অস্টিওপোরোসিস রোগের উপসর্গ ও চিকিৎসা

অস্টিওপোরোসিস হলো হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ। হাড়ে ক্যালসিয়ামের ঘনত্ব বা পরিমাণ কমে স্বাভাবিক গঠন নষ্ট ও হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায়। একপর্যায়ে কোমরের হাড়, মেরুদণ্ড ও হাতের কবজির হাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আগেই সতর্ক ব্যবস্থা নিলে অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ করা যায়। নারীদের মেনোপজ-পরবর্তীতে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। পুরুষের তুলনায় নারীদের এ রোগে আক্রান্তের হার বেশি।

কারণ: অস্টিওপোরোসিস হওয়ার পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। শৈশবে হাড় গঠনের সময় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়ামের অভাবে হাড়ের স্বাভাবিক গঠন বাধাপ্রাপ্ত হয়। এছাড়া হাড় গঠনে কিছুটা পারিবারিক প্রভাবও রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে ব্যায়ামের অভ্যাস ও দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্যালসিয়াম গ্রহণের ওপরও হাড়ের গঠন অনেকাংশে নির্ভর করে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কিছু রোগ ও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও হাড় ক্ষয় বা অস্টিওপোরোসিস হতে পারে।

উপসর্গ: কোনো উপসর্গ ছাড়াই মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। প্রাথমিক ধাপে এর কোনো লক্ষণ দেখা যায় না; বরং হাড় ভাঙার মাধ্যমেই এর উপস্থিতি প্রথমবারের মতো টের পাওয়া যায়। এই রোগে রোগীর অস্থি বা হাড়ের ভঙ্গুরতা বৃদ্ধি পায় এবং হারের পুরুত্ব কমে যায়, পেশিশক্তি হ্রাস পায়, পিঠের পেছন দিকের অস্থিতে ব্যথা অনুভব হয়, হিপ, কোমর ও মেরুদণ্ডের ক্ষয় দেখা দেয় ইত্যাদি। হাড়ের ব্যথা বা অল্প আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়াও হতে পারে অস্টিওপোরোসিসের প্রথম লক্ষণ। মেরুদণ্ডের হাড় ভাঙার ফলে কোমরে হাড়ের গঠনগত ত্রুটি, উচ্চতা কমে যাওয়া, মেরুদণ্ডের ভেতরের স্নায়ুর ওপর চাপের প্রভাবে তীব্র ব্যথাও অনুভূত হয়।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা: হাড়ের সাধারণ এক্সরের মাধ্যমে অস্টিওপোরোসিস ধারণা করা গেলেও সঠিক অবস্থা শনাক্ত করা কঠিন। অস্টিওপোরোসিস শনাক্ত করার জন্য বোন মিনারেল ডেনসিটি (বিএমডি) পরীক্ষাটি করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সাধারণত কোমর বা মেরুদণ্ডের হাড়ের ডিস্ক স্ক্যানের মাধ্যমে হাড়ের এই ঘনত্ব নিরূপণ করা যায়। রক্তের কিছু পরীক্ষার মাধ্যমেও (বোন টার্নওভার মার্কার) অস্টিওপোরোসিসজনিত হাড় ভাঙার ঝুঁকি মাপা হয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত বিএমডির মাত্রাগুলো হলো

স্বাভাবিক :T score -1 SD-এর সমান বা ওপরে (পজিটিভ)।
অস্টিওপেনিয়া :  T score-1 SD †_‡K 2.5 SD।
অস্টিওপোরোসিস : T score-2.5 SD থেকে কম (নেগেটিভ)।

চিকিৎসা: অস্টিওপোরোসিস চিকিৎসার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমানো। হাড় ক্ষয় হ্রাস ও পূরণে প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্টারি, ওষুধ গ্রহণের পাশাপাশি কিছু ব্যায়ামও করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে হাড় ক্ষয়ের হার তুলনামূলকভাবে ধীরে ঘটে এবং কিছু ক্ষেত্রে হাড় পুনর্গঠন হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট গ্রহণ করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিসফসফোনেট, ইবানড্রোনিক এসিড, জোলেনড্রোনিক এসিডজাতীয় ওষুধ বেশ কার্যকর। কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে গেলে খুব সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। হঠাৎ লাফ দেওয়া বা দৌড়াদৌড়ি করা ঠিক হবে না। চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক ওজন বা ভার উত্তোলন, লো-ইমপ্যাক্ট ড্যান্সিং, এরোবিক্স বা অন্য কিছু ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ করে এই রোগ  নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। যারা এই রোগে আক্রান্ত, তাদের জন্য সাইক্লিং, ক্লাইম্বিং স্টিয়ারিং (সিঁড়ি মাড়ানো), নাচ, হাইকিং, জগিং, জাম্পিং রোপ, স্টেপ এরোবিক্স, টেনিস ইত্যাদি বেশ কার্যকর। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে দেহের অবস্থা বুঝে এসব করতে হবে। 

লেখক: চিফ কনসালট্যান্ট ও বিভাগী প্রধান, অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগ ও আর্থোপ্লাস্টিক সেন্টার