দলনিরপেক্ষ হয়ে কাজ করতে হবে : সিইসি

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের নিরপেক্ষ থেকে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেছেন, দলনিরপেক্ষ হয়ে কাজ করতে হবে। এমন কাজ করা যাবে না, যাতে জনগণ মনে করে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছেন। নির্বাচন কমিশন এবার শক্ত অবস্থানে থাকবে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে জেলা পরিষদ নির্বাচন উপলক্ষে দেশের ৬১ জেলার ডিসি ও পুলিশ সুপারদের সঙ্গে সভায় তিনি এ কথা বলেন।

জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রশাসনের উদ্দেশে সিইসি বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বলেছি, গণকর্মচারী হিসেবে আপনাদের সরকার এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। আপনারা নিজেরদের কখনো দলীয় কর্মী ভাববেন না। আপনাদের আচরণে এমন কিছু যাতে প্রতিফলিত না হয়, যাতে জনগণ মনে করতে পারে আপনারা পক্ষপাতদুষ্ট। আপনারা নিরপেক্ষ নন। আপনাদের অবশ্য দলনিরপেক্ষ হয়ে কাজ করতে হবে।

সিইসি বলেন, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপাররা জনগণের খুব কাছাকাছি থাকেন। আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার এবং দল এমনভাবে মিশে থাকেÑএকটা থেকে আরেকটা আলাদা করা বেশ কষ্টসাধ্য। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে হয়তোবা প্রভাব চলে আসতে পারে। তারপরও আমরা দেখেছি, আমাদের পুলিশ কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা চেষ্টা করেন নিরপেক্ষ হয়ে কাজ করতে। কোনো ক্ষেত্রে যদি ব্যত্যয় হয়ে থাকে, আমরা বলেছি আপনাদের কাজে কোনো শৈথিল্য থাকবে না। নির্বাচন কমিশন কিন্তু এবার শক্ত অবস্থানে থাকবে। আপনাদের আচরণবিধি মেনে এবং আপনাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব গণকর্মচারী হিসেবে বা সরকারি কর্মচারী হিসেবে পালন করতে হবে।

ইভিএমের বিষয়ে তিনি বলেন, এ মেশিন নিয়ে অনেকে পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, এ বিষয়ে অনেক এডুকেশন প্রয়োজন। দূরদূরান্তে অনেকে কিন্তু টেকনোলজি ভয় পান। অনেকেই এতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। অনেকে পরামর্শ দিয়েছেন, আমরা যদি এই যন্ত্র ব্যবহার করি তাহলে ব্যাপক ক্যাম্পেইন ও ভোটার এডুকেশনের প্রয়োজন হবে। আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে তাদের বক্তব্য গ্রহণ করেছি। আমরা বলেছি, ভোটার এডুকেশনের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালাব।

তবে নির্বাচন বিষয়ে যে অনাস্থা উঠে এসেছে, সেটা আমি স্পষ্ট করে বলেছি। নির্বাচন কমিশন পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থানের কারণে বিভাজন রয়েছে। আমরা আশা করি, রাজনৈতিক নেতারা তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি-প্রজ্ঞা দিয়ে এ সমস্যার সমাধান করবেন। এগুলো কখনই নির্বাচন কমিশনের কাজ না। আমরা চাই একটি অবাধ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক। আমরা আশা করি, আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হোক। প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না।

আপনারা পুলিশকে নিরপেক্ষ থেকে কাজ করতে বলেছেন, তাদের ওপর কোনো রাজনৈতিক চাপ আছে কি নাÑজানতে চাইলে সিইসি বলেন, সেটা তারা বলেননি, ওই ধরনের চাপ তাদের নেই। সেটা তারা খোলাখুলি বলেননি। কিন্তু তারাও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন যে, তারা নিরপেক্ষ আচরণ করবেন। আমরা যেহেতু কমিশন আমরাও সেটা পর্যবেক্ষণ করতে থাকব, বলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় কাউকে যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে হয়রানি করা না হয়, সেটা বলা হয়েছে। আজকেই কিন্তু শেষ সভা নয়, আমাদের আরও অনেক সভা হবে। নির্বাচনের এখনো ১ বছর ২ মাস বাকি আছে। আমরা একটু আগেই শুরু করেছি। তাদের আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। আগামী নির্বাচনে যেন জনগণের আস্থাভাজন হয়ে থাকে, সেটা নিরপেক্ষ হয় এবং অংশগ্রহণমূলক হয়।  

নির্বাচনে পেশি শক্তি, কালোটাকার ব্যবহার ও গুজবের বিষয়ে কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে ইসি। নির্বাচন কমিশনার মো. আহসান হাবিব বলেন, কেউ কেউ নির্বাচনের সময় পেশিশক্তি, অর্থশক্তি বা ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করে। কালোটাকার ব্যবহারের কথাও শোনা যায়। আপনারা চোখ-কান খোলা রেখে এই বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করবেন।

তিনি বলেন, অনেকে এ সময় বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব বা অপপ্রচার ছড়ায়। মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করে বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করে। আপনারা এ বিষয়ে সতর্ক থাকবেন। কোনো গুজবের সন্ধান পেলে বা এরকম পরিস্থিতি তৈরি হলে আপনারা দ্রুত গুজবকারীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেবেন।

রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা যেন অযথা হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়ে সজাগ থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে আগে থেকেই ফৌজদারি বা ক্রিমিনাল মামলা থাকলে তা ভিন্নভাবে আদালতে স্বাভাবিক গতিতে চলবে। অযথা নেতাকর্মীরা যেন হয়রানি না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে স্বচ্ছ মনোভাব দেখাতে হবে। নির্বাচনে প্রার্থী বা নেতাকর্মীদের মধ্যে যেন কোনো ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি না হয়।

নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবিব বলেন, নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নীতিমালা অনুসরণ করে খবর সংগ্রহের জন্য গণমাধ্যমকর্মীরা দেশব্যাপী কর্মরত থাকেন। তারা নির্বাচনী এলাকার এবং বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের সংবাদ সংগ্রহ করে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার করেন। তাদের কাজে যেন বাধা সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে নিশ্চিত করবেন। নির্বাচন হবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে, সেটিই গণমাধ্যমকর্মীরা তুলে ধরবে সারা দেশের মানুষের কাছে। মনে রাখতে হবে গণমাধ্যমকর্মীরা তাদের কাজে অযৌক্তিক বাধাপ্রাপ্ত হলে বিভিন্ন মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে। বিষয়টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করবেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আখতার হোসেন বলেন, জেলা পরিষদ ও সংসদ নির্বাচনসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভবিষ্যতে যে নির্বাচনগুলো হয় তা শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের বিষয়ে আলাপ হয়েছে। ডিসি-এসপিরা পরামর্শ দিয়েছেন। তারা তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।

ভোটকেন্দ্র না বাড়িয়ে বুথ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে সিইসি বলেন, গত নির্বাচনে ৪০ হাজারের মতো ভোটকেন্দ্র ছিল, আগামী নির্বাচনে এ সংখ্যা বেড়ে ৪৩ হাজারের উপরে হয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের যে সংখ্যা তাতে পর্যাপ্তসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা যায় না। এজন্য আমরা চাচ্ছি ভোট ভেন্যুর সংখ্যা কমিয়ে বুথ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। এখন যেহেতু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, কাজেই ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পক্ষে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন সম্ভবপর হবে।