মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার পর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অভিযান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। মশক নিধনের দায়িত্বে থাকা করপোরেশনের অভিযানের রুটিনগুলো দেখলেও তেমন চিত্র পাওয়া যায়। যখন এডিস মশার উৎপাত বেড়ে যায় তখনই নড়েচড়ে বসে সিটি করপোরেশন। ঢাকঢোল পিটিয়ে অভিযান চালানো হলেও এর সুফল আসে খুব কম। আবার এমন অনেক এলাকা আছে যেখানে মাসের পর মাস পার হলেও মশক নিধনকর্মীদের চোখে দেখেন না সংশ্লিষ্ট বাসিন্দরা। তবে সিটি করপোরেশন কর্মকর্তাদের দাবি, সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে কোনোভাবে মশক নিধন সম্ভব না। কারণ এডিস মশা মানুষের বাড়ির ভেতরে জন্ম নেয়। আর সিটি করপোরেশন কারও বাড়ি পরিষ্কার করতে পারবে না। তাই ব্যক্তি পর্যায়ে জনসচেতনতা খুব জরুরি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা লে. কর্নেল গোলাম মোস্তফা সারওয়ার গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার মূলত বৃষ্টির কারণেই মশার উৎপাত বা মশাবাহিত রোগ বেড়েছে। আমরা মঙ্গলবার থেকে বড় আকারে অভিযান পরিচালনা করব।’
মাঠে কেমন মশক নিধনকর্মী কাজ করছে এমন এক প্রশ্নের জনাবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের মাঠে আউটসোর্সিং ৫৪০ জন আর নতুন ৩৬ জন মিলে সর্বমোট কর্মী আছে ৯০০-এর মতো। তাদের দিয়ে ৫৪টি ওয়ার্ডে মশক নিধন করতে খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। তাই লোকবলের অভাব আছে সেটা আমরা বলতে পারছি না।’
অভিযান নিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, জনসচেতনতা আমরা লক্ষ করছি। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কোনো একটা সংস্থা এককভাবে কোনো দেশে পারবে না। কারণ এটা বাড়ির ভেতরে হয়। তাই মানুষের বাড়ির ভেতরে তো আমরা পরিষ্কার করতে পারব না। গত সপ্তাহেও দক্ষিণখানে গিয়ে যা অবস্থা দেখতে পেলাম তা স্থানীয় লোকজনকে দেখিয়েছি। ফলে নিজেরা সচেতন না হলে খুব কঠিন সব ঠিকঠাক করা। নির্মাণাধীন ভবনের বিষয়েও আমরা অংশীজনের সঙ্গে সভা করেছি। কিছু সুফল পেয়েছি। আর যারা এখনো এ বিষয়ে গাফিলতি করছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
সূত্রে জানা যায়, গতকাল রবিবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে রেকর্ড ৮৫৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৪৭ জনে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৯৪ জনের মৃত্যু হলো। এরমধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নতুন ভর্তি হওয়াদের মধ্যে ৫২৩ জন ঢাকার বাসিন্দা। ঢাকার বাইরে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৩২ জন। বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১ হাজার ৯৫৭ জন।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, গতকাল রবিবার থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫টি ওয়ার্ডে বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এডিস মশার প্রজননস্থল নির্মূল ও ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে এই চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে। গতকাল দক্ষিণ সিটির ৬ নম্বর, ১৭ অক্টোবর ২ নম্বর, ১৮ অক্টোবর ৩ নম্বর, ১৯ অক্টোবর ৫৬ নম্বর এবং ২০ অক্টোবর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে দিনব্যাপী এসব বিশেষ চিরুনি অভিযানের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এ অভিযানে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে সকালের লার্ভিসাইডিং কার্যক্রমে ১৩ জন ও বিকালের এডাল্টিসাইডিং কার্যক্রমে ১৩ জন মশক নিধনকর্মী অংশ নিয়েছেন। নিজ নিজ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এই কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
কীটতত্ত্ববিদরা জানান, বাংলাদেশে ১২৩ প্রজাতির মশার রেকর্ড রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ১৪ প্রজাতির মশা পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে কিউলেক্স, এডিস, অ্যানোফিলিস, আর্মিজেরিস, ম্যানসোনিয় ও টস্কোরিনকাইটিস অন্যতম। মশার উৎপত্তিস্থল যথাযথভাবে ধ্বংস না করলে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলেও মতামত দেন সংশ্লিষ্টরা।