১লা কার্তিক ১২৯৭। বাউল সাধক ফকির লালন শাহ'র তিরোধান দিবস। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, লালন একাডেমি ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়াতে ১৩২তম তিরোধান দিবস পালনে আয়োজিত তিনদিনের অনুষ্ঠানের প্রথম দিন সোমবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে আখড়াবাড়ি সংলগ্ন কালীগঙ্গা নদীর মাঠে।
তবে প্রচলিত আনুষ্ঠানিক আয়োজনের বাইরে প্রিয় এই মহামানবের ওফাত দিবসকে ঘিরে প্রতি বছরই ভক্ত আশেকান অনুসারীরা ছুটে আসেন সাঁইজির এই তীর্থধামে। পরম গুরুভক্তির আস্বাদনে গানের বানীতে তৃষ্ণার্ত ও অস্থির আত্মার শান্তি পাওয়ার টানে ছুটে এসেছেন তারা। প্রতিক্ষীত এই দিনটিতে সাইজির বাণীর পরশ পাওয়ার ব্যাকুল বাসনায় দুই একদিন আগেই ছেউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে ঠাঁই নিয়েছেন তারা। নিজেদের ঘরানায় ছোট ছোট মজমা করে আত্মস্থ বাণীগুলি একে অন্যের সাথে বিনিময় করে থাকেন গানের মাধ্যমে। ‘হাওয়া দমে দেখনা রে তার আসল ব্যানা, কে বানাইলো এমন রঙমহল খানা’ দোতারা হাতে লালন শাহের মাজার মিলনায়তনে বসে আসর জমিয়েছেন আগত লালন ভক্ত বাউল অনুসারীরা। শতাধিক উৎসুক দর্শক শ্রোতা কেউবা বসে কেউবা দাঁড়িয়ে শুনছেন এসব বাউল গান।
এসময় সেখানে দেখা হয় লালন অনুসারী ফকির মহরম শাহয়ের সাথে। দেশ রূপান্তরকে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হন তিনি। তার সঙ্গে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হাসান আলী।
হাসান আলী: ‘হাওয়া দমে দেখনা রে তার আসল ব্যানা’ সাঁইজির এই বাণীতে কি বলতে চেয়েছেন?
ফকির মহরম শাহ: মানুষ যে বেঁচে আছে তার প্রমাণ হলো- প্রতিক্ষনে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে অক্সিজেন নিতে পারছে এটাই তার প্রাণের অস্তিত্ত্ব। তাহলে এই যে বেঁচে আছে মানুষ কিভাবে? কোন কারিগরি কায়দায় এই দেহঘরি তৈরি হয়েছে? কোন যন্ত্রের সাহায্যে এই ঘড়ি চলছে, কিভাবে চলছে? কতক্ষণ চলবে? এর কারিগরই বা কে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে, জানতে হবে।
হাসান আলী: সাঁইজির কালাম বা বাণীগুলি বোঝার সহজ উপায় কী?
ফকির মহরম শাহ: সাঁইজি বলেছেন, সহজ মানুষ ভইজে দ্যাখ নারে মন দিব্যজ্ঞানে। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড, দিন রাত, জন্ম-মৃত্যু যেমন শ্বাস্বত: দিবালোকের মতো চিরসত্য। তেমনি মানুষ জন্মগত ভাবেই তার মধ্যে দিব্যজ্ঞান নিয়েই পৃথিবীতে আসে। কিন্তু জগৎ সংসারের নানা জটিলতার মাঝে ডুবে যাওয়ার কারণে তার দিব্যজ্ঞানের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। এইডা যদি সে বুঝতে পারে যে, ওরে বাবা তার মাঝেও তো আলোর দ্যুতি রয়েছে। তবে কেন অন্ধকারে ঘুইরে মরে? সেই জন্যই বেশী বেশী দরকার সাধুসঙ্গ। সাধু হলেন তিনি যিনি দিব্যজ্ঞানের ভাণ্ডার। ওই যে বলে না, সৎসঙ্গে স্বর্গবাস অসৎসঙ্গে সর্বনাশ
হাসান আলী: সাঁইজির বাণীই কীভাবে আত্মার শান্তি দিতে পারে?
ফকির মহরম শাহ: দেখেন, ক্ষুধার্ত মানুষ যেমন খাবার খাওয়া তাগিদ বোঝে? ঠিক তেমনি অশান্ত আত্মার যন্ত্রণা যদি কাউকে তাইড়ি বেড়াই তালি সেই জগৎ সংসারের মায়া ছাইরি শান্তির খোঁজে দিক-বিদ্বিক ছুটে বেড়াবে। যে কোথায় গেলে পাবো তারে? তাইতো সাঁইজি বলেছেন, ‘লালন মরল জল পিপাসায় থাকতে নদী মেঘনা, হাতের কাছে ভরা কলস তবু তৃষ্ণা মেটে না’। এই যে ক্ষুধার যন্ত্রণা যার আছে সেই বুঝবে সাঁইজির কালাম হৃদয়ে ধারণ ও তা বৈষয়িক জীবনে পালনের মধ্যদিয়ে কিভাবে আত্মার শান্তি খুঁজে পায়।
হাসান আলী: আরও বেশি মানুষের মাঝে লালনের বাণী কিভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়?
ফকির মহরম শাহ: দেখেন এই ভেগ বা লেবাসধারী নয়; শুধু মুখে বলবেন সাধুর বাণী কিন্তু হৃদয় ভরা অন্ধকার এসব লোকদের দিয়ে তো এসব হবে না। প্রকৃতঅর্থে এই কালাম ধারণ করে নিজের উপলব্ধির উদয় ঘটাতে হবে। তারপর না সে ভক্ত আশেকানদের মাধ্যমে বেশি বেশি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে। যতবেশি মানুষ সাঁইজির কালাম মনে প্রাণে ধারণ করতে পারবে ততবেশি মানব সমাজের অস্থিরতার পথ রুদ্ধ হবে। এই যে মানুষে মানুষে, ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত, গোত্র ভেদে যে হানাহানি এখান থেকে গুরু বাণীর দীক্ষা হতে পারে মুক্তির নিশানা। আপনেরা দেখতেই পান অনেক বড় বড় ডিগ্রিধারী শিক্ষিতজনদের মধ্যেও এখন সাঁইজির দর্শন আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। তিনি তো উনাদের মতো এতো বড় শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। তবুও কীভাবে তিনি দিন দুনিয়ার দর্শন জগতে ঢুকতে পেরেছিলেন?