সৈয়দ শামসুল হুদার শততম মৃত্যুবার্ষিকী

উনিশ শতক বাঙালি মুসলমানদের জেগে ওঠার সময়। তখন ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের লৌহশৃঙ্খলে বাঁধা। তাচ্ছিল্য আর অবহেলাই ছিল তাদের ললাট লিখন। এ সময়েই বাঙালি মুসলমান সমাজে বেশ কিছু মনীষী জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে এরাই অন্ধকারে থাকা বাঙালি মুসলমান সমাজের দেদীপ্যমান শিখায় পরিণত হন। এ শিখা ছিল জ্ঞানের। রাজনীতি, সমাজসেবা ও শিক্ষার উন্নয়নে এরা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। ইংরেজ শাসনের লৌহকপাটে তারাই জোরালো ঝাঁকুনি দিয়েছিলেন। এদের মধ্যে সৈয়দ শামসুল হুদা ছিলেন অন্যতম। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব। রাজনীতিক, সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী হিসেবে তিনি ছিলেন প্রবাদপ্রতিম। তার অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। সৈয়দ শামসুল হুদার জন্ম ১৮৬২ সালে। ব্রিটিশ ভারতের ত্রিপুরা জেলার (পরে কুমিল্লা এবং বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা) গোকর্ণ গ্রামে। তার পিতার নাম সৈয়দ রিয়াজতউল্লা আর মা আলম আরা খাতুন। তার পরিবার ছিল পীর স্থানীয় এবং সৈয়দ লকবধারী। তার বংশের প্রতিষ্ঠাতা পূর্বপুরুষ ছিলেন বন্দেগি সৈয়দ শাহ ইসরাইল (রহ.)। উনি ছিলেন শ্রীহট্ট বিজয়ী হযরত শাহজালালের (রহ.) অন্যতম সঙ্গী সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরুদ্দিনের (রহ.) অধস্তন পুরুষ। বন্দেগি সৈয়দ শাহ ইসরাইল (রহ.) ত্রিপুরা রাজ্যে বসতি স্থাপন করলে সৈয়দ শামসুল হুদার বংশধারার উৎপত্তি হয়। সৈয়দ শামসুল হুদার পিতা সৈয়দ রিয়াজতউল্লা ছিলেন আধ্যাত্মিক গুণাবলিসম্পন্ন পুরুষ। তিনি কলকাতার মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছিলেন। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতে ওকালতি পেশায় যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কলকাতায় স্থায়ী হন। সেখানে সাংবাদিকতা পেশা গ্রহণ করেন। সৈয়দ রিয়াজতউল্লা বেশি খ্যাতিমান ‘দূরবীন’ নামক ফার্সি পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে। ফার্সি ভাষায় লেখা তার কিছু কবিতা (দিওয়ান) অগ্রন্থিত ভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত আছে।

বালক সৈয়দ শামসুল হুদার মধ্যে বংশীয় গুণের সমন্বয় ঘটেছিল। ওই সময়ের সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারের রেওয়াজ অনুসারে সৈয়দ শামসুল হুদার বাল্যশিক্ষা শুরু হয় পিতার কাছে। আর তা ছিল আরবি আর ফার্সি। পরে তাকে উচ্চশিক্ষার জন্য হুগলি হাজী মুহাম্মদ মুহসিন মাদ্রাসায় পাঠানো হয়। ১৮৮০ সালে তিনি হাজী মুহাম্মদ মুহসিন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৮৮৪ সালে বিএ পাস করেন। ১৮৮৬ সালে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। তার জ্ঞানতৃষ্ণা ছিল প্রবল। ১৮৮৯ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আরবি ও ফার্সি বিভাগ থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ২য় শ্রেণিতে এমএ পাস করেন। আরবি, ফার্সি, হিন্দি, উর্দু এবং ইংরেজিতে ছিল তার অগাধ পাণ্ডিত্য।

সৈয়দ শামসুল হুদার কর্মজীবন ছিল বর্ণাঢ্য। ১৮৮৫ সালে তিনি কলকাতা মাদ্রাসা কলেজে আরবি-ফার্সি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। বিএল পাস করার পর তিনি যোগ দেন কলকাতা হাইকোর্টে। সৈয়দ শামসুল হুদা আইন পেশাকে সমাজসেবামূলক কাজ মনে করতেন। তার কাছে মক্কেলের ধনী-দরিদ্র ব্যবধান ছিল না। মামলার গুণাগুণ (Merit) বিচার করে পরিচালনার জন্য গ্রহণ করতেন। মামলার ন্যায়সংগত ভিত্তি থাকায় উনার তীক্ষ্ন যুক্তির কারণে ফলাফল অনুকূলে আসত। অচিরেই মেধাবী ও ন্যায়নিষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে তার গুণ ছড়িয়ে পড়ে। আইন পেশায় তার পারদর্শিতা এতই বেড়ে যায় যে ১৮৮৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯০৪ সালে তাকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঠাকুর আইন অধ্যাপক’ (Tagore’s Professor of law) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ পদ ছিল একজন বাঙালি মুসলমানের জন্য গৌরবের বিষয়। কাছাকাছি সময়ে তিনি রাজনীতি এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়েন। মুসলমানরা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অনগ্রসর বিষয়টা তার তীক্ষè পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে। মুসলমানদের সামাজিক গতিশীলতা বাড়াতে হলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে এ ধারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৮৯৩ সালে ‘মোহামেডান ইউনিয়ন’ গঠন করেন। তিনি ছিলেন ১১৭ সদস্যের কমিটির সহ-সভাপতি। এ সংগঠন সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে স্কুল/মাদ্রাসা স্থাপন এবং অনুদান আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের পক্ষপাতী ছিলেন।

নবাব স্যার সলিমুল্লাহর উদ্যোগে মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার জন্য ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। উনি মুসলিম লিগের সভাপতি হন আর সৈয়দ শামসুল হুদা হন সহসভাপতি। মুসলমানদের ভোটাধিকার আদায় করা ছিল এ সংগঠনের উদ্দেশ্য। আইন পাস হলে ১৯০৯ সালে নির্বাচন হয়। সৈয়দ শামসুল হুদা তখন পূর্ববঙ্গ ও আসামের ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১০ সালে তিনি পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধি হিসেবে কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯১২ সালে সৈয়দ শামসুল হুদা বেঙ্গল এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য হন। এ পদে তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি। স্বয়ং ভারত সম্রাট এ পদে মনোনয়ন দিতেন। ১৯১৭ সালে সৈয়দ শামসুল হুদা কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় বাঙালি মুসলমান যিনি বিচারপতি হন। এ পদে নিযুক্তি ছিল তার প্রতিভা, ন্যায়পরায়ণতা ও দক্ষতার পরিচায়ক। বেঙ্গল এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সভাপতি পদে নিয়োগ লাভ ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য ও সম্মান। কারণ স্পিকার পদে তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয়। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক (১৯১০-১৯২০ সাল) ছিল সৈয়দ শামসুল হুদার জীবনের সুবর্ণ সময়। ১৯১৩ সালে তিনি ‘নবাব’ উপাধি পান। আরও তিন বছর পরে সৈয়দ শামসুল হুদাকে ‘স্যার’ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।

২০ শতকের শুরু ছিল বঙ্গভঙ্গের ডামাডোল নিয়ে। বঙ্গ এবং আসাম প্রদেশ গঠনের মুসলমানরা বিপুল ভাবে সমর্থন দেন। বঙ্গ প্রদেশের রাজধানী ঢাকা হবে এতেই মুসলমানরা খুশি হয়েছিলেন। চক্রান্ত করে এ পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। ঢাকায় একটা বিশ্ববিদ্যালয় হলে মুসলমানদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম হবে এটাই ছিল বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে মুসলিম নেতাদের অন্যতম ভাবনা। এ দাবির সাপেক্ষে সবচেয়ে বেশি উচ্চকণ্ঠ ছিলেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। আর তার যোগ্য সঙ্গী ছিলেন ধনবাড়ির জমিদার নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী এবং কুমিল্লার সৈয়দ শামসুল হুদা। ১৯১৫ সালে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তার সারথীরা কর্তব্যচ্যুত হননি। তারা দুজন সলিমুল্লাহর আরদ্ধ কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়। সৈয়দ শামসুল হুদা ছিলেন ৭জন উদ্যেক্তা সদস্যের অন্যতম। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোর্ট (সিনেট) এর সদস্যও হয়েছিলেন। অনেকেই জানেন না যে, বর্তমানে রোকেয়া হল যেখানে আছে সেখানে ‘হুদা হাউস’ নির্মিত হয়েছিল তার ঢাকা অবস্থানকালের জন্য। ১৯৫৬ সালে এটা ভেঙেই রোকেয়া হল নির্মাণ করা হয়।

বাঙালি মুসলমানদের নবচেতনার মশাল বহনকারী এ মনীষী ১৯২২ সালের ৭ অক্টোবর কলকাতা মহানগরে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে কলকাতার তিলজলা কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। এবছর বাঙালি মুসলমান মনীষীদের উজ্জ্বল নক্ষত্র সৈয়দ শামসুল হুদার শততম মৃত্যুবার্ষিকী। আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে এ দেশের জন্য তার অবদানের কথা স্মরণ করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্থাপনায় সৈয়দ শামসুল হুদার নাম সংযোজন করার জন্য যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাই। আশা করি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

enayetur64@gmail.com