জীবিকার তাগিদে পরিবার ফেলে গাজীপুরে এসে তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করছেন লাখো মানুষ। পুরো মাস দিন-রাত ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের পর বেতনের টাকা হাতে পেলে সব ক্লান্তি ভুলে যান তারা। অন্যদিকে গ্রামে মা-বাবাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা চেয়ে থাকেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি কখন পাঠাবেন সংসার খরচের টাকা। এসব পোশাকশ্রমিকের অনেকেরই ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচসহ বাসা ভাড়া, দোকান বাকিসহ পুরো বেতন ব্যয়ের হিসাবের ছকে বাঁধা। কিন্তু সেই দিন-রাত ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের পুরো মাসের বেতনের টাকা অনেকের কাছ থেকেই পুলিশ পরিচয়ে ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নিত একটি প্রতারক চক্রের সদস্যরা। যারা পুলিশ সদস্যদের মতো হাতে ওয়াকিটকি ও পিস্তল নিয়ে ভয় দেখিয়ে কৌশলে বিপদে ফেলে দিত অসহায় দরিদ্র গার্মেন্টস শ্রমিকদের। গত সোমবার রাতে এমনই একটি চক্রের হোতাসহ চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ।
সদর থানা পুলিশের অভিযানে নগরীর সালনা বাজারের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আন্ডারপাসের নিচ থেকে চক্রটির হোতা ভুয়া পুলিশ সদস্য এবং ঢাকার আশুলিয়ার পশ্চিম জিরাবো এলাকা থেকে তার তিন সহযোগীকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে চক্রটির প্রধান রুবেল রানা (২৬) টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের ফটিয়ামারী এলাকার মৃত তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে। সে গাজীপুর নগরীর গাছা থানা এলাকার কলমেশ্বর এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকত। আর অন্য তিনজনের মধ্যে গ্রেপ্তার তুষার ইসলাম (৩৭) ঝিনাইদহের হরিনাকু-ু থানার শোড়াতলা গ্রামের জব্বার মালিথার ছেলে, সবুজ মোল্লা (৩৪) বরিশালের আগৈলঝাড়ার আশোকসেন গ্রামের জাহাঙ্গীর মোল্লার ছেলে এবং খায়রুল ইসলাম (৩১) পঞ্চগড়ের বোদা থানার দিগলগ্রামের জহিরুল হকের ছেলে। তারা জিরাবোর বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া করে থাকত। গ্রেপ্তার চারজনের কাছ থেকে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত বিভিন্ন নকল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. আলমগীর হোসেন জানান, গাজীপুরের অনেক এলাকায় গার্মেন্টস শ্রমিকরা নির্দিষ্ট দিনে এটিএম কার্ডের মাধ্যমে বেতনের টাকা উত্তোলন করেন। প্রতারক চক্রের সদস্যরা ওইসব এলাকায় ভুয়া পুলিশ পরিচয় দিয়ে নকল আইডি কার্ড ও ওয়াকিটকি নিয়ে বিভিন্ন এটিএম বুথের সামনে অবস্থান করত। শ্রমিকরা এটিএম বুথের সামনে এসে টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করলে প্রতারকরা পুলিশ পরিচয় দিয়ে বেতন উত্তোলনে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে যেত। তারা শ্রমিকের কাছ থেকে এটিএম কার্ডটি নিয়ে বুথে না প্রবেশ করিয়েই পাসওয়ার্ড জিজ্ঞাসা করে জেনে নিত। তারপর কৌশলে একই ব্যাংকের অচল কার্ড বুথে প্রবেশ করাত। কার্ডটি বুথে আটকে যাওয়ার পর শ্রমিকের এটিএম কার্ডটি পকেটে রেখে দ্রুত অন্য বুথে গিয়ে সব টাকা উঠিয়ে নিত। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে ভয়ভীতি দেখাত।
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, প্রতারক চক্রটির হোতা রুবেল রানা পুলিশ পরিচয় দিয়ে এ পর্যন্ত চারটি বিয়ে করেছে। এছাড়া চক্রটির সদস্যরা পুলিশের পোশাক পরিহিত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করে নিজেদের পুলিশ সদস্য পরিচয় দিত। এই পরিচয়ে নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলত। পরে বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে শারীরিক সম্পর্ক করে গোপনে সেই ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে অর্থ আদায় করত।