মানুষের বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান এ তিনটিকে মৌলিক চাহিদা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রায় প্রতিটি দেশের সংবিধানে। মানুষের বাসযোগ্য ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করাসহ সবার মধ্যে এ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ বিশ্ব বসতি দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পরে ১৯৮৬ সাল থেকে প্রতি বছরের অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্ব বসতি দিবস উদযাপিত হয়ে আসছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘভুক্ত ১৯৫টি দেশ দিবসটি উদযাপন করে। কেনিয়ার নাইরোবিতে উদযাপিত হওয়া প্রথম বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল Shelter is my Right বা আশ্রয় আমার অধিকার। ২০২২ সালে তুরস্কের বালিকেসি শহরে অনুষ্ঠিত বসতি দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো সবার জন্য পর্যাপ্ত বাসস্থান নিশ্চিত করা। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে Mind the Gap. Leave No One and No Place Behind। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, বর্তমান বিশ্বে জীবনযাপনের ক্রমবর্ধমান অসমতা এবং শহর ও গ্রামে মানুষের বসবাসের স্থাপনা নির্মাণের সমস্যাগুলোকে গুরুত্বেও সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
ইউএন হ্যাবিট্যাটের মতে, বিশ্বে ২০২০ সালে ১২৪ মিলিয়ন ও ২০২১ সালে ১৬৩ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। করোনাভাইরাসের প্রকোপ শেষ না হতেই এ সংকটকে আরও তীব্র করেছে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ খাদ্য ও নিরাপদ বাসস্থানপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষক ও শহরের বস্তিতে বাস করা মানুষগুলো এ অনিশ্চয়তার বড় ভুক্তভোগী অথচ জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১৭টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের মধ্যে সদস্য দেশগুলোর দারিদ্র্য দূরীকরণ, বৈষম্য ও অসমতা হ্রাস, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতা করার কথা বলা হয়েছে। আরও নির্দিষ্টভাবে এসডিজির ১১ নম্বর লক্ষ্যে টেকসই নগর ও জনপদ শিরোনামে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, অভিঘাতসহনশীল এবং টেকসই নগর ও জনবসতি গড়ে তোলা’র কথা বলা হয়েছে।
নিরাপদ শহরকে শিল্প ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উন্নত জীবন ও ভালো ভবিষ্যতের আশায় গ্রামীণ জনপদ থেকে মানুষ শহরে পাড়ি জমায়। ফলে শহরের জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয় আবাসন চাহিদা। পরিকল্পিত নগরায়ণ নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরির মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখে। অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ জনসংখ্যার চাপে জীবনকে করে দুর্বিষহ। উচ্চজনসংখ্যার চাপ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কুফল ভোগ করছে এশিয়া, আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো।
পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো সেখানে বসবাস করা মানুষগুলোর জীবনব্যবস্থাকে আরও বেশি ভঙ্গুর করে তুলেছে। এজন্য আগামীর বাসযোগ্য সুন্দর পৃথিবী গড়তে কাউকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে এ পর্যন্ত যত পরিবেশগত সমস্যার উদ্ভব হয়েছে তার জন্য পরিবেশের ওপর মানুষের হস্তক্ষেপকে দায়ী করা হয়। গবেষণা সংস্থা ফ্রন্টিয়ারের এক গবেষণা মতে, মানুষ পৃথিবীর বাস্তুসংস্থানের ৯৭ শতাংশ এলাকায় নিজ প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করেছে। যার ফলে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে কমপক্ষে ৭৫০০ প্রজাতির প্রাণী সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে গেছে এবং যে ৩ শতাংশ এলাকায় মানুষ যায়নি সে স্থানটি বরফ আচ্ছাদিত অবস্থায় আছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ।
বিশ্বে চলমান দখলদারিত্ব, সংঘাত, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অস্থিরতার কারণে বর্তমানে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ আরও অনেক মানুষকে নিজ বাসস্থান ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করবে বলে জাতিসংঘ এরই মধ্যে সতর্ক করেছে। ২০২১ সালে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছিল মাত্র ৮.৯ কোটি। এ তালিকায় বাংলাদেশের নাম ওঠার কারণ মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা। তাদের বাসস্থান থেকে জোর করে উৎখাত করা হয়েছে মিয়ানমার থেকে। বনবিভাগের হিসাবে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কারণে কয়েক হাজার একর বন ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রতি বছরে ২২ হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। এভাবে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে ক্যাম্পের ভেতরের অবস্থা আরও খারাপ আকার ধারণ করবে বলে ইউনিসেফ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা শুধু কাজের খোঁজে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকায় এলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন আবাসন বাড়ছে না। ধারণা করা হয়, শুধু ঢাকায় ভাসমান লোকের সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে ভাসমান অনেক মানুষকে দেখা যায় ফুটপাত, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনাল কিংবা রেলস্টেশনে রাত্রিযাপন করতে। ২০১৪ সালের বস্তিশুমারি অনুযায়ী, দেশে বস্তিবাসীর সংখ্যা ২২ লাখ ৩২ হাজার ১১৪ জন। তথ্য মতে, সারা দেশে বস্তির সংখ্যা ১৩,৯৪৩টি এবং ৫১ শতাংশ লোক কাজের সন্ধানে এসে বস্তিতেই থাকে। বস্তিগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি, ঘরগুলো চাপাচাপি করে বানানো এবং একটি কক্ষে অধিক লোক বাস করে। দেখা যায়, বস্তিগুলো সাধারণত সরকারি, আধাসরকারি, ব্যক্তিমালিকানাধীন খালি জমিতে, পরিত্যক্ত বাড়ি বা ভবন, সড়ক বা রেললাইনের পাশে গড়ে তোলা হয়। সরু প্রবেশপথ, অসংখ্য অলিগলি, অন্ধকার খুপরি, নোংরা গোসলখানা ও টয়লেটে বসবাসের অনুপযোগী এসব স্থানে মানুষ থাকছে গাদাগাদি করে। ১৯৯৭ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে সরকারি হিসাবেই বস্তির সংখ্যা ছয় গুণ বেড়েছে।
তিন পার্বত্য জেলা, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে পাহাড় ধসে প্রতি বছর প্রাণ হারায় অনেক মানুষ। তা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে বাস করছে কয়েক হাজার বাসিন্দা। নির্বিচারে গাছ ও পাহাড় কাটার ফলে অল্প বৃষ্টিতেই ধসে পড়ছে পাহাড়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব নাগরিকের জন্য অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান মৌলিক অধিকার হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ভাসমান ও ভূমিহীন জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করার জন্য সরকারিভাবে বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ভূমিসহ ঘর বিতরণ। জলবায়ু উদ্বাস্তু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, তৃতীয় লিঙ্গ, ভিক্ষুক, বেদে, দলিত, হরিজনসহ সমাজের পিছিয়ে পড়া অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের জন্যও জমিসহ ঘর দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত শুধু আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যারাক, ফ্ল্যাট, বিভিন্ন ধরনের ঘর ও মুজিববর্ষের একক গৃহে ৫ লাখ ৭ হাজার ২৪৪টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ‘শেখ হাসিনা মডেল’ হিসেবেখ্যাত দারিদ্র্যবিমোচন প্রক্রিয়ার এ আশ্রয়ণ প্রকল্প বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। সবার জন্য আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ ছিল। মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩টি পরিবারকে জমিসহ সেমিপাকা একক ঘর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নোয়াখালীর ভাসানচরে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের আবাসন ও দ্বীপের নিরাপত্তার জন্য ‘আশ্রয়ণ-৩’ প্রকল্পের আওতায় আবাসনের ব্যবস্থা করেছে সরকার।
১৯৯০ দশকের তুলনায় বিশ্বে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে হলে আমাদের পরিবেশ সহায়ক নীতি গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো নির্মাণে বেশি জোর দিলে জলবায়ু-সংক্রান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার কামানো সম্ভব। বিশ্ব পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে স্থাপনা নির্মাণ-সংক্রান্ত কয়েকটি সুপারিশ প্রণয়ন করেছে। ভবনগুলোকে তাপপ্রতিরোধী করে তৈরি করা এর মধ্যে অন্যতম, যাতে ভবনের কক্ষগুলোকে ঠা-া রাখতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ও অর্থ খরচ করতে না হয়। এজন্য স্থাপনার চারদিকে গাছপালা বা ছাদে বাগান করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। উপকূলীয় অঞ্চলের ঘরবাড়িগুলোকে উঁচু ও শক্তিশালী ভিত্তি দিয়ে তৈরি এবং বরফপ্রধান অঞ্চলে ইগলু আকৃতির ঘর নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছে ইউএনইপি। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ অর্থাৎ ৪.১৩ বিলিয়ন মানুষ শহরে বাস করে, ফলে আবাসন চাহিদা পূরণে প্রতি বছর ৯৬ হাজার নতুন বড় স্থাপনা তৈরি করতে হয়। আবার ২০৫০ সাল নাগাদ আরও ৩ বিলিয়ন শহরবাসীর জন্য টেকসই ও নিরাপদ বাসস্থান সংকুলান করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশ যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজনে বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, তেমনি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার বাসস্থানের জোগান দিতেও চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাসস্থানের অধিকার পূরণে ২০১৭ সালে প্রণীত জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত সামগ্রিক কার্যক্রম গ্রাম, ইউনিয়ন ও উপজেলায় বিস্তৃত করা প্রয়োজন। সুপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বসতি বিন্যাসই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুন্দর ও নিরাপদ পৃথিবী উপহার দিতে।
লেখক: সামরিক বাহিনীতে কর্মরত