দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেন আকাশছোঁয়া। এমন পরিস্থিতিতে শহুরে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের পাশাপাশি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের রাজধানী ঢাকায় টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাসা ভাড়া করে অথবা মেসে থাকেন। এসব শিক্ষার্থীর অনেকেই টিউশনি অথবা বিভিন্ন খণ্ডকালীন চাকরি করে নিজেদের খরচ চালান। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের বর্তমান ঊর্ধ্বগতিতে টিউশনি অথবা খণ্ডকালীন চাকরির টাকায় আর চলছে না। একদিকে খাবারের চিন্তা, অন্যদিকে মাস শেষে বাসা বা মেসের ভাড়া পরিশোধ। এসব খরচ মেটাতে না পেরে মেসে বাস করা বহু শিক্ষার্থী চোখে-মুখে যেন অন্ধকার দেখছেন।
মেসের বাসিন্দা বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য মাছ, মাংস, চাল, ডাল, আলু, ডিম থেকে থেকে শুরু করে ব্যবহার্য সাবান-স্যাম্পুসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কিছু কিছু পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। যার জন্য মেসে থাকা শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের প্রত্যেকেরই মিলরেট (মেসে তিন বেলা খাবারের দর) ও বাসা ভাড়া বেড়েছে। যেসব শিক্ষার্থী টেনেটুনে বাজার করছেন, তাদের প্রতিবেলার মিলরেট বেড়েছে অন্তত ১৫ টাকার বেশি। আর যারা একটু ভালো তরকারি (মুরগি ও মাছ) দিয়ে খাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে বেড়েছে ২০ টাকার বেশি।
গত চার মাসের বাজারদর ও বাসা ভাড়া বৃদ্ধির চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেসে থাকা প্রতিটি শিক্ষার্থীর এক বেলা খাবারে ৪০ ও থাকার খরচ বেড়েছে ১২-২০ শতাংশ পর্যন্ত। এর মধ্যে খাওয়া বাবদ মাছে বেড়েছে ১৮.১৮, চালে বেড়েছে ৭, ডিমের ডজনে বেড়েছে ৩৬.৩৫, সবজিতে বেড়েছে ৪০-৫০, ফার্মের মুরগিতে বেড়েছে ২৬.৬৬ এবং সিট ভাড়া বেড়েছে ১২.২০ শতাংশ।
চাকরিপ্রত্যাশী ওবায়দুল্লাহ মাসুদ খিলক্ষেতের একটি মেসে থাকেন। ওই কক্ষে তিনি ছাড়া আরও দুজন রয়েছেন। কক্ষটির প্রতি সিটের ভাড়া বর্তমানে ২ হাজার টাকা। যা আগে ছিল ১ হাজার ৮০০ টাকা। এর আগে টিউশনি করে মাসে ৬-৭ হাজার টাকা আয় করতেন ওবায়দুল্লাহ। কিন্তু মাস আগে একটি টিউশনি হারিয়ে এখন বিপাকে পড়েছেন। এক দিকে কমেছে আয়, অন্যদিকে বেড়েছে মেসের ব্যয়। তিনি এখন কীভাবে দিন পার করবেন, তা ভেবে চোখে-মুখে যেন অন্ধকার দেখছেন।
ওবায়দুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই মাস আগেও টিউশনি করে ৬-৭ হাজার টাকা পেতাম। এখন একটা টিউশনি যাওয়ায় রোজগার কমেছে। বর্তমানে টিউশনি করে ৪ হাজার টাকা পাই। এর মধ্যে মেসে সিট ভাড়া গুনতে হয় ২ হাজার টাকা। আর তিন বেলা খাওয়ার খরচ পড়ে ২ হাজার টাকা। কিন্তু বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তি থাকায় প্রতি মিলে খরচ বেড়েছে ১৫-১৭ টাকা। ফলে সকালের খাবারটা বাদ দিতে বাধ্য হয়েছি। এর বাইরেও রয়েছে যাতায়াত ভাড়া। এদিক-সেদিক করে, বন্ধুদের থেকে ধার করে এখন দিন পার করছি।’
উচ্চশিক্ষার জন্য সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় আসা ওবায়দুল্লাহ মাসুদ একা নন। রাজধানীর বুকে তার মতো হাজারো শিক্ষার্থী রয়েছেন। তেমনি একজন তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী মাইদুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেসে থাকার খরচ বেড়েছে দেড় থেকে দুই গুণ। বাজারে প্রায় সব পণ্যের দাম চড়া। প্রতিটি পণ্যই কিনতে হচ্ছে দুই গুণ দামে। এমনকি আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সাবানের মূল্যও বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। সরকারিভাবে তেলের দাম কমানো হলেও খুচরা বাজারে তা কমেনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য লাগামহীন বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছি আমরা মেসে থাকা শিক্ষার্থীরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্গে অন্যান্য খরচও তরতর করে বাড়লেও আমাদের আয় বাড়ছে না। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি খণ্ডকালীন চাকরি করে ঢাকায় থাকার খরচ চালাতাম। যা আয় করতাম তাতে বেশ ভালোভাবে মাস চলে যেত। কিন্তু বর্তমানে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চরম বিপাকে আমরা মেসে থাকা শিক্ষার্থীরা।’
বকশীবাজারের একটি মেসের বাসিন্দা রাকিব মোর্তাজা ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। খ-কালীন চাকরি থেকে অর্জিত সামান্য টাকায় নিজেও চলেন আবার ছোট ভাইকেও চালান। আগে মোটামুটি চলতে পারলেও এখন আর চলতে পারছেন না। অনেক সময় একটা খাবার দুই ভাই ভাগ করে খাচ্ছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ছোট একটা চাকরি করি। প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা বেতন পাই। আবার আমার ছোট ভাইকেও কিছু টাকা দিতে হয়। সব মিলিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করতে হচ্ছে। এখন বেঁচে থাকাটা দায় হয়ে পড়েছে। ব্যাচেলর হিসেবে বন্ধুদের সঙ্গে মেসে সিট নিয়ে থাকতে হচ্ছে। আগে প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকায় চলে যেত। কিন্তু সব জিনিসের দাম বাড়ায় এখন আর চলতে পারছি না। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন করে ৫০০ টাকা মেস ভাড়াও। এখন এক প্রকার অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি।’
ঊর্ধ্বগতির বাজারে যখন শিক্ষার্থীদের নাকাল অবস্থা, তখন নতুন করে যুক্ত হচ্ছে সিট ভাড়ার বাড়তি বোঝা। স্থানভেদে ৩০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে মেসের সিট ভাড়া। বাড়তি সিট ভাড়ার বিষয়ে ঢাকা কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী তপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য বেশি হওয়ায় এমনিতে আমাদের অবস্থা খারাপ। বাজারে গিয়ে হতাশ হতে হয়। এক দোকান থেকে আরেক দোকান ঘুরতে হয়। কোথায় দুই টাকা কমে খাদ্য তৈরির উপকরণ কিনতে পারব তা খুঁজি। তবুও মাস শেষে মিলরেট বেড়ে যাচ্ছে। আগের থেকে এখন মাসিক খরচ বেড়েছে ২ হাজারের বেশি। তার ওপর বাড়ির মালিক এক দফায় সিটপ্রতি ৩০০ টাকা বাড়িয়েছেন। আবার প্রস্তাব দিয়েছেন ভাড়া বাড়াবেন বলে।’