সিসিটিভি দেখে গাইবান্ধার ভোট বন্ধ

ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু নেই এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে; এ কারণে গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসনের ভোটগ্রহণ স্থগিত ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল বুধবার দুপুরে নির্বাচন কমিশন ভবনে পুরো আসনের ভোটগ্রহণ স্থগিতের এ ঘোষণা দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। স্থগিত হলেও সম্পূর্ণ নির্বাচন নতুন করে করতে হবে। সেই হিসাবে কার্যত গতকালের নির্বাচন বাতিল।

গতকাল সকালে ভোটগ্রহণ শুরুর পর থেকে দুপুর ২টার কিছুক্ষণ পর পর্যন্ত অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ পেয়ে ধাপে ধাপে এ আসনের (দুই উপজেলার) ১৪৫টি ভোটকেন্দ্র্রের ৫১টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করে ইসি। ভোটে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছাড়া অন্য চার প্রার্থী ভোট বর্জন করে সুষ্ঠু পরিবেশে পুনরায় ভোটগ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

গাইবান্ধা-৫ আসনের ১৪৫টি ভোটকেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্র বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) শুরু হয় সকাল ৮টায়। ভোট চলার কথা ছিল বিকেল ৪টা পর্যন্ত। সকালে ভোটারের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ভোটারের সংখ্যা। কিন্তু বিভিন্ন কেন্দ্রে অনিয়মের খবর চাউর হতে থাকায় একপর্যায়ে ভোটারের সংখ্যা কমতে থাকে। দুপুর নাগাদ ভোটারশূন্য হয়ে পড়ে অনেক কেন্দ্র। ভোটকেন্দ্র সার্বিক পর্যবেক্ষণে রাখতে বসানো হয় ১ হাজার ২৪২টি সিসিটিভি ক্যামেরা। সিসিটিভির ফুটেজ দেখা হচ্ছিল

নির্বাচন কমিশন ভবন থেকে। গোপন কক্ষে একাধিক ব্যক্তির অবৈধ অনুপ্রবেশ, একজনের ভোট আরেকজনের দিয়ে দেওয়া প্রভৃতি ঘটনা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছিল নির্বাচন কমিশন। পর্যবেক্ষণ করে দুপুর পর্যন্ত কয়েক দফায় ৫১টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। অনেক কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরার ইন্টারনেট-সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সেসময়।

দুপুর ১২টার দিকে সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হয়ে সিইসি বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, ভোটকেন্দ্রের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কিছু অনিয়ম যেমন গোপন কক্ষে অনধিকার প্রবেশ বা আইন ভেঙে একের ভোট অন্যের দিয়ে দেওয়া এসব আমরা স্বচক্ষে দেখেছি।’

দুপুর ২টার দিকে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল ভোটগ্রহণ স্থগিত করার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আমরা সমগ্র নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনী কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছি। ওখানে আর ভোট হচ্ছে না। পরে বিধি-বিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কমিশন বসে সিদ্ধান্ত নেবে।’

গতকাল দুপুর ১২টার পর সাঘাটা উপজেলার বগারভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছাড়া অন্য চার প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। এ চার প্রার্থী হলেন জাতীয় পার্টির (জাপা) এএইচএম গোলাম শহীদ রঞ্জু (লাঙ্গল), বিকল্পধারা বাংলাদেশের জাহাঙ্গীর আলম (কুলা), স্বতন্ত্র প্রার্থী নাহিদুজ্জামান নিশাদ (আপেল) ও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান (ট্রাক)।

ভোট বর্জন করা প্রার্থীরা বলেন, ‘আমাদের এজেন্টদের ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে কেন্দ্র দখল করেছে নৌকার প্রার্থীর লোকজন। আমাদের এজেন্টরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে ভোটকেন্দ্র থেকে চলে গেছে। নৌকা প্রতীকে ভোট দিতে চাইলে তবেই যেন ভোটাররা ভোট দেন, না হলে ভোট দেওয়া থেকে ভোটারদের বিরত থাকতে বলেন আওয়ামী লীগের সমর্থকরা। তারা নিজেদের নির্বাচনী অফিসে হামলা করে আমাদের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের গ্রেপ্তার করিয়েছে। তাদের মামলার আসামি করিয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষকে লিখিত ও মৌখিকভাবে এবং ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করে এসব জানানোর পরও কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

তারা বলেন, ‘ইলেকশন কমিশনের বক্তব্য ছিল, ইভিএমে একজনের ভোট আরেকজন দিতে পারবে না। কিন্তু তাদের কথায় ফাঁকি ছিল। আমাদের এজেন্টদের বের করে দিয়ে ভোটারের ফিঙ্গার নেওয়ার পরও নৌকা প্রতীকে ভোট দেওয়া হচ্ছে। এটা কী করে সম্ভব! সুতরাং এ ভোট করার কোনো যুক্তি নেই, এ ভোট আমরা বর্জন করলাম।’ ভোট বাতিল করে নির্বাচন কমিশনের কাছে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানান প্রার্থীরা।

এ উপনির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মাহমুদ হাসান রিপন, জাতীয় পার্টি (জাপা) মনোনীত এএইচএম গোলাম শহীদ রঞ্জু, বিকল্পধারা বাংলাদেশ মনোনীত জাহাঙ্গীর আলম, স্বতন্ত্র প্রার্থী নাহিদুজ্জামান নিশাদ ও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল কয়েক প্লাটুন র‌্যাব ও আনসার সদস্য এবং ১ হাজার ২৮৫ জন পুলিশ। ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়।’

জেলা প্রশাসক মো. অলিউর রহমান বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ১৪৫টি কেন্দ্রে ভোট শুরু হয়। প্রত্যেক ইউনিয়নে একজন করে ১৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং দুজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। মাঠে ছিল কয়েক প্লাটুন বিজিবি ও অস্ত্রধারী আনসার সদস্য।’

সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আবদুল মোত্তালিব বলেন, ‘এ আসনে ইভিএমে ১৪৫টি কেন্দ্রে ৯৫২টি বুথে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় ৯টি কেন্দ্রে জেনারেটরের সাহায্যে ইভিএম মেশিন চালানো হয়। এখানে ভোটার ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৮ জন।’

নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে রিটার্নিং অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো সংঘর্ষ বা বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। অনিয়মের কারণে একে একে ৫১টি ভোটকেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। পরে এ উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ স্থগিত ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।’ নির্বাচনে কী কী অনিয়ম হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এর বেশি বলা সম্ভব নয়। কাজ করছি, কাজ করতে দেন।’

নির্বাচন বন্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ : উপনির্বাচন বন্ধের প্রতিবাদে রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলায় বিক্ষোভ করেছেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। নির্বাচন বন্ধের খবর শুনে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য সহযোগী অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদের সামনে জড়ো হন। তারা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে, সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। সেখানে বক্তব্য রাখেন ফুলছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জিএম সেলিম পারভেজ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক আহম্মেদ রঞ্জু, ফুলছড়ি উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এটিএম রাশেদুজ্জামান রোকন প্রমুখ। এ সময় সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের পদত্যাগ দাবি করা হয়। বক্তারা বলেন, চক্রান্ত করে নির্বাচন বন্ধ করা হয়েছে। যা ভোট পড়েছে তার হিসাব করেই ফলাফল ঘোষণার দাবি জানান তারা। নির্বাচন বন্ধের প্রতিবাদে সাঘাটা উপজেলা পরিষদ চত্বরেও বিক্ষোভ করেছেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সংবাদ সম্মেলন : ফলাফল ঘোষণার দাবিতে গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বোনারপাড়ায় সাঘাটা উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহমুদ হাসান রিপন। তিনি বলেন, ‘এ উপনির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে প্রায় সারা দিন ভোট দিয়েছেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ হয়েছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ দেননি। বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক কারণ ছাড়াই নির্বাচন কমিশন বেশ কিছু কেন্দ্র্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করে, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। অজ্ঞাত কারণে কমিশন উপনির্বাচন বন্ধ ঘোষণা করেছে। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। যেসব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করে কমিশন, সেসবে জাতীয় পার্টির প্রার্থী পরিকল্পিতভাবে কাজটি করে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করেছেন। এটা ষড়যন্ত্র।’ প্রথম যে ৪৪টি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত করা হয় সেগুলো বাদে বাকি কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার দাবি জানান মাহমুদ হাসান রিপন।

এ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া গত ২৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর আসনটি শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।