নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয়

উপকূলীয় চরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছিন্নমূল, অসহায়, দরিদ্র মানুষকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এ ধরনের জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে ‘উপকূলীয় চরাঞ্চলে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’ শুরু হয়েছে। প্রকল্পটি শেষ হবে ২০২৩ সালের ৩০ জুন। কিন্তু ৪ বছর ৩ মাসে কাজ শেষ হয়েছে ৭৭ শতাংশের কিছু বেশি। প্রতি বছর কাজের অগ্রগতির হার গড়ে ১৮ শতাংশ। হাতে আছে আর মাত্র ৯ মাস। এ সময়ে বাকি ২৩ শতাংশ কাজ শেষ করতে হবে। এতে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

তবে প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. এস এম জিয়াউল হক রাহাতের দাবি, এ প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ৭৭ শতাংশের বেশি। প্রকল্পটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ হবে। এমনকি ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ এ দুই অর্থবছরে প্রকল্প শেষ করেও সরকারের প্রায় ১০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া যাবে। শুধু একটি দরপত্রে ২ কোটি ২২ লাখ টাকার বেশি খরচ কমানো সম্ভব হয়েছে।

উপকূলীয় চরাঞ্চলে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্যমতে, প্রকল্পটি বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের ২০টি উপকূলীয় উপজেলার ১০৯টি ইউনিয়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মাধ্যমে ছিন্নমূল, অসহায়, দরিদ্র মানুষের তালিকা করে বিনামূল্যে হাঁস, মুরগি, ভেড়া ও কবুতর প্রদান করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিয়নে ৫০০ জন করে মোট ৫৪ হাজার ৫০০ জন সুফলভোগী রয়েছে। এদের মধ্যে ৪৯ হাজার ৫০ জনই নারী। ইতিমধ্যে নির্ধারিত বরাদ্দের চেয়ে আরও ১৯ কোটি টাকার চাহিদাপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

বেসলাইন সার্ভের মাধ্যমে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের সার্বিক তত্ত্বাবধানে প্রকৃত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছিন্নমূল, অসহায়, দরিদ্র মানুষের তালিকা করা হয়েছে। ডা. এস এম জিয়াউল হক রাহাত বলেন, প্রকল্পটি সরাসরি উপকূলীয় চরাঞ্চলের মানুষকে বিশেষ করে নারীদের প্রশিক্ষণ ও বিনামূল্যে ২০টি করে হাঁস বা ২০টি করে মুরগি বা ৩টি করে ভেড়া, হাঁস-মুরগির খাদ্য, শেড, মেডিসিন ও ভ্যাকসিন বিতরণ করেছে। একজন সুফলভোগীকে মুরগি কিংবা হাঁস দিতে গিয়ে সরকারে মোট খরচ হয়েছে ২৫ হাজার ২৫০ টাকার বেশি। ভেড়া যারা পেয়েছেন তাদের প্রতিজনে সরকারের খরচ হয়েছে ৩৮ হাজার ৩৫০ টাকার বেশি। এমনকি যারা এখন এই তালিকায় আছেন, এই প্রশিক্ষণ পায়নি তারা সবাই প্রকল্প শেষ হওয়ার আগে সব সুবিধা পাবেন।

সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যমতে, প্রথম সংশোধনীতে জিওবি প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে ২০১৮-১৯ সাল ও ২০১৯-২০ সালে ক্রমপুঞ্জীভূত ব্যয় রাজস্ব ছিল ৩২ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বেশি এবং মূলধন ৩০ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে ২০২১-২২ এডিপি বরাদ্দ দেয় ২৫ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ বরাদ্দ রয়েছে ৪০ কোটি টাকা।

কর্মকর্তারা বলেন, প্রকল্পটি ঘরে বসে হাঁস, মুরগি ও ভেড়া পালন করে পরিবারের উন্নতি তথা গ্রামীণ অর্থনীতি সমৃদ্ধ করতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। এতে নারীর ক্ষমতায়ন, চরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের বেকারত্ব মোচন ও গুণগত পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে মেধাবী জনগোষ্ঠী গঠনে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক ইউনিয়নের হাঁস পালন গ্রুপের সুফলভোগী ফেরদৌস আক্তার বলেন, ‘প্রকল্প থেকে ২০টি হাঁস পেয়েছি। তারপর এই ২০টি হাঁস থেকে এ পর্যন্ত ৮০০টি হাঁস হয়েছে। প্রতিদিন ৫ শতাধিক ডিম পাড়ে। এ থেকে প্রতিদিন আয় হয় ৫ হাজার টাকার বেশি। এ পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকার ডিম বিক্রি করেছি।’

লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর উপজেলার চর কাজল ইউনিয়নে হাঁস পালন গ্রুপের সুফলভোগী কাজল মিয়া বলেন, ‘তিন দিনের প্রশিক্ষণ শেষে প্রকল্প প্রদত্ত শেড, খাদ্য, মেডিসিন-ভ্যাকসিন ও ২০টি হাঁস দিয়ে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ১০০টি ডিম বিক্রি করেছি। হাঁস পালন করেই এখন সংসার চলছে।’ একই উপজেলার মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘প্রশিক্ষণ শেষে ৩টি ভেড়া পেয়েছিলাম। এ থেকে ১৩টি ভেড়া হয়েছে। পারিবারিক প্রয়োজনে ৩টি ভেড়া বিক্রি করেছি।’ রামগতি উপজেলার মোকামিয়া ইউনিয়নের ভেড়া পালন গ্রুপের সুফলভোগী এনামুল হক বলেন, ‘গত কোরবানিতে ২টি ভেড়া বিক্রি করেছি ১৬ হাজার টাকায়। এ টাকা দিয়ে ঘর মেরামত ও বাচ্চাদের লেখাপড়ায় খরচ করেছি।’

ডা. এস এম জিয়াউল হক রাহাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই প্রকল্প ওই এলাকার নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উপকূলীয় চরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এতে উপকূলীয় চরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করেছে।