বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের শঙ্কা

৩৫ কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষের মুখে পড়তে পারে

বৈশ্বিক মন্দার কবলে পড়লে বিশে^র ৩৫ কোটি মানুষ খাদ্যসংকটে পড়বে। বর্তমানে ৪৮টি দেশের প্রায় চার কোটি মানুষ চরম খাদ্যসংকটে রয়েছে। এসবের মধ্যে কোস্টারিকা, বসনিয়া ও রুয়ান্ডার মানুষের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।

বিশ্বব্যাংক (ডব্লিউবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভায় সংস্থা দুটির প্রধান নির্বাহীরা এ কথা বলেছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সভ্যতা পেছনমুখী যাত্রা শুরু করবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। দেশে দেশে না খেয়ে মানুষ মারা যেতে পারে বলে অশনিসংকেত দিয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ। গত বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারওম্যান ক্রিস্তালিনা গিওর্র্গিয়েভা আলাদা সংবাদ সম্মেলন করে এই পূর্বাভাস দেন এবং আশঙ্কার কথা জানান।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক মনে করে, কোটি কোটি মানুষকে ক্ষুধার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার সব দরজা এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। কিন্তু সে জন্য দরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সংকটকালে অতিরিক্ত ঋণ দরকার হলে কোনো দেশকে সংকোচ বা ইতস্তত বোধ না করার আহ্বান জানিয়েছেন সংস্থা দুটির প্রধান নির্বাহীরা।

সংস্থা দুটি জানায়, করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মোড়ল দেশগুলোর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা বিশ^কে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে সংকটের প্রভাব পড়েছে ছোট-বড় অর্থনীতির প্রায় সব দেশে। এতে জ্বালানি তেলের চড়া দাম ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির ফলে খাদ্যঘাটতি তৈরি হবে।

প্লেনারি সেশনের আগের দিন লিখিত বক্তব্যে আইএমএফ এমডি : ক্রিস্তালিনা গিওর্র্গিয়েভা বলেন, ‘করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে না নিতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অনেক দেশে এরই মধ্যে মন্দাবস্থার সৃষ্টি করেছে। করোনার শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৯৩টি দেশকে ২৬০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে আইএমএফ।’ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত-সম্পর্কিত আরেকটি তহবিল থেকে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য ৪০ বিলিয়ন ডলার জোগাড় করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। গিওর্গিয়েভা বলেন, ‘ঋণ দেওয়ার মতো আরও ৭০০ বিলিয়ন ডলার আছে আইএমএফের কাছে।’ 

বিশ্বব্যাংকপ্রধান ডেভিড ম্যালপাস বলেন, ‘জ্বালানি সংকট আগামী দিনের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ঠিক করবে। সংকট সামাল দিতে তাই মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সতর্ক সমন্বয় দরকার।’

বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস বলেন, ‘২০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে যাত্রা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি বড় দাতা দেশের সহযোগিতা এবং ঋণের কিস্তি থেকে আয় সব মিলে এখন ব্যাংকটির ঋণযোগ্য তহবিলের পরিমাণ ৮০০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে।’ তিনি বলেন, ‘ঋণ দিয়ে এবং ঋণের বোঝা কমিয়ে সদস্যদের স্বস্তি জোগানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’

ডেভিড ম্যালপাস বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রায় চার কোটি মানুষ ইতিমধ্যে হতদরিদ্রের কাতারে নেমে গেছে, সংখ্যাটি বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতিকে মহামন্দার কাছাকাছি পরিস্থিতি বলছি আমরা। এসব কিছুর মূলে রয়েছে জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ।’

ম্যালপাস বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থপ্রবাহ কমায় মানুষের হাতে অর্থপ্রবাহ কমেছে। আমাদের এখন গরিবের জন্য চিন্তা করতে হবে। হতাশার কথা হলো, সম্পদ বা মূলধন মুষ্টিমেয় কিছু দেশে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সেখান থেকে সহায়তা বা ঋণ যে নামেই হোক, পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর জন্য বরাদ্দ করতে হবে। বিশ্বব্যাংকও তাদের সহযোগিতা দেওয়া অব্যাহত রাখবে।’

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েক মাস ধরে বৈশি^ক মন্দার আভাস দিচ্ছেন এবং নিজের দেশকে সতর্ক অবস্থানে রাখছেন। এবারের বার্ষিক সম্মেলনে বিশ^ মহামন্দার পূর্বাভাস দিয়ে সতর্ক করল বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ। 

১৯৩টি সদস্য দেশের অর্থমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা যোগ দিয়েছেন বার্ষিক সম্মেলনে। ১০ অক্টোবর শুরু হওয়া সম্মেলন শেষ হবে ১৬ অক্টোবর।