ইসির আস্থা অর্জনের সুযোগ

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নির্বাচনী লড়াই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি ক্রমাগত কলুষিত হয়েছে। তবে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও যে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে সেখান থেকে পিছিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। এখন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রশ্ন হলো এই কমিশন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারবে কি না? বর্তমান ইসির অধীনে কয়েকটি উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচন নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। এতে কমিশনের গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কারও কারও বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।

এই বাস্তবতায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের নিরপেক্ষ থেকে কাজ করার নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, এমন কাজ করা যাবে না, যাতে জনগণ মনে করে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছেন। গত রবিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জেলা পরিষদ নির্বাচন উপলক্ষে দেশের ৬১ জেলার ডিসি ও পুলিশ সুপারদের সঙ্গে সভায় নির্বাচন কমিশন এবার শক্ত অবস্থানে থাকার কথা জানিয়েছে। জাতীয় সংসদসহ যেকোনো নির্বাচনেই নিরপেক্ষ না থেকে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ। তারা বলেছে, স্থানীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা মাঝেমধ্যে বাধার সৃষ্টি করেন। তাদের কারণে প্রায়ই সমস্যা হয়। এখানে নির্বাচন কমিশনকে আরও কঠোর হতে হবে। নতুন ইসির অধীনে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। অথচ কমিশন যথেষ্ট কঠোর হতে পারেনি। এমনিতেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবগুলো রাজনৈতিক দলকে ভোটের মাঠে আনতে পারাসহ দেশবাসীর কাছে আস্থা অর্জনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে বর্তমান ইসি। এ পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু ভোটের জন্য স্থানীয় নির্বাচনে পুলিশসহ প্রশাসনকে সঠিকভাবে পরিচালনা ও প্রার্থীদের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে কঠোর অবস্থান নিয়ে ইসি নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের পাশাপাশি সবার আস্থা অর্জনের সুযোগ নিতে পারে।

খেয়াল করা দরকার বর্তমান নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী নির্বাচনের সময় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কমিশনের অধীনে কাজ করবেন। তারা ইসির আদেশ শুনতে বাধ্য। কিন্তু সেই আদেশ কেউ না শুনলে কী হবে, সে বিষয়ে আইনে কিছুই বলা হয়নি। স্মরণ করা যেতে পারে, টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার গত এক দশকের মধ্যেই ২০১২ সালে এবং ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে দুটি নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিল। কিন্তু দুই কমিশনের বিরুদ্ধেই অনিয়ম ও ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, আশার কথা হলো নতুন নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের প্রায় কারোর যোগ্যতা নিয়ে বড় কোনো প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়নি। তবে, সাংবিধানিক এই কমিশনের সদস্যরা কতটা মেরুদ- সোজা রেখে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন সেটাই দেখার বিষয়। অবশ্য এটাও ঠিক যে, কমিশন যত আন্তরিকই হোক না কেন ক্ষমতাসীন সরকার এবং প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে মুখ্য হয়ে উঠতে দেখা যায়। অতীতের এই বাস্তবতা বদলাতে হলে ক্ষমতাসীন দলকেও রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রমাণ রাখতে হবে।

নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে সেটা নির্ভর করে প্রথমত, নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক কি না। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন অবাধ হচ্ছে কি না, অর্থাৎ মানুষ ভোট দিতে পারছে কি না। তৃতীয়ত, নির্বাচনটি জালিয়াতিমুক্ত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলো কি না। সাবেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছিলেন, বিশ্বমানের নির্বাচন করতে হলে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্বাচনকালে নির্বাচন কমিশনের অধীন ন্যস্ত করতে হবে এবং পুলিশের কার্যক্রম কঠোরভাবে মনিটর ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একইসঙ্গে তিনি স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য জেলা প্রশাসকদের পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। উল্লেখ্য, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে মতবিনিময়ে পেশাজীবীদের পক্ষ থেকেও একই দাবি উঠেছিল। সরকারের বা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত নির্বাচন করতে এসব দাবির যৌক্তিকতা আছে। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সারা দেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কয়েক লাখ পুরনো মামলা নতুন করে চাঙ্গা করার পদক্ষেপ নিচ্ছে পুলিশ। সরকার যদি এখন নির্বাচনী লড়াইয়ের মাঠে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দমনে এমন হামলা-মামলার আশ্রয় নেয় তবে তা নিঃসন্দেহে নির্বাচীন মাঠে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধার সৃষ্টি করবে। এই পরিস্থিতিতে এটা স্পষ্ট যে, নির্বাচন কেবল অংশগ্রহণমূলক হলেই হবে না সেখানে ভোটাধিকার প্রয়োগের নিশ্চয়তা, ক্ষমতাসীন দলের বা সরকারের প্রভাবমুক্ত পরিবেশে সব দলের জন্য সমান সুযোগ ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করাটাও সমান জরুরি।