কুমিল্লা সদর এলাকার বাসা থেকে গত বছরের ১৭ নভেম্বর আসরের নামাজ পড়ার কথা বলে বের হন মো. নাজমুল আলম নাহিদ। তিন ভাইয়ের মধ্যে নাহিদ ছিলেন মেজো। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি।
নাহিদের বড় ভাই দেশ রূপান্তরকে জানান, তাদের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানায় হলেও লেখাপড়ার সুবিধার্থে ১৭ বছর ধরে কুমিল্লা শহরে ভাড়া বাসায় থাকেন তারা। তার ভাই নাহিদ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। নিখোঁজের পর নাহিদকে সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও পাননি। পরে তারা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
বরিশালের ফরফরিয়াতলা থানা এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমানের নিরুদ্দেশ হওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেছে। তার ছোট ভাই মো. আসিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, উচ্চমাধ্যমিক পাস করে চাকরির কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি আরিফ। স্থানীয় মসজিদের ইমাম ছিলেন আরিফুর। নিয়মিত তাবলিগ জামাতে যেতেন।
কুমিল্লার কোতোয়ালি এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম দেড় মাস আগে নিরুদ্দেশ হন। তার বাবা নুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, তাদের ডিজিটাল ছবির দোকান রয়েছে। সেখানেই কাজ করতেন আমিনুল। তিনি তাবলিগ জামাতে যেতেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও পড়তেন। মাস তিনেক আগে থেকে দোকানে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলেন।
নাহিদ, আরিফুর ও আমিনুলের মতো অন্তত ৫৫ জন বাসা থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছে র্যাব। এর মধ্যে সর্বোচ্চ কুমিল্লা থেকে ১৫, সিলেট থেকে ৭, নারায়ণগঞ্জ থেকে ৪ জনসহ অন্য ১৯ জেলা থেকে তারা নিরুদ্দেশ রয়েছেন। তাদের মধ্যে নাহিদ, আরিফুর ও আমিনুলসহ ৩৮ জনের নাম-পরিচয় জানতে পেরেছে র্যাব। তাদের অনেকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় থেকে অস্ত্র চালানো, বোমা তৈরিসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন বলে দাবি র্যাবের। তাদের আটকের জন্য র্যাবের দুই শতাধিক সদস্য মাঠে নেমেছেন।
এসব নিখোঁজের স্বজনরা বলছেন, হঠাৎ নিরুদ্দেশ হলেও তার কিছুদিন আগে তাদের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। অনেক স্বজন বলেছেন, নামাজ পড়ার কথা বলে হঠাৎ নিয়মিত মসজিদে যাতায়াত, সেখান থেকে তাবলিগে যাওয়া এবং এর কিছুদিনের মধ্যে নিরুদ্দেশ হয়েছেন।
মাগুরার মহম্মদপুর থেকে নিখোঁজ আবু হুরায়রার মা দেশ রূপান্তরকে জানান, গত বছরের ৩ নভেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন আবু হুরায়রা। তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে একটি মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছেন। ভারতে পড়ালেখা করতে যাবেন বলে বায়না ধরেন পরিবারের কাছে। একপর্যায়ে মাকে তিনি বলেন, ‘মা, আমি যেকোনো মুহূর্তে ভারত চলে যাব। তোমরা চিন্তা কইরো না।’ গত বছরের ৩ নভেম্বর যখন বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করেন, তখন মায়ের কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা নেন। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পায়নি পরিবার।
ঝালকাঠির নলছিটি এলাকার মশিউর রহমানও নিরুদ্দেশ দেড় বছর ধরে। থাই মিস্ত্রির কাজ করতেন তিনি। মশিউরের স্ত্রী সুমাইয়া জানান, ঢাকায় কাজের কথা বলে দেড় বছর আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি মশিউর।
র্যাবের তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাদের অনুসন্ধানে এসব নিখোঁজের জঙ্গিবাদে জাড়িয়ে পড়ার তথ্য মিলেছে। তারা হিজরত করতে বাড়ি থেকে বেড় হয়েছেন। তাদের উদ্ধারে চেষ্টা চলছে। তবে নিরুদ্দেশ হওয়াদের বেশির ভাগই দুর্গম পাহাড়ে অবস্থান করছেন। মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থানে তারা আত্মগোপনে রয়েছেন। ওই সব মাদ্রাসায় বেশির ভাগই শিশু। সেখানে আন্তর্জাতিকভাবেও শিশুদের নাম করে সহায়তা আনছে বলেও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া দেশের ভেতর থেকেও বিভিন্ন চ্যানেলে সেখানে টাকা যাচ্ছে। এসব টাকা ব্যবহার হচ্ছে তাদের থাকা-খাওয়া ও প্রশিক্ষণে। অনেকে পরিবারকে মাঝেমধ্যে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন বলেও তথ্য মিলেছে। তবে ওই সব দুর্গম এলাকায় খাবারসহ অন্যান্য জিনিস পৌঁছানো কঠিন হলেও একটি শক্তিশালী চক্র অর্থের বিনিময়ে তাদের সহায়তা করছে। ওই চক্রকেও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।
জানতে চাইলে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিরুদ্দেশ হয়ে জঙ্গিবাদে জড়ানোদের মধ্যে আমরা ৬৭ জনের তথ্য পেয়েছি। তাদের মধ্যে ১২ জনকে আটক করেছি। অবশিষ্ট যে ৫৫ জন রয়েছে, তারা দুর্গম পাহাড়ি এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করছেন বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এই ৫৫ জনই জঙ্গিদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের গ্রেপ্তার করতে পারলে বিস্তারিত জানা যাবে।’