বাম জোটের সভায় বক্তারা

বর্তমান কমিশন দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়

বর্তমান নির্বাচন কমিশন দিয়ে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। আগামী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে বর্তমান সরকারের পদত্যাগ করতে হবে।  নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তদারকি সরকার গঠন, নতুন করে নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন এবং সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি। এই দাবিতে গণআন্দোলন গড়ে তুলে দাবি আদায় করা হবে।

গতকাল শনিবার পুরানা পল্টন মুক্তি ভবনে বাম গণতান্ত্রিক জোট আয়োজিত ‘সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিসহ নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার-সুষ্ঠু নির্বাচন ও নির্দলীয় তদারিক সরকার’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

লিখিত বক্তব্যে বাম জোটের সমন্বয়ক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ৫১ বছরে এদেশে বহুবার সরকার বদল হলেও দেশে এখনো অবাধ, নিরপেক্ষ, প্রতিনিধিত্বশীল ও অর্থবহ নির্বাচনের স্থায়ী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যারাই যখন ক্ষমতায় এসেছে, তারাই ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য নির্বাচনের নামে প্রহসন করেছে। মানুষের ন্যূনতম ভোটের গণতান্ত্রিক অধিকার ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অনিশ্চয়তা, অচলাবস্থা ও নৈরাজ্য। এমতাবস্থায় আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের জন্য সুনির্দিষ্ট কতক বিষয় আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই। বর্তমান নির্বাচন কমিশন দিয়েও সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন বর্তমান জাতীয় সংসদ বহাল রেখে সকল দল ও জনগণের জন্য নির্বাচনের সমান সুযোগও তৈরি হবে না। তাই দ্বাদশ জাতীয় সংসদের তফসিল ঘোষণার আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে বর্তমান সরকারের পদত্যাগ করতে হবে। সকল দল ও সমাজের অপরাপর অংশের মানুষের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তদারকি সরকার গঠন, নতুন করে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, যা আজ গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।

ইভিএম নিয়ে তিনি বলেন, ইভিএম বিতর্কিত এবং অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ইভিএম ব্যবহারের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ইভিএমে ভোট কারচুপির সুযোগ থেকেই যায়। সারা বিশ্বের অভিজ্ঞতা ও দেশের মানুষের বাস্তবতা বিবেচনা করে আমরা মনে করি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।

সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে সকলের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা। অথচ দেশে আজও গণতন্ত্র নেই। জনগণের ভোটাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। দলীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচনে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ইভিএম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কারচুপি করার জন্য ইভিএম একটি সহায়ক পদ্ধতি, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আপনি যদি ফল নিয়ে চ্যালেঞ্জ করেন তার বিপরীতে পরীক্ষা করার জন্য কোনো ব্যবস্থা এ পদ্ধতিতে থাকে না, যার কারণে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্বারা ফল প্রভাবিত করা খুবই সহজ হয়ে যায়।

গাইবান্ধা উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশনকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথমবারের মতো সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ বাতিল করেছে। এই ইতিহাস সৃষ্টি করার জন্য আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন গাইবান্ধা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো জিনিস প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। তারা বলার চেষ্টা করেছে ইভিএম কোনো সমস্যা না। সমস্যা হলো ডাকাত, যারা কেন্দ্র দখল করেছে। তার মানে তারা একটা বিষয় পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, সেটা ইভিএম। 

ঐক্য ন্যাপের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট এস এম এ সবুর বলেন, সরকার যেকোনো পন্থায় ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছে। মানুষের ভোটের অধিকার যদি নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সার্থকতাই তো বিফলে যাবে। জনগণের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে।

বাংলাদেশ জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, ২০১৪ বা ২০১৮ সালে যে নির্বাচন হয়েছে তাতে নির্বাচনের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে গেছে। ৯০’র গণঅভ্যুত্থানের পর যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়েছিল, পরে যে কথা বলে এটি বাতিল করা হলোতা আজ গ্রহণযোগ্য নয়।

সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, আমরা বাম জোট দীর্ঘদিন ধরে এ নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছি। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে না। সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন সরকার লাগবে। এই দাবিতে গণআন্দোলন, গণসংগ্রাম গড়ে তুলে দাবি আদায় করতে হবে।

বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক রুহিন হোসেন প্রিন্সের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, বাসদের (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মাসুদ রানা, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম সবুজ প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী, সিপিবির সহ-সাধারণ সম্পাদক মিহির ঘোষ, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. দিবালোক সিংহ, আনোয়ার হোসেন রেজা, আহসান হাবিব লাবলু, বাসদের জুলফিকার আলী, কমিউনিস্ট লীগের ডা. হারুন অর রশিদ প্রমুখ।