বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ‘টাকা বন্ড’ ছাড়তে চায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বিশ^ব্যাংক গ্রুপের সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। টাকা বন্ড ইস্যু করতে ইতিমধ্যে উন্নয়ন সহযোগী এই দুই প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) অনাপত্তি পেয়েছে। এডিবি অফশোর টাকা লিঙ্কড বন্ড ও আইএফসি অনশোর টাকা বন্ড ছাড়তে চেয়েছে বলে এসইসি সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে এসইসির কমিশনার অধ্যাপক সামছুদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এডিবির অফশোর টাকা বন্ড ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ আইএফসির অনশোর টাকা বন্ড ইস্যুর বিষয়ে মতামত জানতে চেয়েছিল। এ সংক্রান্ত সিকিউরিটিজ আইন পরিপালন সাপেক্ষে আমরা অনাপত্তি দিয়েছি।
এডিবি ও আইএফসি টাকা বন্ড ইস্যুর প্রস্তাব দিলেও এর পরিমাণ কত, তা জানা যায়নি।
জানা গেছে, ২০২০ সালে দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অনশোর টাকা লিংকড বন্ড’ নামে একটি বন্ড ছাড়তে চায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। কিন্তু এতে ভ্যাট, ট্যাক্সের ইস্যু থাকায় পরে ২০২১ সালের ২৫ মে অফশোর টাকা বন্ড ইস্যুর প্রস্তাব দেয় সংস্থাটি। বৈদেশিক মুদ্রায় এ বন্ড ছেড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করবে তারা। বন্ড থেকে পাওয়া অর্থ টাকায় রূপান্তর করে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে সংস্থাটি। এ ব্যাপারে অনুমোদন চেয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) একাধিক চিঠি দেয় এডিবি। তবে এডিবির প্রস্তাবে এসইসি সম্মতি দিলেও সে সময় বৈদেশিক মুদ্রার অলস রিজার্ভ ও মুদ্রা বিনিময় হারের ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক বিপক্ষে মতামত দেয়।
এদিকে সম্প্রতি টাকা বন্ড ইস্যুর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. হাবিবুর রহমানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে আইএফসির বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার মার্টিন হোল্টম্যান। চিঠিতে ২০২১ সালে ১৭ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইআরডির সঙ্গে আইএফসির যোগাযোগের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রযোজ্য আইন, কর্তৃপক্ষের প্রবিধান, নিয়ম এবং সম্মতি সাপেক্ষে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাজারে টাকায় অনশোর ডিনোমিনেটেড বন্ড ইস্যু করার জন্য আইএফসিকে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর একটি অংশ আইপিও’র মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির কথাও বলা হয়েছে। তবে সেখানে আইএফসিকে অন-লেন্ডিংয়ের পাশাপাশি অফশোর এবং অনশোর মুদ্রা রূপান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো কর দিতে বলা হয়েছিল।
জানা গেছে, আইএফসির বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে অফশোর এবং অনশোর মুদ্রা রূপান্তরের অনুমতি, অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো কর প্রদান এবং মুদ্রার এক্সপোজার হেজিং (বৈদেশিক মুদ্রাজনিত ঝুঁকি প্রশমন) করার সক্ষমতাসহ বেশকিছু আইনগতসহ নীতিগত সমস্যা রয়েছে। যার কারণে সে সব সমস্যা সমাধানে এবং বৈদেশিক মুদ্রার অদলবদল ও ঝুঁকি প্রশমন সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার প্রয়োজনে একটি বৈঠকের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ইআরডিতে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এটা প্রতীয়মান হয় যে, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় এবং ঝুঁকি প্রশমন সম্পর্কে আরও ভালো বোঝার প্রয়োজন এবং আইএফসি দ্বারা স্থানীয় মুদ্রা-নির্ধারিত বন্ড ইস্যু করার ক্ষেত্রে কর মওকুফের মতো বিষয়গুলোতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার প্রয়োজন রয়েছে।
তাই আলোচনার মাধ্যমে আইএফসি তাদের ট্রেজারি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একটি বৈঠকের প্রস্তাব করেছে, যারা কর্মশালায় উপস্থিতির জন্য বাংলাদেশ সফর করবেন। কারণ আইএফসি ট্রেজারি বিশেষজ্ঞদের স্থানীয় মুদ্রার অনশোর বন্ড ইস্যুতে ভালো অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তারা বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাজারের উন্নয়ন সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত। এই প্রস্তাবটি যদি গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে, আইএফসি এগিয়ে যেতে চায় এবং একে-অপরের সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈঠকের ব্যবস্থা করতে চায়। আইএফসি এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের জন্য দৃঢ সমর্থনের প্রত্যাশা করছে, যা বিভিন্ন অগ্রাধিকার খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রাপ্যতা বাড়াতে এবং দেশীয় পুঁজিবাজারের বিকাশে সহায়তা করবে।
প্রসঙ্গত, লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে (এলএসই) প্রথমবারের মতো ২০১৯ সালের নভেম্বরে তালিকাভুক্ত ‘বাংলা বন্ডের’ মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান আইএফসি।