ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবহৃত পরীক্ষার উত্তরপত্রসহ বিভিন্ন পুরনো কাগজ বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে। এতে বিশ^বিদ্যালয়ের ১৮ লাখ ৪৩ হাজার ৯৩৮ টাকা লোকসান হয়েছে। বিধি অনুয়ায়ী যতটুকু পুরনো মালামাল মজুদ থাকবে শুধু ততটুকুই টেন্ডার করা যাবে। তবে এই নিয়ম উপেক্ষা করে মজুদের চেয়ে অনেক বেশি আগাম বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
দেশ রূপান্তরের হাতে আসা নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২৮ নভেম্বর দরপত্রের মাধ্যমে আনজুম ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষার পুরনো উত্তরপত্রের মূল্য প্রতি কেজি ২১ দশমিক ৫০ টাকা, প্রশ্নপত্র প্রতি কেজি মূল্য ১১ টাকা, নম্বরপত্র খামসহ প্রতি কেজি মূল্য ৩ টাকা, ব্যবহার অনুপযোগী ফরম প্রতি কেজি মূল্য ১০ টাকা, পুরনো ফাইল প্রতি কেজি মূল্য সাড়ে ৮ টাকা, ফল বিন্যাসপত্রের পুরনো খসড়া প্রতি কেজি মূল্য ১৭ টাকা, থিসিস/রিসার্চ মনোগ্রাফ প্রতি কেজি মূল্য ১৭ টাকা দরে দেওয়া হয়। দরপত্রে বলা হয়, দুই লাখ কেজি পুরনো কাগজ এই ওয়ার্ক-অর্ডারের আওতায় থাকবে। যদিও ওই সময় চুক্তিতে উল্লিখিত পরিমাণ কাগজ বিশ^বিদ্যালয়ের মজুদ ছিল না। চুক্তি মোতাবেক এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫৮৮ কেজি কাগজ মেসার্স আনজুম ট্রেডার্সের কাছে বিক্রি করেছে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর।
বাজারদর যাচাই করে দেখা যায়, পুরনো উত্তরপত্রের মূল্য প্রতি কেজি ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসাবে বাজারদরের চেয়ে কেজি প্রতি ১৪ টাকা কমে কাগজ বিক্রি করা হচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫৮৮ কেজি কাগজে ক্ষতি হয়েছে ১৮ লাখ ৪৩ হাজার ৯৩৮ টাকা।
বাজারদরের চেয়ে কম দামে কাগজ বিক্রির বিষয়ে জানতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহালুল হক চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন না বলে জানান। কম দামে কাগজ বিক্রির ব্যাখ্যা জানতে জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক মাহমুদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কী বলব? এটা তো পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের বিষয়। তিনি আমার কাছে কেন পাঠালেন, এটাই তো বুঝতেছি না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দেশ রূপান্তরকে বলেন, টেন্ডার করার সময় বিক্রি মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাগজ নিতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের কাগজ দেওয়া হয়নি। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নিশ্চয় কোনো সুবিধা নিয়ে এ কাজ করেছে!
এদিকে ৩ অক্টোবর ভাই-ভাই ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান বিশ^বিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষকে দেওয়া একটি চিঠিতে জানিয়েছে, তারা ৩৫ টাকা কেজিতে কাগজ কিনতে আগ্রহী ছিল। তবে তাদের কাগজ না দিয়ে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে ২১ টাকা ২৫ পয়সা দরে কাগজ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করে ওই প্রতিষ্ঠান।
সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টির সত্যতা যাচাই করতে হিসাব পরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য হিসাব পরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রতিবেদন দিলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল জানিয়েছেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। তবে এটি ভিসি অফিসের অধীনে। তারাই এটার সঠিক উত্তর দিতে পারবে।’
অনিয়মের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমি বিষয়টি শুনেছি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের খতিয়ে দেখার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
উপাচার্যের অধীন দপ্তরের অনিয়মে উপাচার্যের কোনো দায় আছে কি না এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘বিশ^বিদ্যালয়ের সব বিষয়ে উপাচার্যের দায় আছে। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। তদন্ত সাপেক্ষে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’