীতি-প্রতারণার জন্য অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আমরা চাইব না দেশের মানুষ জনপ্রতিনিধিদের এমন জনবিরোধী মুখচ্ছবি দেখুক।