দুর্গম পাহাড়ে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন নিরুদ্দেশ তরুণরা

জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হওয়া ১৯ জেলার ৩৮ তরুণের তালিকা প্রকাশ করেছে র‌্যাব। তাদের অনেকে বিদেশে রয়েছেন বলে জানেন পরিবার ও স্বজনরা। তারা মাঝেমধ্যে বাড়িতে টাকাও পাঠান। তবে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঘরছাড়া ১২ জনকে আটকের পর র‌্যাব বলছে, অন্তত ৫৫ জন কথিত হিজরতের নামে বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি নিরুদ্দেশ হয়েছেন কুমিল্লা জেলা থেকে। এ ছাড়া নিরুদ্দেশ যে ৩৮ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় অবস্থান করছেন বলে প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে র‌্যাব। তাদের অনেকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ ও বোমা বিস্ফোরণের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

বাড়ি ছেড়ে যাওয়াদের সংগঠনের দাওয়াতি ও অন্যতম অর্থ সরবরাহকারী হাবিবুল্লাহসহ পাঁচজনকে গত রবিবার রাতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে এমনটিই জানা গেছে বলে দাবি করেছে র‌্যাব।

র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিরুদ্দেশ হওয়া তরুণের সংখ্যা ৫৫-এর বেশি। যারা প্রায় দেড় মাস থেকে দুই বছরের অধিক সময় ধরে নিরুদ্দেশ বা নিখোঁজ। তাদের মধ্যে কয়েকজনের পরিবার জানে, তারা চাকরির জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন এবং নিয়মিত পরিবারকে অর্থও দিচ্ছেন। ১৯ জেলা থেকে নিরুদ্দেশ হওয়া ৩৮ জন হলেন কুমিল্লার মো. দিদার, আহাদ, সাখাওয়াত হোসাইন, আমিনুল ইসলাম ওরফে আল-আমিন, মো. আস সামি রহমান, বায়েজিদ, ইমরান বিন রহমান শিথিল, আল-আমিন, ইমরান, যুবায়ের, নিহাদ আবদুল্লাহ, নাহিদ, সালেহ আহমাদ, জহিরুল ইসলাম; সিলেটের তাহিয়াত চৌধুরী, শেখ আহমদ মামুন, সাদিক, হাসান সাঈদ, সাইফুল ইসলাম তুহিন, শিব্বির আহমদ; বরিশালের আরিফুর রহমান, রাব্বী আবদুস সালাম (নীরব), মাহমুদ ডাকুয়া; পটুয়াখালীর জুয়েল মুসল্লি, আল-আমিন ফকির, মো. মিরাজ সিকদার ও ওবায়দুল্লাহ সাকিব; মশিউর রহমান ওরফে মিলন তালুকদার ও হাবিবুর রহমান; মাদারীপুরের ইয়াছিন ব্যাপারী ও আবুল বাশার মৃধা; চাঁদপুরের মো. নঈম হোসেন; ময়মনসিংহের শামীম মিয়া; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মো. নাজমুল আলম নাহিদ; খুলনার আল-আমিন; ফরিদপুরের মুহাম্মদ আবু জাফর; ঝিনাইদহের আমির হোসেন এবং মাগুরার আবু হুরায়রা।

গতকাল সোমবার দুপুরে কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন জানান, গত ২৩ আগস্ট কুমিল্লা সদর এলাকা থেকে আট তরুণ নিখোঁজ হন। নিখোঁজের বিষয়ে ২৫ আগস্ট কুমিল্লার কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন স্বজনরা। ওই ঘটনায় র‌্যাব নিখোঁজ ও ভুক্তভোগীদের উদ্ধারে ও জড়িতদের আটকে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। তদন্তকালে জানা যায়, জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা ঘর ছেড়েছেন। ইতিমধ্যে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ৬ সেপ্টেম্বর ঘর ছাড়ার প্রস্তুতিকালে চার তরুণকে হেফাজতে নিয়ে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয় র‌্যাব। কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ হওয়া আট তরুণের মধ্যে ১ সেপ্টেম্বর শারতাজ ইসলাম নিলয় (২২) নামে এক তরুণ রাজধানীর কল্যাণপুরের নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। নিলয়ের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৬ অক্টোবর মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে জঙ্গি সংগঠনের দাওয়াতি, তত্ত্বাবধানকারী, আশ্রয় প্রদান কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত তিন ও নিরুদ্দেশ চার তরুণসহ সাতজনকে আটক করা হয়।

র‌্যাব পরিচালক জানান, আটকরা উগ্রবাদী সংগঠনটির সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত রবিবার রাতে র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১০-এর যৌথ অভিযানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে কুমিল্লার শাহ মো. হাবিবুল্লাহ ওরফে হাবিব ও নেয়ামত উল্লাহ, ঢাকার মোহাম্মদপুরের মো. হোসাইন, ঢাকার সূত্রাপুরের রাকিব হাসনাত ওরফে নিলয় এবং নোয়াখালীর সাইফুল ইসলাম ওরফে রনি ওরফে জায়দ চৌধুরীকে আটক করে র‌্যাব। উদ্ধার করা হয় পাঁচটি উগ্রবাদী বই, প্রায় ৩০০ লিফলেট ও পাঁচটি ব্যাগ।

গ্রেপ্তারদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে খন্দকার আল মঈন বলেন, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কোমলমতি তরুণদের সংগঠনের সদস্যরা টার্গেট করে। মুসলমানদের ওপর নির্যাতন নিপীড়নের বিভিন্ন ভিডিও দেখিয়ে ও বিভিন্ন অপব্যাখ্যা দেওয়ার মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করত। উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ তরুণদের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও বিভিন্ন তাত্ত্বিক জ্ঞান দিত। সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিতে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়ে উৎসাহী করে তুলত।

উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে আটক হোসাইন এক বছর আগে, সাইফুল দেড় মাস এবং রাকিব দুই মাস আগে নিখোঁজ হন। জানা যায়, নিখোঁজ হওয়া তরুণদের সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতির জন্য প্রশিক্ষণ নিতে পটুয়াখালী ও ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। নিরুদ্দেশ হওয়া তরুণদের পটুয়াখালী এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে রেখে পটুয়াখালী ও ভোলার বিভিন্ন চর এলাকায় শারীরিক কসরত ও জঙ্গিবাদবিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করত। এ ছাড়াও আত্মগোপনে থাকার কৌশল হিসেবে তাদের রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ানসহ বিভিন্ন পেশার কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।

এসব জঙ্গি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিচ্ছে উল্লেখ করে কমান্ডার মঈন বলেন, প্রাথমিকভাবে সংগঠনের আটক সদস্যদের মাধ্যমে আমরা ৩৮ জনের তথ্য পেয়েছি, যাদের নাম ও ঠিকানা পাওয়া গেছে; ক্ষেত্রবিশেষে নাম ও ঠিকানায় কিছুটা তারতম্য থাকতে পারে। তাদের অবস্থান পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলে। সেখানে তারা বিভিন্ন সংগঠনের ছত্রছায়ায় আত্মগোপনে থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং সংগঠনটির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত এ তথ্যগুলো দেশের সব গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন বাহিনীকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সম্মিলিত অভিযান চলমান রয়েছে।

জঙ্গিবাদে অর্থায়নের বিষয়ে র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, আটক হাবিবুল্লাহ কুমিল্লায় কুবা মসজিদে নামাজ পড়াতেন। এ ছাড়াও তিনি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন, তিনি ২০২০ সালে নেয়ামত উল্লাহর মাধ্যমে ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ (পূর্বাঞ্চলীয় হিন্দের জামাতুল আনসার) সংগঠনটিতে যুক্ত হন। তিনি সংগঠনটির অন্যতম অর্থ সরবরাহকারী। তার নেতৃত্বে কুমিল্লা অঞ্চলে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালিত হতো। তিনি সংগঠনের জন্য বিভিন্নভাবে অর্থ সংগ্রহ করতেন ও উগ্রবাদী কার্যক্রমে অর্থ সরবরাহ করতেন। তিনি পার্বত্য অঞ্চলের নাইক্ষ্যংছড়িতে প্রায় দুই বছর ধরে একটি মাদ্রাসা পরিচালনা করছেন। তিনি পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাত্র সংগ্রহ করে তার মাদ্রাসায় রাখতেন। ১৫-২০ জন সদস্য সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণে প্রেরণ করেছেন বলে জানান।

আটক নেয়ামত উল্লাহ কুমিল্লার একটি মহিলা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন বলে জানান এ র‌্যাব কর্মকর্তা। ২০১৯ সালে স্থানীয় একটি ব্যক্তির মাধ্যমে সংগঠনে যুক্ত হন। তিনি সংগঠনের দাওয়াতি কার্যক্রমে যুক্ত থাকার পাশাপাশি নিরুদ্দেশ হওয়া তরুণদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বেও জড়িত ছিলেন। বাড়ি ছেড়ে যাওয়া সদস্যদের তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে আশ্রয় দিতেন বলে জানান। আটক হোসাইন পেশায় একজন ইলেকট্রিশিয়ান এবং রংমিস্ত্রি। তিনি স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হন। এক বছর ধরে সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। আটক রাকিব কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারি বয়ের কাজ করতেন। তিনি আটক হোসাইনের মাধ্যমে সংগঠনে জড়িত হন। উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি প্রায় দুই মাস আগে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন। আটক সাইফুল পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। তিনি গত আগস্ট মাসে নোয়াখালী থেকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিরুদ্দেশ হন। নোয়াখালীর এক ব্যক্তির মাধ্যমে উগ্রবাদী এ সংগঠনে জড়ান।

এক প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার মঈন বলেন, আটক হাবিবুল্লাহ বিভিন্ন নামে-বেনামে মাদ্রাসা মসজিদের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করে ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার (পূর্বাঞ্চলীয় হিন্দের জামাতুল আনসার) জন্য অর্থায়ন করতেন। আমরা এখনো প্রাথমিক স্তরে কাজ করছি। সংগঠনের কে বা কারা নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে রয়েছেন তা এখনো জানা সম্ভব হয়নি। তবে জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম থেকে বেরিয়ে এ সংগঠনে জড়াচ্ছেন।

নিখোঁজদের কেউ দেশ ছেড়েছেন কি না এবং তারা কীভাবে পরিবারকে টাকা পাঠাতেন জানতে চাইলে কমান্ডার মঈন বলেন, এখন পর্যন্ত নিখোঁজ ৩৮ জনের কাউকে এখনো আটক করতে পারিনি। দুই দফায় ছয় তরুণসহ আটক ১২ জন এ তালিকার বাইরে। তাদের ৩৮ জনের কাউকে আটক করা গেলে বোঝা যাবে কেউ দেশ ত্যাগ করেছেন কি না। নিখোঁজদের কেউ কেউ পরিবারে টাকা দিচ্ছেন, পরিবার জানে তারা বিদেশে। তবে তারা দেশে থেকেই অল্প কিছু টাকা পরিবারে পাঠাচ্ছেন। ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা।