পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার কথা জানিয়ে গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ স্থগিত ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এ ঘটনায় জাতীয় নির্বাচনের আগে ফের আলোচনায় আস্থা সংকটে থাকা নির্বাচন কমিশন। এসব নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সহ-সম্পাদক সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : সাম্প্রতিক অতীতে অনিয়ম ও সংঘাতে দুই/একটি ভোট কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বাতিল হতে দেখেছি। কিন্তু এবার গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার তাৎপর্য কী?
আলী ইমাম মজুমদার : সব কিছুরই একটি প্রথম থাকে তো। আগে হয়নি, আগে তারা করেনি কিন্তু কমিশন এবার করেছে আমি এটার প্রশংসা করি যে তারা এটা পেরেছে। আশা করব যে ভবিষ্যতে তাদের এ ধরনের দৃঢ়তা অব্যাহত থাকবে।
দেশ রূপান্তর : ভোটের সময় গোপন কক্ষে আগে থেকে লোক থাকাসহ অনুপ্রবেশের অভিযোগ পাওয়া গেছে আগেও। কিন্তু এবারই দেখলাম যে এ ধরনের ঘটনা সিসি ক্যামেরায় চাক্ষুষ করে ইসি ভোটগ্রহণ বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত নিল। সিসি ক্যামেরা না থাকলে কী হতো তা আমরা আগে দেখেছি। এ ক্ষেত্রে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনাসহ ইসির পরিকল্পনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতার কোনো ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন কি?
আলী ইমাম মজুমদার : এখানে দক্ষতা না আমি কমিটমেন্টের ঘাটতি দেখছি। এখানে প্রথম কথা হলো নির্বাচন কমিশন বলে আসছিল যে তাদের কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলে নির্বাচন পক্ষপাতদুষ্ট হবে না। এবার কিন্তু যে রিটার্নিং অফিসার এবং দুজন অ্যাসিসটেন্ট রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তারা সবাই নির্বাচন কমিশনের লোক। ভোটকেন্দ্রে যে প্রিসাইডিং অফিসার এবং অ্যাসিসটেন্ট প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার তারা রিটার্নিং অফিসারের নির্দেশে কাজ করেন। এখন অন্যদের যে আমরা দোষারোপ করব কোনো ভোটকেন্দ্রে প্রথম দায়িত্ব প্রিসাইডিং অফিসারের, কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না সেটা প্রথমত তিনি দেখবেন। তিনি অনিয়মে বাধা দিতে গেলে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হলে কেন্দ্রে মোতায়েন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ডাকবেন, তাতেও না হলে রিজার্ভ বা স্ট্রাইকিং ফোর্স ডাকবেন। কিন্তু কোথাও তারা এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছেন সেটা শুনিনি। সুতরাং, এখানে সিস্টেমটাই কাজ করেনি।
দেশ রূপান্তর : প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পরদিন সাংবাদিকদের বলেছেন, কোনো কোনো প্রিসাইডিং অফিসার ভোটগ্রহণ বন্ধের নির্দেশ মানছিলেন না। এই বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
আলী ইমাম মজুমদার : আসলে বহুদিন পর ব্যাপারটা হয়েছে তো, এতদিন তো সব এক সুরে চলছিল। কেন্দ্র থেকে শুরু করে ইসি পর্যন্ত, সব এক সুরে চলছিল। এবারই একটু ভিন্ন সুর এলো। ইসির হাতে তাদের কথা শোনানোর জন্য আইনানুগ যে ক্ষমতা আছে, সে অনুযায়ী তারা পদক্ষেপ নিতে পারে।
দেশ রূপান্তর : কিছুদিন আগে জেলা পরিষদ নির্বাচন উপলক্ষে দেশের ৬১ জেলার ডিসি ও পুলিশ সুপারদের সঙ্গে সভায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বাগ্বিত-াকে কীভাবে দেখছেন?
আলী ইমাম মজুমদার : একটা সভার মধ্যে সেখানে সিনিয়র-জুনিয়রের ব্যাপারটা বড় করে দেখা হচ্ছে, আমি সেভাবে দেখি না। এখানে যারা মাঠ পর্যায় থেকে আসছেন তারা তাদের সমস্যাদি এবং চাহিদা কমিশনের কাছে তুলে ধরতে পারেন। সেটা অবশ্যই প্রয়োজন এবং শৃঙ্খলার সঙ্গে হতে হবে। কিন্তু যেটুকু পত্র-পত্রিকায় এসেছে, আমি যতটুকু দেখেছি তাতে আমি মর্মাহত হয়েছি। সেখানে সৌজন্যেরও ঘাটতি হয়েছে, শৃঙ্খলারও ঘাটতি রয়েছে। তবে আমি বিস্মত হইনি। বিস্মিত হইনি এ কারণে যে, এইসব অফিসারদেরই অথবা তাদের সহকর্মীদেরই এতদিন ব্যবহার করা হয়েছে ভোটকেন্দ্রে সিল মারার জন্য। তারা এগুলোই করে আসছে এতদিন। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা যেটা বিশেষ করে নির্বাচনভুক্ত, সেটা একেবারে ভেঙে পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ব... আমরা যখন রিটার্নিং অফিসার ছিলাম, আমরা যখন নির্বাচন করতাম, আমরা নির্বাচন কমিশন নিয়ে আতঙ্কে থাকতাম। তারা আমার কোন ভুল ধরবে আর আমার চাকরি চলে যাবে কিনা, প্রমোশন আটকে যাবে কিনা টেনশনে থাকতাম। কিন্তু এখন কোনো সিরিয়াসনেস নেই। আগেরগুলো বাদ দিলেও এর আগের দুই নির্বাচনে কমিশনের যে আচরণ, ভোট দেওয়ার যে প্রক্রিয়া বা মধ্যরাতে ভোট দেওয়ার কথা যে বলা হয় এগুলো কিন্তু ইসি আগে না জানলেও অন্তত পরদিন জানতে পেরেছে, কিন্তু গাইবান্ধায় যেভাবে নির্বাচন বাতিল করা হলো সেভাবে পরদিন তো ওই নির্বাচনগুলোও বাতিল করা যেতে পারত। তাহলে সবাই ইসিকে সিরিয়াসলি নিত, কিন্তু ইসিকে কেউ সিরিয়াসলি নিচ্ছে না। কারণ তাদের আচরণই বলে যে ইসিকে সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই। পরিস্থিতিটা গত ১০/১২ বছরে ধীরে ধীরে এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে।
দেশ রূপান্তর : ওই সভায় পুলিশ কর্মকর্তারাও তো এমপিদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা সামলাতে না পারার কথা বলে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
আলী ইমাম মজুমদার : এ ক্ষেত্রে তো ইলেকশন কমিশনকে অগ্রসর হতে হবে। স্থানীয় নির্বাচনে এমপিদের আচরণবিধি ভঙ্গের একাধিক নিউজ আসছে। এমপিদের নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনায় ইসির আইন আনুযায়ী শাস্তি প্রদানের পদক্ষেপ নিতে হবে। কুমিল্লার ঘটনায় বোধহয় এমপিকে সতর্ক করে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারপর? এখন রোগ হিসেবে তো ওষুধ দিতে হবে। ছোট জ¦রটর হলে প্যারাসিটামল খাবেন কিন্তু ক্যানসারে তো আর প্যারাসিটামলে হবে না। এখানে ব্যাধি অনেক বড়, সে অনুযায়ী ওষুধ দিতে হবে।
দেশ রূপান্তর : নতুন ইসির অধীনে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। অথচ কমিশন যথেষ্ট কঠোর হতে পারেনি। নির্বাচনী আইনেও অনিয়ম ও আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনায় ইসির শান্তি প্রদানের বিষয়টা স্পষ্ট না। করণীয় কী?
আলী ইমাম মজুমদার : নির্বাচনী আচরণবিধি আইনের ভেতরে এটা থাকার কথা। যেহেতু আচরণবিধি আছে সেহেতু আচরণবিধি ভঙ্গের শাস্তির বিধানও থাকার কথা। এই মুহূর্তে নির্বাচনী আচরণবিধি আইন না দেখে বলতে পারছি না। যদি না থাকে তাহলে অসম্পূর্ণ আইন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অগ্রসর হওয়া ঠিক না। সেক্ষেত্রে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা তাদের আছে। আইনে কোনো অসম্পূর্ণতা থাকলে সেটা পূরণ করে নিয়েই ইসিকে আগাতে হবে।
দেশ রূপান্তর : নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ কি দেখতে পাচ্ছেন?
আলী ইমাম মজুমদার : সংবাদমাধ্যমে যতটুকু দেখি তাতে মনে হয় আমাদের বিভিন্ন সহযোগী দেশ বিশেষ করে পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক দেশগুলো এ ব্যাপারে খুব কনসার্ন মনে হয়েছে। এদেশে যাতে মানবাধিকার যথাযথভাবে রক্ষিত হয়, আগামী জাতীয় নির্বাচন যাতে আন্তর্জাতিক মানের হয়, এগুলো নিয়ে তারা পরিষ্কারভাবে সচেতন। বিশেষ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন রাষ্ট্রদূত এ ব্যাপারে কথা বলেছেন। তাদের সঙ্গে আমরা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে যেমন সম্পর্কিত, তেমনি তাদের সঙ্গে আমাদের অনেক বাণিজ্যিক সম্পর্কও আছে। বাণিজ্যিক সম্পর্কটা অনেকাংশেই একমুখী। আমরা বিক্রেতা, তারা ক্রেতা। তাছাড়া তারা তো খারাপ কিছু বলছে না। ফলে নির্বাচন নিয়ে তাদের এসব কথাবার্তাকে ইগনোর না করার মতো বাস্তবতাও রয়েছে।
দেশ রূপান্তর : বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের কাছে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঔপনিবেশিক মানসিকতা বলে মন্তব্য করেছেন। আপনার মত কী?
আলী ইমাম মজুমদার : তাদের দল যখন বিরোধী দলে ছিল তখন তারা সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কমনওয়েলথ থেকে দুজন প্রতিনিধি নিয়ে এসেছিলেন। তারাও করেছেন আর এখন যারা বিরোধী দলে আছেন তারা করছেন। কেউ তো বাকি রাখেননি বিদেশিদের কাছে যেতে। আজকের পৃথিবীতে কোনো ব্যাপারই বিচ্ছিন্ন না। সবাই একে অপরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ফলে আমাদের কোনো ব্যাপারে তারা ন্যায়সংগত পরামর্শ দিলে, সেটা শোনা যাবে না আবার পরামর্শ দিলেই তার ষোলো আনাই মেনে নেব এমন কোনো কথা নেই। যেটা ন্যায্য সেটা শুনব না, এটা তো ঠিক না। তাদের সঙ্গে কথা বলব না, এটাও ঠিক না।
দেশ রূপান্তর : গাইবান্ধার ঘটনার শিক্ষা নিয়ে ইসি কি এবার আস্থার সংকট কাটাতে পারবে বলে মনে করেন?
আলী ইমাম মজুমদার : এটা তো সবে মাত্র শুরু। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে কমিশন পর্যবেক্ষণ করেছে একটি আসনে নির্বাচনের কয়েকটি কেন্দ্র। এখন জাতীয় নির্বাচন হবে একই দিনে ৩০০ আসনে। এতগুলো আসনের সবগুলো ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা বসানো সম্ভব কি না আর সেগুলো যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব কি না এটা কমিশনের চিন্তা করতে হবে। আমার বিবেচনায় এটা সম্ভব না। এছাড়া, গাইবান্ধার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছিল ৩ হাজার। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে সারা দেশে একদিনেই যেহেতু ভোট হয়, সেহেতু গোটা দেশের সবগুলো আসনে ৫০০ করে জনবল নিয়োগ দেওয়াও কঠিন। সুতরাং আমি যেটা মনে করি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আমরা যখন নির্বাচন করেছি তখন এইভাবে জনবলেরও দরকার হয়নি, ঢাকা থেকে সিসিটিভি ক্যামেরায় পর্যবেক্ষণেরও দরকার হয়নি। কিন্তু সেগুলো কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : ইসির প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
আলী ইমাম মজুমদার : তারা প্রথমত আস্থা অর্জনের চেষ্টা করুক। শুধু ইভিএমে যে সুষ্ঠুভাবে ভোট হয় না, এটা তো গাইবান্ধায় প্রমাণিত; পেছনের মানুষগুলোই গুরুত্বপূর্ণ সিইসিও বারবার এ-কথাটা বলেছেন। সেজন্য ইভিএম মেশিনের প্রজেক্টে ৮/১০ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হবে, এর যৌক্তিকতা কী! এরপর, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অমুক কথা শুনল না, তমুক দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করল না এগুলো সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে, যদি নির্বাচনকালীন এমন একটা সরকার হয় যে সরকার নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না, তাহলে কিন্তু সবার নির্বাচন কমিশনের কথা শুনতে হবে।