অর্থনীতির সার্বিক চিত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে

কভিড-১৯পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্বাভাবিক থাকলেও চলতি বছরের শুরুতে হঠাৎ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সারা বিশে^র পাশাপাশি পাল্টে দিয়েছে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চিত্র। কোনো সূচকেই দেশের অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। গতকাল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) প্রধানমন্ত্রীর কাছে সার্বিক অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে প্রধান অর্থনৈতিক ইউনিটের পলিসি সাপোর্ট উইং। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান খাত রেমিট্যান্সের বেহাল দশা। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ছিল ২৪ বিলিয়ন ডলার, যার প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৬ দশমিক ১০ শতাংশ। কিন্তু ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে দেখা যায় তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১ বিলিয়ন ডলারে, প্রবৃদ্ধি কমেছে ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ। অবশ্য চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রবাসী আয় কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। এ সময় পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

আমদানি-রপ্তানিতে বড় ব্যবধানের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। আমদানিতে লাগাম টানার পরও রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়ত ডলার ছাড়তে হচ্ছে। ফলে রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়নে নেমে যাওয়ার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে দেখা যায় ২০২০-২১ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৪৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরের শেষে তা দাঁড়িয়েছিল ৪১ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসের শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে।

ডলার সংকটের কারণে অব্যাহতভাবে টাকার অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২০-২১-এ ডলার রেট ছিল ৮৪ টাকা ৮১ পয়সা, ২০২১-২২-এ তা ছিল ৯৩ টাকা ৪৫ পয়সায়,যা বর্তমানে ১০৩ টাকা ৬২ পয়সায় রয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় আরও বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। 

দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি রপ্তানি আয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৮ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের আয় ছিল, অবশ্য এরপরের বছর সুখবর মিলেছিল এ খাতে। ২০২১-২২ অর্থবছরের শেষে রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এ খাতের প্রবৃদ্ধি ১১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর শেষে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে।

তবে আমদানির তুলনায় রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মধ্যেই রয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬৫ বিলিয়ন ডলারের আমদানি হলেও ২০২১-২২ অর্থবছরের আমদানি বেড়েছে ৮৯ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। ওই দুই অর্থবছরের এলসি খোলার পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৬৭ বিলিয়ন ডলার ও ৯২ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার।

দেশের ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণও বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় তিনগুণ বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। এ সময়ে ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে প্রতি বছরই অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। দেশের ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে পাবলিক বা সরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫১ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ২০ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। এ সময়ে বেসরকারি খাতেও ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৫৫ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৫১ হাজার ২৩৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও ব্যয়বহুল সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে সরকার। আবার উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় কমে যাওয়ায় এ খাতে বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২০-২১ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা। অথচ ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে তা দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে আমদানি দায় মেটাতে ডলার কিনতে হওয়ায় ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি সংকুচিত হয়ে আসছে। এতে করে ধারের চাহিদা বেড়েছে। এতে করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কলমানি রেটের পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি উন্নীত হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে কলমানি রেট ছিল ২ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে তা দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৪২ শতাংশে। ব্যাংকগুলোর রেপো রেটও বেড়েছে। আলোচিত দুই অর্থবছরে রেপো রেটের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে রেপো সুদহারের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশে।

অভ্যন্তরীণ আয়ের প্রধান খাত রাজস্ব আয়ে অবশ্য আগের চেয়ে কিছুটা ভালো অবস্থা প্রকাশ পেয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্ব আয় ছিল ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। পরের বছরই তা ১৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা।